আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বাপশক) কর্তৃক নিয়োগকৃত বাংলাদেশের ন্যাশানাল লিয়াজো সহকারির (এনএলএ) নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ পদে কাউকে নিয়োগ প্রদান করতে হলে প্রথমত বাপশক’র পক্ষ থেকে বাংলাদেশের ‘এনএলএ’ নিয়োগের সুপারিশ করতে হয়। যা লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয় বিষয়টি জেনেভাস্থ স্থায়ী মিশনকে অবহিত করে এবং জেনেভাস্থ স্থায়ী মিশন আইএইএ’কে বিষয়টি অবহিত করে। এরপর আইএইএ বাংলাদেশের এনএলএ নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত করে থাকে।

কিন্তু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে না জানিয়ে বাপশক’র চেয়ারম্যান সরাসরি ‘আইএইএ’কে চিঠি পাঠিয়েছিলেন বাংলাদেশের এনএলএ নিয়োগের জন্য। আইএইএ এটাকে কেমন দৃষ্টিতে দেখেছে, অন্যদিকে আইএইএ প্রস্তাবিত ব্যক্তির এনএলএ নিয়োগ চূড়ান্ত করেছে কি-না, তা না জেনেই সেই চিঠি দেখিয়ে বছরের পর বছর বিদেশ ভ্রমনসহ নানান সুযোগ-সুবিধা লুফে নিচ্ছেন সেই প্রস্তাবিত লিয়াজো সহকারী। এই লিয়াজো সহকারী হচ্ছেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোঃ মজিবুর রহমান।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের ২০ মে বাপশক’র চেয়ারম্যান এ. এস. এম. ফিরোজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর চিঠি পাঠান। সেই চিঠিতে বলেন, বাপশক’র আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিভাগ (আবিবি)-এর পরিচালক ন্যাশানাল লিয়াজো অফিসার (এনএলও)-এর দায়িত্ব পালন করে থাকেন। বাপশক-এর আবিবি’র পরিচালক প্রকৌশলী মো. মাহবুবুর রহমান ‘এনএলও’-এর দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বাপশক’র গত ২০১৩ সালের ৮ মে তারিখের অফিস আদেশ সংখ্যা-২০০/২০১৩ মোতাবেক প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডাঃ ফয়সল কবির ‘আবিবি’-এর পরিচালকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। এ ধারাবাহিকতায় ডাঃ ফয়সল কবির-কে ‘এনএলও’-এর দায়িত্ব অর্পণ করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে এ পরিবর্তনের বিষয়টি জেনেভাস্থ বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের মাধ্যমে ‘আইএইএ’-কে অবহিত করা প্রয়োজন।

এভাবেই এ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে থাকে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

কিন্তু এর আগে ২০১২ সালের ১১ অক্টোবর বাপশক’র চেয়ারম্যান এ. এস. এম. ফিরোজ ‘আইএইএ’-তে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। ওই চিঠিতে বাপশক’র প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মজিবুর রহমানকে ন্যাশানাল লিয়াজোঁ সহকারি (এনএলএ) হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হয়।

নিয়ম অনুযায়ী বাপশক-এর চেয়ারম্যান সরাসরি আইএইএকে এই চিঠি প্রেরণ করতে পারেন না। ন্যাশানাল লিয়াজো অফিসার (এনএলও)-কে যেভাবে নিয়োগ দেয়া হয়, সেভাবেই এ পদেও নিয়োগ প্রদান করতে হয়। ড. মজিবুর রহমান ‘এনএলএ’ পদে নিয়োগের চিঠি প্রেরণের পর বিদেশে ১৪টি সফর করেছেন। তার আগে সফর করেছেন আরও একটি। তার ভ্রমণ তালিকা থেকে এটা স্পষ্ট, তিনি বাপশক-এর তৎকালীন চেয়ারম্যান-এর ছত্রছায়ায় ২০১২ সালে একবার এবং পরবর্তীতে ২০১৩ ও ২০১৪ সালে ‘এনএলএ’-এর দোহাই দিয়ে বাপশক’র খরচে ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত ‘আইএইএ’-এর ‘জেনারেল কনফারেন্স’ ও ‘আরসি’-এর ‘জেনারেল করপারেন্সে’ যোগদান করেন। বাপশককে তার এ ভ্রমণগুলোর জন্য ১৩ (তের) লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করতে হয়েছিল।

