৩৪তম বিসিএস পরীক্ষার ফলাফল কেন বাতিল করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে ৩৪তম বিসিএসের ভাইভা কেন পুনরায় নেওয়া হবে না, রুলে সেটিও জানতে চাওয়া হয়েছে।
সোমবার এক রিট আবেদনের শুনানিতে বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলামের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রুল জারি করেন।
আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট নুর-উস সাদিক। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন সহকারী অ্যার্টনি জেনারেল ফরিদা ইয়াসমিন।
চার সপ্তাহের মধ্যে পিএসসির চেয়ারম্যান, শিক্ষাসচিবসহ সংশ্লিষ্টদের এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। এর আগে গত সপ্তাহে চৌধুরী জাফর শরীফ নামের এক ব্যক্তি ফলাফল বাতিল চেয়ে রিট দায়ের করেন।
অ্যাডভোকেট নুর-উস সাদিক জানান, নিয়মানুযায়ী মেধাক্রম অনুসারে ফল প্রকাশ করতে হবে। পিএসসি এটি না করে রোল নম্বর অনুসারে ফল প্রকাশ করেছে।
এর আগে ৩৪তম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষা নিয়ে একের পর এক অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠে। গত ২৯ আগস্ট ফল প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই চারদিক থেকে অভিযোগ উঠতে থাকে মৌখিক পরীক্ষায় ব্যাপক কারচুপি ও অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে।
৩৪তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বেশ কয়েকজন পরীক্ষার্থী নিজের মুখে স্বীকারও করেছেন, তাঁরা মৌখিক পরীক্ষায় সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) কয়েকজন সদস্যের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা পেয়েছেন।
এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তীর্ণ দুজন পরীক্ষার্থীকে মৌখিক পরীক্ষায় অনৈতিক সুবিধা পাওয়ার কথা স্বীকার করতে দেখা যায়। এ ছাড়া একটি অডিও এসেছে যাতে শোনা যাচ্ছে, অনৈতিক সুবিধা পাওয়ার কথা স্বীকার করা সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার্থীদের ফোন বন্ধ করে আত্মগোপন করতে উপদেশ দিয়েছেন তাঁদের 'মুরব্বি'রা।
এদিকে ৩৪তম বিসিএস পরীক্ষার ফল বাতিলের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সর্বশেষ গত ৫ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া স্মারকলিপিতে এ পরীক্ষায় অনিয়ম-দুর্নীতি ও অসংগতির নানা দিক তুলে ধরেছেন।
ওই স্মারকলিপিতে পরীক্ষা বাতিল করার জন্যও অনুরোধ করা হয়েছে। তবে কোনো দাবি বা অভিযোগই আমলে নিচ্ছে না পিএসসি। পাবলিক পরীক্ষা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠলে পিএসসি ও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ তদন্ত কমিটি গঠন করে বিষয়টি খতিয়ে দেখে, এরপর মন্তব্য করে থাকে। কিন্তু ৩৪তম বিসিএসের ক্ষেত্রে গুরুতর অভিযোগের ভিডিও ফুটেজ থাকার পরও পিএসসি কোনো তদন্ত কমিটি না করেই অভিযুক্তদের পক্ষ নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে।
৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ দুই পরীক্ষার্থীর বক্তব্যসংবলিত যে দুটি ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গেছে তার একটিতে বক্তব্য রয়েছে পুলিশ ক্যাডারে উত্তীর্ণ হওয়া উৎপল কুমার চৌধুরীর।
অন্যটিতে বক্তব্য রয়েছে প্রশাসন ক্যাডারে উত্তীর্ণ হওয়া ইসরাত নামের একজনের। গোপনে ধারণ করা ওই ভিডিওতে দেখা যায়, উৎপল কুমার চৌধুরী স্বীকার করেছেন, পিএসসির সদস্য সমর চন্দ্র পালের বোর্ডে তিনি মৌখিক পরীক্ষা দিয়েছেন।
সমর চন্দ্র পাল তাঁকে ২০ নম্বর বেশি দিয়েছেন। তিনি তাঁকে মৌখিক পরীক্ষায় সহানুভূতি দেখিয়েছেন। এ ছাড়া লিখিত পরীক্ষায় অন্যের সহায়তা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন উৎপল কুমার চৌধুরী।
