জীবিকার সন্ধানে বিদেশ যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অনেক গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে যাচ্ছে। মানবপাচার নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসে প্রকাশিত দীর্ঘ এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় পাওয়া বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের সাথে কথা বলে লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে গত বুধবার। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা কেন, কিভাবে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে তার বিবরণ এবং সমুদ্রযাত্রাপথে তাদের ওপর পাচারকারীদের নির্মম নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন সাংবাদিক জোনাথান কাইমান ও শশাঙ্ক বেঙ্গলি।

প্রতিবেদনটি শুরু করা হয়েছে এভাবে ‘এখানে সবারই শরীরে কোনো না কোনো ক্ষতচিহ্ন রয়েছে। জামা খুলে, আস্তিন টেনে তারা দেখালেন হাতে, কাঁধে, এবং ঊরুজুড়ে গভীর কাটা ঘা, সিগারেটের ছ্যাঁকার দাগ। এটা তো শরীরের ঘায়ের দাগ। কিন্তু তাদের মনের ক্ষত অদৃশ্য। অনাহার আর রোগে ভুগে তারা তাদের সাথের লোকজনকে মরে যেতে দেখেছে। এরপর তাদের লাশ নিক্ষেপ করা হয়েছে সাগরের বুকে।’

প্রতিবেদনে ক্যাম্পের কয়েকজন বাংলাদেশী ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন মুহম্মদ কায়েস। তার বয়স ১৯ বছর। সে বাংলাদেশের। ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে বন্দরনগরী লঙ্গসার একটি আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই হয়েছে তার। আশ্রয়কেন্দ্রের বাইরে উদভ্রান্তের মতো ঘোরাঘুরি করার সময় কায়েস জানান, সাগরে ভাসমান অবস্থায় তাদের কোনো খাবার ছিল না। ছিল না পানি। তিন মাস সাগরের বুকে ভেসে বেড়ানোর পর গত শুক্রবার ইন্দোনেশিয়ার জেলেরা ডুবতে বসা একটি জাহাজ থেকে টেনে তুলে সাত শ’ অভিবাসনপ্রত্যাশীকে। তারা বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের। মুহম্মদ কায়েস এই সাত শ’ জনের একজন।

কায়েস জানিয়েছেন, তাদের যাত্রাপথে কমপক্ষে ১০০ লোক মারা গেছে। তিনি বলেন, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার নেভি আমাদের পানি ও নুডুলস দিয়েছে। কিন্তু আমাদের জাহাজ তারা ভিড়তে দেয় না। তারা আমাদের মারতে চায়। এভাবে পাঁচ দিন লড়াইয়ের পর আমাদের জাহাজ ডুবতে শুরু করে। তখন ইন্দোনেশিয়ার জেলেরা আমাদের টেনে তুলেন।

সমুদ্রের মতো কূলেও তাদের ওপর চলে নির্যাতন। কখনো কখনো তাদের কাউকে হত্যা করা হয়। থাইল্যান্ডের জঙ্গলে গণকবর থেকে ৩০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে যাদের পাচারকারীরা হত্যা করেছে।

মে মাসের শুরুতে থাইল্যান্ডে মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর পর পাচারকারীরা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সাগরে ফেলে পালাতে শুরু করে। আর তারপরই উন্মুক্ত হতে থাকে মানবপাচারের এ ভয়াবহ চিত্র।

থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় তিন হাজারেরও বেশি পাচারের শিকার হওয়া এবং অভিবাসনপ্রত্যাশীকে আশ্রয় দেয়া হয়েছে। এদের বেশিরভাগই সাময়িক আশ্রয় পেয়েছে ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে। বিভিন্ন ক্যাম্পে ঘুরে লোকজনের সাথে কথা বললে তারা জানান, আর কয়েক দিন এভাবে নৌকায় থাকলে তারা মারা যেত।

