প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাতিসংঘে ৪০ বছরের পথ-পরিক্রমায় আমাদের অনেক অর্জন রয়েছে। এর কোনটিই অনায়াসে হয়নি। যখনই আমরা সরকার পরিচালনার দায়িত্বে এসেছি, জাতিসংঘের সাথে আমাদের যোগাযোগ ও সম্পর্ককে সুদৃঢ় করেছি। যা পারস্পরিক ব্যবধান কমিয়ে এনেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্য অর্জনে আমরা জাতিসংঘকে আমাদের পাশে দেখতে চাই।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত বিশেষ স্মারক অনুষ্ঠানে তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

বুধবার বিকেলে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এ আয়োজন করা হয়।

বক্তৃতার শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর জাতির পিতা যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের ধ্বংসস্তুপের উপর দাঁড়িয়ে দেশের পুনর্গঠনে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। ব্যাপক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরা ছাড়া তাঁর এ উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

আর এ জন্য জাতিসংঘের সদস্যপদ অর্জন ছিল অপরিহার্য। দেশের বাইরে তখনও আমাদের দুতাবাসগুলো ভালভাবে চালু হয়নি। সে অবস্থায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিলাভের জন্য জাতির পিতা বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র ও তৎকালীন বিশ্বনেতাদের সমর্থন আদায়ের পদক্ষেপ নেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার পররাষ্ট্র নীতির আদর্শই আমাদের “শান্তির সংস্কৃতি ও সহিংসতা বিরোধী” নীতিতে সবসময় অবিচল রেখেছে। ১৯৯৭ সালে গৃহীত জাতিসংঘের এ সংক্রান্ত প্রস্তাবের প্রতি আমরা দৃঢ় সমর্থন দেই। এ আদর্শের পথ ধরেই আমাদের নারী-পুরুষ বিশ্বের সংঘাত-সঙ্কুল এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ভাষা বৈচিত্র্য রক্ষা ও মাতৃভাষার মর্যাদাকে সমুন্নত রাখতে বিশ্ববাসী আজ যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করছে - সে অর্জন এসেছে জাতির পিতা প্রদর্শিত পথ ধরেই।

তিনি আরও বলেন, আজকের এই বিশেষ দিনে আমরা আরও সামনের দিকে তাকাতে চাই। মাত্র ১০ বছর পরেই আমরা জাতিসংঘের সাথে আমাদের সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করব। এ সময়ের মধ্যে জাতিসংঘের সাথে আমাদের সম্পর্ককে আরও গভীর ও অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাই।

আন্তর্জাতিক শান্তি এবং নিরাপত্তার প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতিতে আমরা অটল রয়েছি। আমি আশা করি যুদ্ধ, সংঘাত ও সন্ত্রাস রোধে জাতিসংঘের সার্মথ্য বৃদ্ধি করতে আমরা সকল সদস্য রাষ্ট্র সঙ্গে একযোগে কাজ করে যাব।

যুদ্ধ, সংঘাত মানবীয় বিপর্যয় ডেকে আনে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা মানবীয় মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখতে একযোগে কাজ করতে চাই। আমরা মানুষের মননশীলতায় শান্তির সংস্কৃতি তৈরিতে কাজ করে যাব যাতে মানুষের মন থেকে যুদ্ধের বৈরি ভাবনাগুলো মুছে যায়।

উন্নয়নের জন্য ‘জনগণের ক্ষমতায়ন’- এ সত্য প্রতিষ্ঠায় আমরা কাজ করে যাব যাতে কেউ উন্নয়ন বঞ্চিত না হয় বেলেও উল্লেখ করেন তিনি।

জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ এজেন্ডায় আমাদের অবস্থান সবসময়ই সামনের সারিতে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার, সমুদ্র, আকাশ এবং সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমরা আরও নিবিড়ভাবে কাজ করতে চাই। সন্ত্রাসবাদ ও মৌলবাদ বিরোধী বৈশ্বিক সংগ্রামে আমরা স্বপ্রণোদিত হয়ে কাজ করতে চাই। রাজনৈতিক অঙ্গীকার অনুযায়ী আমরা দেশে মানবাধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছি।

গণহত্যা প্রতিরোধে সারাবিশ্বে যে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে, আমরা তার সাথে একাত্মতা পোষণ করছি উল্রেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার না হওয়ার সংস্কৃতি যাতে বন্ধ হয়, সেজন্য অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার আন্দেলনে আমরা নীতিগতভাবে অগ্রগামী। মায়ানমারের শরণার্থী সমস্যা সমাধানে আমরা কূটনৈতিক পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছি এবং ভবিষ্যতেও করে যাব।

জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারসমূহ বাস্তবায়নের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক অভিবাসন, দ্রুত নগরায়ন, অসংক্রামক রোগ এবং সমুদ্রসম্পদের টেকসই ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চাই উল্লেখ করে তিনি বলেন,
আমরা দেখতে চাই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং একটি মার্জিত কাজের নিশ্চয়তা পাচ্ছে।

আমরা চাই, উন্নয়নের জন্য অর্থবহ অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। বিশ্ব বাণিজ্যের সুফল উন্নয়নশীল দেশগুলোও ভোগ করবে।

নারীর ক্ষমতায়নকে আরও সুদৃঢ় করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। নারীর প্রতি সহিংসতা, বাল্যবিবাহ এবং শিশু নির্যাতন ইত্যাদি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমরা কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করেছি।

বাংলাদেশ জাতিসংঘে প্রবেশ করার আগেও বিশ্বের অনন্য এই প্রতিষ্ঠান সুখে-দুঃখে আমাদের পাশে ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জাতিসংঘ বাংলাদেশের জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছিল। এখনও জাতিসংঘ আমাদের পাশে আছে। বাংলাদেশের মানুষ যোগ্যতা বলেই উন্নয়ন ও নিরাপত্তার দরকষাকষিতে এগিয়ে আছে।বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের অংশিদারিত্বের ভিত্তিতেই পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।

আমরা যুদ্ধ-সংঘাত চাই না। শান্তি চাই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে এই মহান দিনে আমি বিশ্ব নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানাব আসুন যুদ্ধ-সংঘাত বন্ধে আমরা আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেই। জাতিসংঘকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ করে দেই।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, জাতিসংঘ বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক সালাউদ্দিন আহমেদ ও ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী নিল ওয়াকার।

ঢাকা, ১৭ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, এএইচ