তিনি ভিডিওতে বলেন, 'পরীক্ষার হলে ভালো সুযোগ ছিল। আমরা বেশি সাপোর্ট পাইছি ম্যাথে (গণিত)। ম্যাথে ৪৫ পাব এটা নিশ্চিত ছিল। মেন্টাল অ্যাবেলিটি- এটা আমাদের ভালো হয়েছিল। সম্ভবত একটা ভুল হয়েছিল ৫০টির মধ্যে।
আমি একটা জিনিস পারিনি। পাশে ছিল বিসিএস তথ্য...। ওই ভাই আবার আইবিএর স্টুডেন্ট ছিলেন। উনার কাছ থেকে সহায়তা পাই। আইবিএর স্টুডেন্ট, উনার মস্তিষ্ক অন্য ধরনের। একবার ক্যাডার পেয়েছেন।
উনি বললেন, 'পরীক্ষা দিলে সবাই পাস করব। তবে আমরা যদি মিলেমিশে দেই তাতে কিন্তু ভালো মার্কস আসবে।' উৎপল কুমার চৌধুরী জানিয়েছেন, 'মোমিন ভাই' ও তথ্য ক্যাডারের আইবিএর সাবেক শিক্ষার্থী 'আকবর ভাই'সহ তিনজনে মিলে একে অপরের মধ্যে খাতা দিয়ে তাঁরা লিখিত পরীক্ষা দিয়েছেন।
তবে শেষ পর্যন্ত উত্তীর্ণ হয়েছেন উৎপল কুমার চৌধুরী। এমনকি আইবিএর মেধাবী শিক্ষার্থী আকবর উত্তীর্ণ হননি। একই খাতা দেখে পরীক্ষা দিয়েও উত্তীর্ণ হতে পারেননি মোমিনও।
তবে প্রথমবার পরীক্ষা দিতে আসা বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী উৎপল কুমার চৌধুরী ৩৪তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডার উত্তীর্ণ হয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উৎপল কুমার চৌধুরীর সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, 'এ রকম কোনো ভিডিও থাকার কথা নয়। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা।' ভিডিও ফুটেজে তাঁকেই কথা বলতে দেখা যাচ্ছে বলে জানানো হলে তিনি বলেন, 'আমি এভাবে বলিনি। আমি বলেছি আমরা একই ধর্মের। হয়তো সে কারণে তিনি আমাকে ২০ মার্কস সহানুভূতি দিয়েছেন। আর এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারি না।'
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিএসসির সদস্য সমর চন্দ্র পাল মৌখিক পরীক্ষায় কোনো পরীক্ষার্থীকে সুবিধা দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, 'যারা এমন অভিযোগ করতেছে তারা করুক। আমি কী তা সবাই জানে।
এ বিষয়ে তদন্ত হোক। পরীক্ষার কোনো বিষয়ে আমরা আগে থেকে কিছুই জানতে পারি না।' এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, '৩৪তম বিসিএসে কী হয়েছে তার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হোক।'
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ৩৪তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে উত্তীর্ণ হওয়া ইসরাত এক প্রশ্নের জবাবে বলছেন, 'কোন ভাইভা বোর্ডে আমি ছিলাম জানি না। মনে পড়ছে না কোন ভাইভা বোর্ডে ছিলাম।'
প্রধানমন্ত্রী বরাবর দেওয়া স্মারকলিপিতে অভিযোগ করে বলা হয়েছে, ইসরাত মৌখিক পরীক্ষায় অনৈতিক সুবিধা পেয়েছেন। এতে আরো বলা হয়, মাত্র কয়েক দিন আগে উপস্থিত হওয়া মৌখিক পরীক্ষায় বোর্ডের সদস্যদের নাম মনে না করতে পারা অসম্ভব ঘটনা। কারণ একজন বিসিএস পরীক্ষার্থীর কাছে তাঁর মৌখিক পরীক্ষার বোর্ড সারা জীবন মনে রাখার মতো।
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) ২১ কর্মকর্তা এবার বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়েছেন। পরীক্ষার্থীরা একে আইসিবি সিন্ডিকেট হিসেবে অভিহিত করেন। আইসিবি থেকে যে ২১ জন ৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়েছেন তাঁদের কেউই ৩৫তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেননি।
অভিযোগ উঠেছে, ফল প্রকাশের আগেই উত্তীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে তাঁরা নিশ্চিত ছিলেন বলেই ৩৫তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেননি।
আগের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ৩৪তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে উত্তীর্ণ হওয়া মুনিয়া চৌধুরী বলেন, 'আমরা আইসিবিতে যাঁরা ছিলাম তাঁরা কেউই ৩৫তম রিটেন (লিখিত) পরীক্ষায় অংশ নিইনি।'
