ইয়াসমিন আক্তার চাঁদমনি (১৫)। কোতোয়ালী থানার নন্দনকানন এলাকায় এ কে ম্যানসনের (ইউসিবিএল জোনাল অফিস ভবন) অষ্টম তলার বাসিন্দা জাফর আহমদের বাসায় গৃহকর্মী। কাজ করতো পাঁচ বছর ধরে। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে একে ম্যানশন ও কাদের টাওয়ারের মধ্যবর্তী স্থান থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে তার স্বজনদের ডেকে ২৫ হাজার টাকা দিয়ে চাঁদমনিকে দাফনের জন্য গ্রামে পাঠিয়ে দেন ওই বাসার গৃহকর্তা। ব্যবসায়ী গৃহকর্তা ও তার পরিবারের দাবি, চাঁদমনিকে বকাঝকা করা হয়েছিল। তাই রাতে কোনো একসময় ভবনের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছে সে।
তবে গৃহকর্তা পরিবারের এ কথা মানতে নারাজ চাঁদমনির স্বজনরা। তারা বলছেন, চাঁদমনিকে মেরে লাশ ছাদ থেকে ফেলে দেয়া হয়েছে। এরপর সবাইকে বুঝাচ্ছেন চাঁদমনি আত্মহত্যা করেছে। এ নিয়ে পুলিশ মামলা নেয়নি বলে অভিযোগ করে তার পরিবার সদস্যরা।
চাঁদমনির মা ও ভাইয়ের অভিযোগ, চাঁদমনিকে হত্যার আগে বেদম মারধর করেছেন গৃহকর্তা পরিবারের সদস্যরা। এরপরই তাকে হত্যা করে লাশ ফেলেছেন বাসার বাইরে খোলা জায়গায়।
জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার দিবাগত মধ্যরাতে কাদের টাওয়ার ও একে ম্যানসনের মধ্যবর্তী স্থান থেকে পুলিশ চাঁদমনির মৃতদেহ উপুড় হয়ে পড়ে থাকাবস্থায় উদ্ধার করে। পরে চাঁদমনির স্বজনদেরকে খবর দেয়া হয়।
খবর পেয়ে স্বজনরা এলে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে লাশটি তাদের বুঝিয়ে দেয়া হয়। দাফন ও পরিবহন ভাড়া বাবদ ২৫ হাজার টাকা দেন তারা। এরপর কড়া ভাষায় বলে দেন- চাঁদমনি কিভাবে মারা গেছে বিষয়টি যাতে সাংবাদিক বা বাইরের কেউ না জানে। আর এতে চাঁদমনির মৃত্যুরহস্যের খবরটি আড়াল হয়ে যায়।
কোতোয়ালী থানা পুলিশ জানায়, ওই রাতে একে ম্যানসন এবং কাদের টাওয়ারের মাঝামাঝি করিডোর গলি থেকে উপুড় হয়ে পড়ে থাকাবস্থায় চাঁদমনির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত কিশোরী চাঁদমনির গ্রামের বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়া থানার খুটাখালী গ্রামে। বাবা নূর আহমদ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, একে ম্যানসনের অষ্টম তলায় ব্যবসায়ী জাফর আহমেদের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করত চাঁদমনি ইয়াসমিন (১৫)। একই ভবনের নবম তলায় গোলাম সরওয়ারের বাসায় কাজ করতো চাঁদমনির অপর দুই বোন জোৎস্না মনি ও সূর্যমনি। ১০ বছর বয়স থেকেই চাঁদমনি কাজ করে আসছিল এ বাসায়। কিন্তু দরিদ্রতা আর মুখোশ্রী দুটোই কাল হলো চাঁদমনির জীবনে।
মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী সিএমপি কোতোয়ালী থানার উপ-পরিদর্শক রুহুল আমিন বলেন, মরদেহের দুই পা এবং একহাত, পাজরের হাড় ভাঙা ছিল। মাথার এক পাশ ফেটে মগজ বের হয়ে যায়। চোখের উপরেও আঘাতের চিহ্ন। রুহুল আমিন বলেন, কিভাবে মারা গেছে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পেলে তা বলা যাবে।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে ওই ভবনের এক বাসিন্দা জানান, দিনের বেলায় মেয়েটিকে বেদম মারধর করা হয়েছে। ওই সন্ধ্যায়ও বাসা থেকে কান্নার আওয়াজ বেরিয়ে আসছিল। মেয়েটিকে বেদম মারধর করা হয়েছে। যার এক পর্যায়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লে কৌশলে তাকে ভবনের ছাদ থেকে ফেলে দেয়া হয়। এর পর বলছে, সে (চাঁদমনি) ভবন থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।
