দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে ছেলেমেয়েদের শিক্ষাসূচি। এমন পরিস্থিতিতে আবার বিদ্যালয় ভবনে পুলিশ ক্যাম্প থাকায় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের স্থান সংকুলান হচ্ছে না। ফলে পাঠদানে বিঘ্ন ঘটছে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার নিলক্ষা বীরগাঁও ২নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

গেল বছর ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষার যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নেওয়ার জন্য নতুন বছরের শুরুতে নতুন উদ্যমে পাঠদান করার বিষয়টিই ছিল প্রত্যাশিত। শিক্ষার্থীরা হাতে নতুন বই পেয়েও সে উদ্যমে এগুনোর সুযোগ পায়নি। এ বিদ্যালয় ভবনে ৮ মাস ধরে রয়েছে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প। আর এতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা। তারা ক্লাস করছে গাদাগাদি করে। ৬টি ক্লাসের জন্য ব্যবহার করতে হচ্ছে মাত্র ৩টি কক্ষ।

স্থানীয়রা জানায়, নিলক্ষা ইউনিয়নের বীরগাঁও গ্রামে বিবাদমান দুইটি গ্রুপের সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় ৮ মাস আগে ইউনিয়নের সরকাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। আর এ পুলিশ ক্যাম্পের কার্যক্রম চলে স্কুল ভবনের দুটি কক্ষে। পুলিশ সদস্যদের থাকা, রান্না এমনকি কাপড় শুকাতে দেওয়াসহ সব কিছুই চলছে ওই কক্ষে। ক্লাসের জন্য তৈরি বেঞ্চ টেবিলও পুলিশ সদস্যদের দখলে।

অন্যদিকে বিদ্যালয়ের ক্লাস চলছে কোন রকম জোড়া তালি দিয়ে। শিশু শ্রেণিসহ ৬টি ক্লাসের ৫৬০ জন ছাত্রছাত্রীর জন্য বিদ্যালয়ে মাত্র ৬টি কক্ষ রয়েছে। তার মধ্যে ১টি কক্ষ ব্যবহার করছেন শিক্ষকরা অফিস হিসাবে, ৩টি কক্ষ শ্রেণিকক্ষ হিসাবে আর বাকি দুইটি ব্যবহার করা হচ্ছে পুলিশ ক্যাম্প হিসাবে। ক্লাসে স্থান সংকুলান না হওয়ায় ৩টি কক্ষে গাদাগাদি করে বসতে হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের।

বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, রশি টানিয়ে মাঠের বিভিন্ন দিকে পুলিশের ব্যবহার করা কাপড়চোপড় শুকানো হচ্ছে। পাশে কয়েকজন শিক্ষার্থী এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করছে। বিদ্যালয়ের কক্ষে পুলিশ দুপুরের খাবারে ব্যস্ত।

শিক্ষার্থীরা বলেন, স্কুলে পুলিশ থাকে, সে জন্য আমরা বিদ্যালয়ের কক্ষে বসতে পারছি না। ঠিকমত বসে আমরা ক্লাস করতে পারছিনা। আমরা এর প্রতিকার চাই।’

বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, ৮ মাস ধরে এখানে পুলিশ ক্যাম্প রয়েছে। স্কুলের বেঞ্চ জোড়া দিয়ে পুলিশ সদস্যরা রাতে ঘুমাচ্ছেন। এখানেই রান্না করছেন তারা। বিদ্যালয়ের টয়লেট তারা ব্যবহার করায় এখন ব্যবহারের অনুপযোগি হয়ে পরেছে।

বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি মো: সহিদুল্লাহ সরকার বলেন, ‘স্কুলে পুলিশ ক্যাম্প থাকাতে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটছে। যেহেতু এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে, সেহেতু শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার কথা বিবেচনা করে দ্রুত ক্যাম্পটি সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’

নিলক্ষা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হক বলেন, ‘ক্যাম্পটি স্কুল থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি পুলিশ সুপার বরাবর একটি আবেদন করার জন্য পরার্মশ দিয়েছেন।

পুলিশ ক্যাম্প করার আগে আপনার সম্মতি নেওয়া হয়েছিল কি না- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যে সময় পুলিশ ক্যাম্পটি স্থাপন করা হয় তখন এলাকার পরিস্থিতি এতটাই খারাপ ছিল যে অন্য কোন চিন্তা করার উপায় ছিল না। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত। তাই পুলিশ ক্যাম্পের প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।’

নরসিংদী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নার্গিস সাজেদা সুলতানা বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। যেহেতু আপনাদের মাধ্যমে অবগত হয়েছি। খুব শিগগিরই স্কুল থেকে পুলিশ ক্যাম্পটি সরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে আমি পুলিশ সুপারের সঙ্গে আলাপ করব।’

রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজাহারুল ইসলাম জানান, দুইটি গ্রুপের সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় সাময়িকভাবে ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। যেহেতু দুই গ্রুপের মাঝে আপোষ মিমাংসা হয়েছে আমরা ক্যাম্পটি সরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে বিবেচনা করে দেখব।

নরসিংদীর পুলিশ সুপার আমেনা বেগম বলেন, ‘ক্যাম্পটি আমরা সরিয়ে নিতে চাই। এলাকাবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে তা সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। যদি স্থানীয়রা মনে করে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে তা হলে অবশ্যই সরিয়ে নেওয়া হবে।’

তবে স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসন যদি মনে করে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে রাখতে পুলিশ ক্যাম্পটির প্রয়োজন তাহলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার কথা বিবেচনা করে স্কুল থেকে সরিয়ে অন্য কোন স্থানে ক্যাম্পটি স্থাপন করা হোক।

ইআর