অধিক মুনাফা লাভের আশায় ভালো পরিবহনে যাতায়াত ব্যাবস্থা না করে বেনাপোলের ব্যাঙ্গের ছাতার মতো গড়ে উঠা প্রি ক্যাডেট স্কুলগুলোতে অত্যান্ত ঝুকি নিয়ে নছিমন করিমনে যাতায়াত করছে কোমলমাতি স্কুল শিক্ষার্থীদের । এতে ইঞ্জিনচালিত এ পরিবহনে সার্বোক্ষনীক দুর্ঘটানার শিকার হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।

অভিভাবকরা বলছেন, অনেকবার এনিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ করলে ও এ নিয়ে তাদের প্রদক্ষেপ নেই। আর শিক্ষকরা বলে আসছেন অর্থ সংকটের কারণেই তারা নছিমন-করিমন ব্যবহার করছেন। অচিরেই তারা এসব ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন ব্যবহার বন্ধ করবেন।

বুধবার সকালে বেনাপোল শহরএলাকা ঘুরে দেখা যায়, নব দিগন্ত প্রি ক্যাডেট, আইডিয়াল কিন্ডার গার্টেন,রেসিডেন্টসিয়াল ইনস্টিটিউট ও বিএম ইংলিশ ইনস্টিটিউটসহ আরো কয়েকটি বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নছিমন-করিমন ও আলমসাধুতে পণ্যের মত সাজিয়ে আনা নেওয়া করছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের। অনেক সময় চলন্ত অবস্থায়ই এসব গাড়িতে ঝুঁকি নিয়ে উঠা নামা করতে হয় তাদের। এজন্য যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও জীবনহানি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন উদ্বিগ্ন অবিভাবকরা। হাইকোটের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও প্রশাসনের নাকের ডগায় এ অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। অথচ পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ ব্যাপারে কিছুই করছে না, বলছে না।

একটি পরিসংখনে দেখা গেছে, গত ৮ মাসে শার্শা-বেনাপোল সীমান্তে ৮০ শতাংশ দুর্ঘটনাই নছিমন,করিমন ও আলমসাধুর সংঘর্ষে ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন অন্তত ১৭ জন,আহত হয়েছেন শতাধিক নারী-পুরুষ-শিশু। এর মধ্যে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন ১০/১৫ জন। নিহতের মধ্যে শিক্ষার্থী রয়েছে ৪ জন। এছাড়া অজপাড়াগাঁয়ের আরো অনেক মুত্যুর খবর প্রশাসনিকভাবে রফা দফা হওয়ায় তা আর প্রকাশ পায় না।

অবিভাবক শহিদুল ইসলামের দুই মেয়ে। তার কাছ জানতে চাওয়া হয় সচেতন হয়েও কেন তিনি ছেলেমেয়েদের নছিমনে স্কুলে পাঠাচ্ছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা বাচ্চাদের লেখাপড়া করতে পাঠবো কোথায়? যেখানেই পাঠাই না কেন সকলে অর্থ বাঁচানোর সার্থে এই ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনই ব্যবহার করছে।’

বেনাপোলের সংস্কৃতি-ব্যক্তিত্ব মোস্তাফিজ্জোহা সেলিম বলেন, ‘যেদিন জানলাম আমার বাচ্চাকে স্কুলকর্তৃপক্ষ নছিমনে আনা নেওয়া করছেন, সেদিন থেকে দুর্ঘটনা এড়াতে আমি নিজ দায়িত্বে তাদের স্কুলে আনা নেওয়া করছি। কিন্তু সবার পক্ষেতো বাচ্চাদের জন্য এভাবে সময় দেওয়া সম্ভব নয়। এখানকার প্রিক্যাডেট স্কুলগুলো এখন অতি-বাণিজ্যক হয়ে উঠেছে। যখন সেবার চেয়ে বেশি ব্যবসায়িক মনোভাবটাই বড় হয়ে উঠবে, তখন সে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এধরনের অপরাধ কর্মকান্ড ঘটতেই থাকবে।’

বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আলহাজ্ব কামাল উদ্দিন শিমুল বলেন, ‘বেনাপোল দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর। একারণে এলাকাটি জনবহুল ও ব্যস্ত। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের কারণে এ পথে চলাচল করছে হাজার হাজার যানবাহন। বলতে গেলে সব সময় লেগে থাকছে তীব্র যানজট। আর এই ব্যাস্ত সড়কটিতে নছিমন- করিমন চলায় প্রতিনিয়ত শার্শা-বেনাপোল সড়কটিতে ঘটছে ছোটবড় দুর্ঘটনা। সরকারের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পুলিশ প্রশাসনের সামনে কিভাবে রাস্তায় এই অবৈধ যানটি শিশু শিক্ষার্থীদের আনা নেওয়া করে জানি না। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’

বেনাপোল নব দিগন্ত প্রি-ক্যাডেট স্কুলের প্রিন্সিপাল আবু তালহা। দুই বছর আগে তার স্কুলে শিক্ষার্থীদের নছিমন ব্যবহার নিয়ে জানতে চাওয়া হয়। এসময় তিনি অনুরোধ করেন নিউজ না করতে।তিনি জানান দ্রুত তিনি এসব ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন তুলে ফেলবেন। কিন্তু এখনও পর্যান্ত তিনি নছিমনে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী আনা নেওয়া করেই যাচ্ছেন।

বেনাপোল বিএম ইংলিশ ইনস্টিটিউটের পরিচালক রাজু আহম্মেদ জানান, অর্থ সংকটের কারণে তারা নছিমনে ছাত্র-ছাত্রী আনা নেওয়া করছেন। এটা যে বড় অপরাধ সেটা তারা জানেন। কিন্তু তাদের ভাষায়, ‘এটা অস্থায়ী ব্যবস্থা।’ দ্রুত এটা বন্ধ করে বিকল্প নিরাপদ ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের আনা নেওয়া করা হবে বলে জানালেন তিনি।

বেনাপোল পোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অপূর্ব হাসান বলেন, ‘এর আগেও স্কুলে ছাত্রছাত্রী বহনকারী অনেক নছিমন-করিমন আটক করেছি। পরে স্কুল কর্তৃপক্ষ ছাত্র-ছাত্রী বহন করবেন না মর্মে প্রতিশ্রুতি দেয়ায় এগুলোকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তাদেরকে আবারো এই ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে। এটা অবশ্যই বন্ধ করা হবে। এই এসব ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনে বাচ্চাদের যাতে না পাঠানো হয়, সেজন্য অভিভাবকদের সচেতন করা হবে।’

এমবিএইচ