পার্বত্য চট্টগ্রাম, উত্তর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সড়ক ও নৌপথে আসা বৈধ-অবৈধ কাঠের গাড়ি আটক করে বনবিভাগ ও পুলিশ নিয়মিত লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছে।

উভয়পথে বৈধভাবে কাঠ নিয়ে নিজ গন্তব্যে পৌঁছতে গাড়ি প্রতি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হচ্ছে পুলিশ ও বনবিভাগের কর্মকর্তাদের। এভাবে দৈনিক আড়াই লাখ টাকার মতো চাঁদাবাজি হচ্ছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

আবার অবৈধভাবে যেসব কাঠ আসে সেগুলোর চাঁদার অংক দ্বিগুণ। শুধু তাই নয় ব্যবসায়ীরা মালামালগুলো চট্টগ্রামে আনার পরও আরেক দফায় তাদেরকে চাঁদা দিতে হয়।
বনবিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেলার রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, বোয়ালখালী, বাঁশখালীসহ ১৪টি উপজেলা, পার্বত্য চট্টগ্রামের কাউখালী, কাপ্তাই, বরকল, নানিয়ানচর, বাঘাইছড়ি, জুরাছড়ি, রোয়াংছড়ি, লামা, মানিকছড়ি, দীঘিনালাসহ ২৫টি উপজেলা এবং কক্সবাজারের চকরিয়া, রামু ও উপকূলীয় অঞ্চলসহ সেখানকার ৫টি উপজেলায় বনবিভাগের বনভূমি রয়েছে ১৬ লাখ ৮৮ হাজার একরের মতো।

এসব জায়গায় বনবিভাগের সংরক্ষিত বন, সৃজিত বন, অর্পিত বন ও অশ্রেণীভুক্ত বনভূমি রয়েছে। আরও রয়েছে বনবিভাগের শ‘খানেক শুল্ক ফাঁড়ি। এসব বনাঞ্চল থেকে এবং বিভিন্ন সময় চোরাই কাঠ অভিযানে জব্দকৃত কাঠগুলো দরপত্রের মাধ্যমে লাইসেন্সধারী কাঠ ব্যবসায়ীদের মাঝে বনবিভাগ বিক্রয় করে থাকে। ব্যবসায়ীরা দরপত্রে অংশগ্রহণ করে বনবিভাগের ওইসব নির্ধারিত মালামাল বাবদ মূল্য পরিশোধ করে নিজ ব্যবসায়িক গন্তব্যে কাঠ সরবরাহ করে থাকেন।

কাঠ ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ট্রান্সপোর্ট পারমিশন বা টিপি থাকার পরও সড়কপথে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং উত্তর ও দক্ষিণ চট্টগ্রাম থেকে গাছ নিয়ে আসতে হলে ওই অঞ্চলগুলোতে স্থাপিত বনবিভাগের ফাঁড়ি ও পুলিশকে নির্ধারিত হারে গাড়ি প্রতি চাঁদা দিতে হয়। চট্টগ্রামে না পৌঁছা পর্যন্ত এ চাঁদা দেয়ার সর্বশেষ সীমানা হলো ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। চট্টগ্রামে প্রবেশমুখে গিয়ে সর্বশেষ চাঁদা দিতে রাঙ্গুনিয়ার পোমরা শুল্ক ফাড়ি, কালুরঘাট ব্রিজ এলাকা, কাপ্তাই রাস্তার মাথা ও অক্সিজেন এলাকায়।

এদিকে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা থেকে কাঠ পরিবহনের একটি অংশ এখন খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় সড়ক হয়ে সরসারি ঢাকায় নিয়ে যান ব্যবসায়ীরা। এ রুট দিয়ে চাঁদার পরিমাণ কম দিতে হয় বলে ব্যবসায়ীরা জানান।

ফলে আগের তুলনায় বর্তমানে চট্টগ্রাম হয়ে কাঠ পরিবহন কমে গেছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম হয়ে প্রতিদিন অন্তত ১৫টি গাড়ি প্রবেশ করে। কোনো কোনোদিন এ সংখ্যা বেশিও হয়। অবশ্য যারা অবৈধভাবে টিপির অতিরিক্ত কাঠ আনছেন তাদেরকে চাঁদার পরিমাণ বেশি দিতে হয় বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

এ ক্ষেত্রে সেখানকার বনবিভাগের ফাঁড়ির কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বড় অংকের অর্থ পরিশোধ করে এ কাঠগুলোর পারমিট করে পাচার করা হয়। আবার যারা বরিশাল ভোলা থেকে বৈধভাবে বল্লি জাতীয় কাঠ এনে চট্টগ্রামে ব্যবসা করছেন তাদেরও একই অবস্থা।