জানা যায়, বাপশক’র বিজ্ঞানীদের গবেষণা বিষয়ক লেখাপড়া করার জন্য যেখানে কাগজ-কলম ও গবেষণার জন্য রাসায়নিক দ্রব্যাদি পেতে বেগ পেতে হয়, সেখানে বিনাকাজে একজনকে বিদেশে গমনের সুবিধা প্রদানের বিষয়টি বিজ্ঞানীদের নিকট প্রশ্নবিদ্ধ। আরও জানা যায়, ২০১২ সালের পূর্বে ‘বাপশক’-এর ‘আবিবি’ থেকে ‘এনএলও’ ব্যতীত অন্য কেউই ‘আইএইএ’-এর ‘জেনারেল কনফারেন্স’ ও ‘আরসি’-এর ‘জেনারেল করপারেন্সে’ যোগদান করেননি।

তার একাধিক সহকর্মী জানিয়েছেন, ড. মজিবুর রহমানের শিক্ষা দীক্ষায় একজন প্রাণীবিদ। প্রাণী বিজ্ঞানী হয়েও ‘এনএলএ’-এর দোহাই দিয়ে তিনি নিউক্লিয়ার পাওয়ার বিষয়ক কাজ করে যাচ্ছেন। ২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর বেলারুশে ভ্রমনে গিয়েছিলেন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট দেখতে। এরপর ২০১৪ সালের ৪ নভেম্বর যুক্তরাজ্যে গিয়েছেন ‘হিনক্লে’ নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট ভিজিটে। নিউক্লিয়ার পদার্থ সম্বন্ধে তার কোনো জ্ঞান থাকলেও তিনি নিউক্লিয়ার পদার্থের সেফটি ও সিকিউরিটি এবং নিউক্লিয়ার এক্সিডেন্টে করণীয় বিষয়ে রাশিয়া, জাপান, থাইল্যা- ও যুক্তরাজ্যে অন্তত ৫বার ভ্রমনে গিয়েছিলেন। বিগত দশ বছরে তিনি উল্লেখযোগ্য কী বিজ্ঞান চর্চা করেছেন, তা কারো জানা নেই! শুধু তাই নয় ‘বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ’-এর মাধ্যমে দেশের গরীব মানুষের ৬০ থেকে ৭০ লক্ষ টাকা খরচ করে পিএইচডি করে এসে সেই বিষয়টিকে কতটুকু এগিয়ে নিয়েছেন, তা কেউ জানেন না।

বাপশকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের বৈদেশিক প্রশিক্ষণ/সভা/সেমিনার/কর্মশালা/বৈজ্ঞানিক সফরের জন্য প্রার্থী মনোনয়ন একটি সিলেকশন কমিটির মাধ্যমে সম্পন্ন করে থাকে। এ কমিটিতে বরাবরই বাপশক’র চেয়ারম্যান আহ্বায়ক ও মেম্বারগণ কমিটির সদস্যবলী এবং ‘আবিবি’-এর পরিচালক সদস্য-সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। কিন্তু ড. মজিবুর রহমান ‘এনএলএ’-এর দোহাই দিয়ে কর্তৃপক্ষের অনুকম্পায় ‘আবিবি’-এর পরিচালককে সদস্য হিসেবে রেখে নিজেই সদস্য-সচিব বনে যান। নিজেই নিজের নাম প্রস্তাব করে নমিনেশন নিতে শুরু করেন।

অন্যদিকে প্রকল্পের কোর্ডিনেটরদের অসম্মতিতে প্রকল্পের সদস্য নয় বা যেখানে প্রকল্পের কোর্ডিনেটরের গমন প্রয়োজন সেখানে তাকে নমিনেশন না দিয়ে অন্যকে নমিনেশন দিতে বাপশককে প্ররোচিত করতে থাকে। এ নিয়ে বাপশক’র একজন সদস্যকে তিনি হেনস্তাও করেছিলেন। ড. মজিবুরের এমন কর্মকান্ডের ফলে ‘আইএইএ’-তে ‘বাপশক’-এর শুনাম সাংঘাতিকভাবে ক্ষুন্ন হয়েছে বলে ওই কর্মকর্তাদের অভিযোগ। তারা আরো অভিযোগ করেন কমিশনের বিচক্ষণ ও কর্মঠ বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে সে একজন সুবিধাবাদি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এব্যাপারে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মজিবুর রহমান সঙ্গে তার (মোবাইল নম্বর-০১৯২৫১৪৬৯২৬) যোগাযোগ করলেও তিনি ফোন ধরেননি। যে কারণে তার মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এ. এস. এম. ফিরোজ অবসরে যাওয়ায় তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
জেএ