আব্দুল রমন রাখাইন প্রদেশের একজন রোহিঙ্গা। তার বয়স ২৭। তিনি একজন ট্রাক ড্রাইভার। প্রায় দেড় বছর আগে তিনি মিয়ানমার থেকে পালাতে চেয়েছেন। কারণ তার সামনেই তার মা-বাবা এবং বোনকে মেরে ফেলে উগ্র বৌদ্ধরা। ডান পা দেখিয়ে আব্দুল রমন বলেন, এ সময় বাধা দেয়ায় তারও তিনটি আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে তাদের কোপের কারণে।

সমুদ্রযাত্রার বিবরণ দিয়ে রমন জানান, প্রায় তিন সপ্তাহ সাগরে পরিত্যক্ত অবস্থায় ভেসে বেড়ানোর পর গত ১০ মে আচেহ এলাকায় তাদের নৌকা ভেড়ানো হয়।

আব্দুল রমন জানান, রফিক নামে একজন পাচারকারী তাকে এক গ্রামে নিয়ে কয়েক মাস রাখে। এরপর সে তাকে একটি নৌকায় তুলে দেয়। এরপর তাকে আরেকটি নৌকায় তোলা হয় যেটিতে মানুষ গিজগিজ করছিল। এদের মধ্যে বাংলাদেশী এবং রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ছিল। পাটাতনের নিচেও মানুষ রাখা হয় গাদাগাদি করে। মিয়ানমারের পাচারকারীরা নৌকাটির নেতৃত্বে ছিল। নৌকায় তাকে মারধর করা হয় এবং দিনে মাত্র দু’বার দু’মুঠো ভাত দিত। এভাবে তিন মাস চলার পর থাইল্যান্ডের উপকূলে নৌকাটি রেখে পাচারকারীরা তাতে থাকা খাবার-দাবার নিয়ে পালিয়ে যায়। নৌকায় থাকা অবস্থায় পানি পিপাসায় আমরা সমুদ্রের লবণাক্ত পান করতে বাধ্য হয়েছি।

এভাবে পরিত্যক্ত অস্থায় ২০ দিন ভেসে বেড়ানোর পর এক দিন তিনি তীর দেখতে পেলেন। নৌকা তীরে না ভেড়া পর্যন্ত আব্দুল রমন জানতেন না এটা ইন্দোনেশিয়ার আচেহ এলাকা।

বৌদ্ধ অধ্যুষিত মিয়ানমার, সেখানে বসবাস করা ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে সে দেশের নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করছে। তাদের দাবি তারা বাংলাদেশ থেকে এসেছে, যদিও এসব রোহিঙ্গা সেখানে কয়েক প্রজন্ম ধরে বাস করছে। ২০১২ সালেল সঙ্ঘাতের ফলে এক লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা বাড়িঘর ছেড়ে ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে।

২০১১ সালের পর প্রস্তাবিত ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ অনুসারে রোহিঙ্গাদের সেখানে ‘বাঙালি’ হিসেবে রেজিস্ট্রেশনের অনুমতি দেয়া হয়। তার মানে হলো তারা বাংলাদেশ থেকে এসেছে বলে স্বীকৃত হবে এর মাধ্যমে। এ ছাড়া তাদের জন্ম, বিবাহ ও ধর্মের ওপর আরো নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। মিয়ানমারে নির্যাতনের কারণে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে।

লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গারা পালিয়ে আসছে বাংলাদেশে অথচ বাংলাদেশীরা আবার চাকরির সন্ধানে পালাচ্ছে অন্য দেশে। বাংলাদেশের প্রায় ৯০ লাখ লোক মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত রয়েছেন। যেসব গরিব লোক বৈধভাবে কাজের জন্য বিদেশে যেতে পারে না তারাই উন্নত জীবনের আশায় কম খরচে বিদেশে যাওয়ার জন্য দালালদের শরণাপন্ন হয় এবং এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রযাত্রা করে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে অনেক গ্রাম রয়েছে যেগুলো পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। পুরুষরা সবাই বিদেশে চলে যাচ্ছে। ঢাকার ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আটর্সের সহকারী প্রভাষক জালাল উদ্দিন শিকদার এ তথ্য দেন। তিনি অভিবাসী নিয়ে গবেষণা করছেন। জালাল উদ্দিন বলেন, পাচারকারীরা একবার বিদেশযাত্রীদের নৌকায় তুলতে পারলে খরচ ২০ থেকে ৩০ গুণ পর্যন্ত বাড়ায়। বাড়তি টাকা দিতে না পারলে তাদের জেলে দেয়া এবং মেরে ফেলার হুমকি দেয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গার্মেন্টের পর বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আসে প্রবাসীদের কাছ থেকে। কিন্তু পাচারকারীদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন প্রশাসনের দুর্নীতিগ্রস্ত লোকজন এ পাচারব্যবসার সাথে জড়িত।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মানবপাচার বিষয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে করুণ অবস্থার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। পাচারের শিকার হাজার হাজার মানুষ আন্দামান সাগরে ভেসে বেড়াচ্ছে। তাদের কাছে নেই কোনো খাদ্য ও পানীয়। কিন্তু তাদের কূলে ভিড়তে দিচ্ছে না তীরের দেশগুলো। কারণ তারা এ দরিদ্র অশিক্ষিত মানুষের কোনো দায়িত্ব নিতে চায় না।

মিয়ানমারে নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে অনেকে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমাতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের ভাগ্যে জুটেছে নৌকায় নিষ্ঠুর নির্যাতন। এরপর পাচারকারীরা তাদের রেখে পালিয়ে গেছে।

তারা ২০ দিন পর্যন্ত সাগরে অসহায় অবস্থায় ভেসে বেড়িয়েছে। এ সময় কখনো তাদের নৌকা ইন্দোনেশিয়া আবার কখনো মালয়েশিয়ার তীরে ভেড়ার পর তাদের আবার সাগরের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে।

জাতিসঙ্ঘের তথ্য মতে চলতি বছর প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে ২৫ হাজার লোক অবৈধভাবে সমুদ্রপথে পাড়ি জমিয়েছে অন্য দেশে। এদের মধ্যে অনেকে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গা মুসলিম। চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে তারা নিজ দেশ থেকে পালিয়েছে। দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশ থেকেও লোকজন এভাবে দেশ ছাড়ছে।

দেশ থেকে এভাবে পালিয়ে আসা কমপক্ষে আট হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান এখনো সাগরে ভাসছে। রোহিঙ্গাবোঝাই পাঁচটি জাহাজ দেখা গেছে সাগরে। এ ধরনের জাহাজ আরো থাকতে পারে।

গত মঙ্গল ও বুধবার ৩৭০ জনেরও বেশি ভাসমান লোককে তুলে আশ্রয় দেয়া হয়েছে ইন্দোনেশিয়ায়।

ইন্দোনেশিয়ার একটি ক্যাম্পে ২৪০ জন বাংলাদেশী রয়েছে যারা কয়েক মাস পর্যন্ত সাগরে একটি নৌকায় ভাসমান অবস্থায় ছিল। নৌকায় তাদের খাবার দেয়া হয়নি বরং চলেছে নির্যাতন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের যারা বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছে তাদেরকে হয়তো শিগগিরই দেশে ফিরিয়ে আনা যাবে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের আরো অনেক দিন ক্যাম্পে থাকতে হতে পারে। জাতিসঙ্ঘ শরণার্থী এজেন্সির মুখপাত্র মিত্র সালিমা সুরিয়োনো বলেন, তাদের পরিচয় চিহ্নিত করার জন্য আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। এটা অনেক সময় নেবে কারণ প্রত্যেকটি ঘটনা আলাদা।

১৮ বছরের রোহিঙ্গা যুবক মোহিদ শরিক বাংলাদেশের একটি ক্যাম্পে বাস করতেন। বর্তমানে ইন্দোনিশয়ার একটি ক্যাম্পে রয়েছেন তিনি। বাংলাদেশের ক্যাম্প থেকে পালানোর বিষয়ে মোহিদ শরিক বলেন, আমরা খুব গরিব। আমাদের টাকা দরকার। তাই আমি পালিয়ে এসেছি। আমি আর সেখানে ফিরে যেতে চাই না।

এএইচ