জাফর আহমেদের শ্যালিকা সাবিনা আক্তার মুক্তা বলেন, বাসার লোকজনের মতে তাদের প্রাভেটকারের চালকের সাথে কথা বলতে নিষেধ করা এবং বকাঝকা করার কারণে চাঁদমনি আত্মহত্যা করেছে।
মুক্তা বলেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তার ছেলেকে বাসার সামনে দিয়ে চাঁদমনি চলে যায়। এরপর তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর বিষয়টি চাঁদমনির মা-বাবা এবং পুলিশকে জানানো হয়। রাতে ভবনের নিচে তার নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশকে খবর দেয় স্থানীয়রা। এর পর পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে নিয়ে যায়।
মুক্তা বলেন, জাফর আহমদের বাসার প্রাইভেটকারের চালক সাহেদের সাথে চাঁদমনির প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বৃহস্পতিবার বিকেলে ভবনের ছাদে দুজনকে কথা বলতে দেখে গৃহকর্তা জাফর আহমেদ বকাঝকা করেন।
জাফর আহমদের স্ত্রী হিরার কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো কথা বলেননি। তবে হিরার ছোট বোন সাবিনা বারবার বলছেন বকাঝকা করার কারণে চাঁদমনি আত্মহত্যা করেছে। বাসার গৃহকর্তা জাফর আহমদের মোবাইল নম্বর তাদের কাছে চেয়েও পাওয়া যায়নি।
মুক্তার কাছে জাফর আহমদের মোবাইল নম্বর চাইলে তিনি কৌশলে তার স্বামী গোলাম সরওয়ারের নম্বর দেন। ওই নম্বরে ফোন করে চাঁদমনির মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে গোলাম সরওয়ার অনেকটা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন এবং বলেন- কেন এত যন্ত্রণা দিচ্ছেন? থানা বা কোর্টে যান, সেখানে গিয়ে বিস্তারিত জানুন।
পরে এ বিষয়ে খোঁজ নিতে একে ম্যানসনের অষ্টম তলায় জাফর আহমদের ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখা যায় বাসা তালাবদ্ধ। এর পর উপরে নবম তলায় গিয়ে গোলাম সরওয়ারের বাসায় পাওয়া যায় জাফর আহমদের স্ত্রী হিরাকে। তবে কোনো কথা বলতে রাজি নন তারা।
জাফর আহমদের প্রাইভেটকার চালক সাহেদকে ঘটনার পর পরই পুলিশ আটক করে। তবে পরে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। সাহেদ জাফর আহমদের বাসায় গাড়ি চালাচ্ছেন।
চাঁদমনির মা শাফিয়া বেগম বলেন, জাফর আহমদের শ্যালিকা মুক্তা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ফোন করে জানান চাঁদমনিকে পাওয়া যাচ্ছে না। পরে রাতে ফোন করে বলেন, সে আত্মহত্যা করেছে। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার মেয়ে আত্মহত্যা করতে পারে না। তার মৃত্যু নিয়ে রহস্য রয়েছে।
শাফিয়া বেগম বলেন, তাকে মেরে লাশ উপর থেকে ফেলে দিয়ে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করছে। তারা প্রায় সময় চাঁদমনিকে নির্যাতন করতো, সে আমাদের জানাতো। তবে দরিদ্রতা আর মেয়ের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে নিয়ে আসিনি। তিনি বলেন, এ ঘটনার পর থানায় মামলা করতে গেছি, তবে থানা পুলিশ আমাদের কোনো অভিযোগ গ্রহণ করেনি। আমরা গরিব বলে পুলিশ মামলা নেয়নি।
চাঁদমনির ছোট বোন জোৎস্না মনি জানায়, বড় বোন চাঁদমনি আত্মহত্যা করেনি। দুই বোনকে জাফর সাহেবের স্ত্রী হিরা চাঁদমনির সাথে কথা বলতে দিতেন না। প্রায় সময় চাঁদমনিকে মারধর করা হতো।
এ ব্যাপারে সিএমপি কোতোয়ালী থানার ওসি মোহাম্মদ মহসিন বলেন, পুলিশ চাঁদমনি নামে এক গৃহকর্মীর মরদেহ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্ত করে স্বজনদেরকে বুঝিয়ে দিয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদি হয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে মামলা না নেয়ার বিষয়ে ওসি বলেন, অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর বাকিটা।