এতে আরো অভিযোগ করা হয়, আইসিবি সিন্ডিকেটকে পার করানোর ক্ষেত্রে পিএসসির দুই প্রভাবশালী সদস্য শরীফ এনামুল কবির ও ওয়াজেদ আলীর ভূমিকা রয়েছে।
আগের ভিডিওতে মুনিয়া চৌধুরী স্বীকার করেছেন, তাঁর সঙ্গে পিএসসির সদস্য ওয়াজেদ আলী খানের পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। ওয়াজেদ আলী খান ফল প্রকাশের আগেই জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি প্রশাসন ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়েছেন।
মুনিয়া চৌধুরী ধর্মসচিব মো. বাবুল হাসানের মেয়ে। ধর্মসচিবের সঙ্গে ওয়াজেদ আলী খানের সুসম্পর্ক রয়েছে বলেও ভিডিওতে দাবি করেন মুনিয়া চৌধুরী। তবে ওয়াজেদ আলী খান অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আর শরীফ এনামুল কবির বলেন, এসব পুরনো ভিডিও। এ ব্যাপারে চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।
বিসিএসে মৌখিক পরীক্ষা ২০০ নম্বরের। কোনো পরীক্ষার্থী ১৬০ বা এর চেয়ে বেশি নম্বর পেলে সাধারণত তদন্ত করা হয়। এত বেশি নম্বর পাওয়ার ক্ষেত্রে অনৈতিক কিছু ঘটে কি না তা খতিয়ে দেখতেই তদন্ত কমিটি করা হয়ে থাকে।
অথচ ৩৪তম বিসিএসে ইকোনমিক ক্যাডারে উত্তীর্ণ ইফফাত তানজিয়া মৌখিক পরীক্ষায় ১৮০ নম্বর পেয়েছেন। আরো অনেককেই মৌখিক পরীক্ষায় ১৬০ বা এর চেয়ে বেশি নম্বর দেওয়া হয়েছে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মৌখিক পরীক্ষায় বাড়তি নম্বর দেওয়ার মাধ্যমেই দুর্নীতি করেছেন পিএসসির কয়েকজন সদস্য। পুলিশ ক্যাডারে উত্তীর্ণ উৎপল কুমার চৌধুরী ভিডিওতে স্বীকার করেছেন, তাঁকে মৌখিক পরীক্ষায় ২০ নম্বর বাড়তি দেওয়া হয়েছে।
বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষায় ২০০ নম্বর থাকায় সীমাহীন অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। আন্দোলনরত পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, পিএসসির কোনো কোনো সদস্য পছন্দের প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষায় ২০০ নম্বরের মধ্যে ১৬০ বা এরও বেশি নম্বর দিয়ে থাকেন।
আর যাদের কোনো যোগাযোগ নেই তাদের অনেক ক্ষেত্রে ১০০ নম্বরেরও কম দেওয়া হয়। ফলে প্রকৃত মেধাবীরা লিখিত পরীক্ষায় ভালো করেও পিছিয়ে যান। ২০০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষার স্থলে ১০০ নম্বর করা গেলে দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধ করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
৩৪তম বিসিএসে মৌখিক পরীক্ষার ১২টি বোর্ড ছিল। প্রতিটি বোর্ডে পিএসসির একজন করে সদস্য থাকেন। ১২ বোর্ডের মধ্যে চারজনের বোর্ড থেকে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন।
ওই চারজন হলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক উপাচার্য শরীফ এনামুল কবির, সাবেক অতিরিক্ত সচিব ওয়াজেদ আলী খান, সাবেক সচিব উজ্জ্বল বিকাশ দত্ত ও আনোয়ারা বেগম।
এই চার বোর্ডের মধ্যে আবার সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন উজ্জ্বল বিকাশ দত্তের বোর্ড থেকে। অভিযোগ রয়েছে, উজ্জ্বল বিকাশ দত্তের বোর্ড থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের কেউই ১২০ নম্বরের নিচে পাননি।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পিএসসির সদস্য উজ্জ্বল বিকাশ দত্ত কাউকে কোনো অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, 'আপনার যদি ঘিতেও কাটা বাছেন তাহলে কোনো কথা নেই। এর আগে পিএসসিতে যে ভয়াবহ নৈরাজ্য ছিল তখন আপনারা (মিডিয়া) কোনো কথা বলেননি।'
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'আপনারা যা পারেন তাই লেখেন। এর চেয়ে স্বচ্ছতা ইহজগতে আর সম্ভব নয়। চরিত্র হননের জন্য যদি আপনারা কিছু করেন তাহলে বলার কিছু নেই।'
এসএইচ





