'আমি অপার হয়ে বসে আছি, ওহে দয়াময় 'কবে সাধুর চরণ ধূলি মোর লাগবে গায়'। সাধুর চরণ ধূলি নিয়ে ফিরতে শুরু করেছে লালন ভক্তরা। বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের স্মরণোৎসবের চতুর্থ দিন শনিবার বাউল আর লালন ভক্তদের ভিড় কমেছে।
চতুর্থ দিনে সাধুর চরণ ধূলি গায়ে মেখে তল্পি-তল্পা গুটিয়ে নিতে শুরু করেছেন তারা। তবে এখনও মরমী আর আধ্যাত্মিক গানে মুখর কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ার কালীগঙ্গার তীরে লালনের আখড়াবাড়ি চত্বর। 'মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি/ মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি' কিংবা 'সবলোকে কয় লালন কি জাত সংসারে' এমনি অনেক আধ্যাত্মিক গান আর মরমী সাধক লালনের জীবন দর্শন নিয়ে আলোচনায় মুখর আখড়াবাড়ি। লালনের দর্শন পাওয়া আর অচেনাকে চেনা, আত্মার শুদ্ধি, মুক্তি, জ্ঞানসঞ্চয়সহ যে যার মনের বাসনা পূরণ করতে এবারও সাঁইজির আখড়ায় ছুটে এসেছিলেন ভক্ত অনুসারীরা। লালনের সাধুসঙ্গ সম্পন্ন হলেও আখড়াবাড়িতে এখনও তিল ধারনের ঠাঁই নেই।
এবারের স্মরণোৎসবের বাউল, ভক্ত, আর লালন অনুসারী ছাড়াও দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছেন বাউল, শিষ্যরা এবং দর্শনার্থীরা। এ উৎসবে আবারো ভিড় জমবে ভক্তদের। সেই প্রত্যাশা নিয়েই চলে যাচ্ছে ভক্তরা। ছেঁউড়িয়ার বাউল সম্রাট লালনের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বেদনা আর কষ্ট নিয়েই ফিরতে হচ্ছে গন্তব্যে।
শুক্রবার ভক্ত শিষ্যদের গুরুকার্য আর সাধুসঙ্গ সম্পন্ন হয়েছে। ৮ মার্চ রোববার আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক ও কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুব-উল আলম হানিফ পাঁচ দিন ব্যাপী এই লালন স্মরণোৎসবের সমাপ্তি ঘোষণা করবেন। তবে মূল অনুষ্ঠানে শেষ ধীরে ধীরে আখড়া ছাড়ছে তারা।
ফরিদপুর থেকে আসা বাউল কলিম শাহ বলেন, আখড়াবাড়িতে আসি মনের তৃষ্ণা মেটাতে, গুরুদিক্ষা নিয়ে আবার ফিরে যায় ভবের বাজারে।
চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা বাউল সরাফত শাহ বলেন, ফকির লালন জাতপাতকে দূরে রেখে মানুষকে ভালোবাসার দর্শন প্রচার করেছেন। লালন সাঁইজির আধ্যাত্মিকদর্শন আমাদের অনুপ্রেরণা। লালন ভক্ত বারেক আলী বলেন, মানবধর্ম সবচেবে বড় ধর্ম। লালনের সমস্ত গানে ও কথায় সেই ধর্মের কথাই বলা হয়েছে। আর একমাত্র লালনের বাণী মনের ভেতর সঠিকভাবে ধারণ করতে পারলেই মানুষ নিজেকে চিনতে পারবে।
বিশিষ্ট লেখক ও লালন গবেষক শেখ গিয়াস উদ্দিন আহমেদ মিন্টু বলেন, বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁই একই সঙ্গে মরমী এবং দ্রোহী, তার গানে বাউল সাধনার নানা প্রসঙ্গ অনুসৃত হয়েছে। তার গানের ভেতর দিয়ে সমাজের অসঙ্গতি, কুপ্রথা সকল জাতপাতের ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। লালনের গান বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সাংঘাতিকভাবে নাড়া দিয়েছিল। সাঁইজির সহজিয়া ফকিরী মতবাদের জাতহীন মানব দর্শন ও সঙ্গীত দেশের সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বাঙ্গনে।
সমাজে জঙ্গীবাদ, ফতোয়াবাজসহ নানান সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে আজকের এই সময়ে লালনের আদর্শকে ব্যাপকভাবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা বড় বেশি জরুরী হয়ে পড়েছে। লালন ফকির শিখিয়ে দিয়ে গেছেন, মানবতার কোন বিকল্প নেই। তবে এখনও আখড়াবাড়ির চারিদিকে লালন অনুসারীদের ভিড়। আখড়াবাড়ি চত্বরে খ- খ- সাধু আস্তানায় আসন পেতে বসে মেতে উঠেছেন লালনের গান নিয়ে। লালন মেলার পাশেই উন্মুক্ত লালন মঞ্চে সন্ধ্যায় লালনের জীবনদর্শন নিয়ে আলোচনা চলছে। আধ্যাত্মিক গান গেয়ে গুরু-শিষ্য, বাউল সাধক আর অনুরাগীদের মাতিয়ে রাখছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বাউল শিল্পীরা।
ইআর