সেখান থেকে কাঠ নিয়ে আসতে হলে ব্যবসায়ীদের ভোলা, লক্ষ্মীপুর, ধূমঘাট, মাদাম বিবিরহাটে স্থাপিত অন্তত চারটি ফাঁড়িতে চাঁদা দিতে হয়। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাত ১২টায় দুটি কাঠ বোঝাই ট্রাক বহদ্দারহাট এলাকা অতিক্রম করার সময় ট্রাফিক পুলিশের একটি মোটরবাইক ঐ ট্রাক দুটিকে তাড়া করে। পরে শুলকবহর এলাকায় গিয়ে ট্রাক দুটিকে থামিয়ে ফেলে পুলিশ।

পরে চাঁদা আদায় করে পুলিশ ওই গাড়ি দুটি ছেড়ে দেয়। এছাড়া বহদ্দারহাটে এক ব্যবসায়ীর দাবি, গত বৃহস্পতিবার বল্লি বোঝাই একটি গাড়ি ভোলা থেকে চট্টগ্রামে নিয়ে আসতে তার ১০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে। মেসার্স নুরুল আলম টিম্বারসের আবুল কাসেম বলেন, বনবিভাগ ও পুলিশকে চাঁদা দেবার বিয়য়টি অনেক পুরোনো ব্যাপার। যারা বৈধভাবে গাছ নিয়ে আসছে তাদেরকে তারপরও কিছু করে দিতে হয়।

আবার যারা অবৈধভাবে নিয়ে আসছেন তাদের কাছ থেকে ৫ হাজার থেকে শুরু করে যত পারে তত টাকা নিয়ে থাকে পুলিশ। কোনো কোনো সময় পরিমাণমতো চাঁদা না পেলে গাড়িগুলো আটক করে রাখা হয়।

বহদ্দারহাট মোড়ে একজন কাঠ ব্যবসায়ী বলেন, টিপি (ট্রান্সপোর্ট পারমিশন) থাকার পরও তাদেরকে ভোলা থেকে বল্লি জাতীয় কাঠ আনতে পুলিশ ও বনবিভাগকে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। কোনো কোনো সময় আবার নিজ ব্যবসায়িক স্থাপনায় বনবিভাগের কর্মীরা আসেন। তাদেরকে টিপি দেখানোর পরও এসব দেখানো লাগবে না বলে চাঁদা দাবি করেন।
শাহ জালাল টিম্বার মার্চেন্ট অ্যান্ড সমিলের প্রোপ্রাইটর মোহাম্মদ সোহরাওয়ার্দী বলেন, টিপি বৈধ থাকার পরও ফাঁড়িতে বনবিভাগের লোকজন গাড়ি আটকিয়ে রাখে। কিছু চা-পানি খরচ দিলে পরে তারা ছেড়ে দেন। পুলিশকেও একই কায়দায় কিছু টাকা পয়সা দিতে হয়। তা না হলে গাড়ি ছাড়ে না। গাড়িতে ওভারলোড, অবৈধ কাঠ আছে বলে তারা হয়রানি করে। ফলে গাড়ির ড্রাইভারদের সাথে আমাদের যে কন্ডিশন থাকে তাতে বাধ্য হয়ে আমাদেরকে টাকা দিতে হয়।

বহদ্দারহাটে কাঠ ব্যাবসায়ী নুরন্নবী বলেন, পুলিশ ও বনবিভাগকে টুকটাক কিছু দিতেই হবে। যারা টাকা দিচ্ছে এবং যারা টাকা নিচ্ছে উভয়ই অপরাধী জানিয়ে চট্টগ্রাম উত্তর বনবিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক (সদর) মো. ইউসুফ বলেন, এগুলো আমরাও শুনে আসছি।

কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে এ অভিযোগগুলো কোনো ব্যবসায়ী সাহস করে আমাদের কাছে বলে না। যদি এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে আমরা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেব। ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজির বিষয়ে

ট্রাফিক পুলিশের উপ কমিশনার ফারুক আহমেদ বলেন, কাঠের সাথে ট্রাফিক পুলিশের কোনো স¤র্পক নেই। কাঠবোঝাই ট্রাকের গাড়ির কাগজপত্র ঠিক আছে কি-না তা হয়ত সার্জেন্টরা দেখে জরিমানা বা মামলা করছে।

তিনি আরও বলেন, এভাবে চাঁদা নেয়ার বিষয়টি আমি চট্টগ্রামে আসার আগে এবং এখানে এসে শুনছি। যদি এই বিষয়ে কোনো সার্জেন্টের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায় আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেব।

ঢাকা, ৭ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, জেআই