মজুরি বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের পর নৌ শ্রমিকদের ধর্মঘট প্রত্যাহারের একদিন পর নৌ মালিকদের ডাকা ধর্মঘটে আবারও হুমকির মুখে পড়েছে নৌপথে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা। মালিকরা বলছেন, বর্ধিত মজুরি দিয়ে জাহাজ পরিচালনা করে তারা পোষাতে পারবেন না। তাই জাহাজ না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ অবস্থায় আসন্ন রমজানে পণ্য সরবরাহ হুমকির মুখে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম বলেন, জাহাজ মালিকদের ওপর শ্রমিকদের যে অতিরিক্ত মজুরি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তা দিয়ে জাহাজ চালানো সম্ভব নয়। তাই বুধবার মধ্যরাত থেকে তারা জাহাজ না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখন মন্ত্রণালয়কেই করণীয় ঠিক করতে হবে।

এ অবস্থায় গতকাল নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সংকট নিরসনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে কয়েকটি স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে নৌযান চলাচল করেছে। খুলনায় ধর্মঘটের কোনো প্রভাব লক্ষ্য করা যায়নি।

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে রমজানের পণ্য নিয়ে ১৭টি জাহাজ এলেও খালাস করতে পারছে না পণ্য। পণ্য খালাসের জন্য অপেক্ষায় বন্দরের বহির্নোঙরে জাহাজ জমেছে ৭৯টি। প্রতিদিন ৮ লাখ টাকা গচ্চা দিয়ে এসব জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আরও ৪৬টি জাহাজ নোঙর করবে। বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী বলেন, 'এ অবস্থা চলতে থাকলে আসন্ন রমজানে ভোগ্যপণ্যের দামে প্রভাব পড়বে। ক্ষতির বোঝা শেষ পর্যন্ত যাবে ভোক্তাদের কাঁধেই।'

এদিকে গত কয়েক দিনের ধর্মঘটে এরই মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেক কমে গেছে। পিডিবির পরিচালক সাইফুল হাসান চৌধুরী বলেন, 'কয়েকটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের কাঁচামাল আসে নৌপথে। টানা ধর্মঘটের কারণে সরবরাহ কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এ জন্য বেড়ে গেছে লোডশেডিং।

অলস বসে আছে ২১শ' লাইটারেজ জাহাজ :নৌ ধর্মঘটের কারণে অচল হওয়ার পথে পুরো নৌ বাণিজ্যই। বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য খালাস বন্ধ থাকায় অলস বসে আছে প্রায় ২ হাজার ১০০ লাইটারেজ জাহাজ। এর মধ্যে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের মাধ্যমে চলাচল করে এক হাজার ২০০ লাইটারেজ জাহাজ। বন্ধ রয়েছে বিভিন্ন

কারখানায় কাঁচামাল সরবরাহের কার্যক্রম। কর্ণফুলী নদীর ১৬টি ঘাটে খালাস করা পণ্য যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। গত কয়েকদিন এসব ঘাট থেকে কোনো পণ্য পরিবহন হয়নি। কাঁচামালের অভাবে তাই বন্ধ হতে চলেছে বিভিন্ন শিল্প-কারখানাও। কার্যক্রম বন্ধ থাকায় দুই হাজার ১০০ লাইটারেজ জাহাজের মালিকরাও প্রতিদিন ক্ষতি গুনছেন।

সব ঘাটই স্থবির : চট্টগ্রামে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের মাধ্যমে লাইটারেজ জাহাজের বুকিং দেওয়া হয়। বন্দরের বহির্নোঙরেই স্বাভাবিকভাবে প্রতিদিন পণ্য খালাস করে ৩৫ থেকে ৪০টি লাইটারেজ জাহাজ। চট্টগ্রাম থেকে পণ্য যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, রূপসা, মাওয়া, ঘোড়াশাল, দাউদকান্দি, নগরবাড়ী, বাঘাবাড়ী, বরিশাল, নওয়াপাড়া, খুলনাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০টি লাইটারেজ জাহাজ যায় পণ্য নিয়ে। ধর্মঘটের কারণে সব রুটেই বন্ধ রয়েছে পণ্য আনা-নেওয়ার কার্যক্রম।

ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের কো-কনভেনর খুরশিদ আলম বলেন, 'এ ধর্মঘট আরও দু-একদিন চললে বন্ধ হয়ে যাবে সিমেন্ট, বিদ্যুৎসহ কাঁচামাল-নির্ভর শতাধিক কারখানা।'

বন্ধ হয়ে যাচ্ছে শিল্প-কারখানা :পণ্য সরবরাহ বন্ধ থাকায় কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছেন বিভিন্ন শিল্প-কারখানা মালিকরা। এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআইর সহ-সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, 'আমার জানা মতে, প্রিমিয়ার সিমেন্ট তাদের কারখানা কাঁচামালের অভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। আরও অনেক কারখানা কাঁচামালের সংকটে রয়েছে। বিএসএম গ্রুপ রমজানের পণ্য এনে আটকা পড়েছে। সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপেরও রমজানের পণ্য আটকে আছে বহির্নোঙরে। এখন খালাস করা না গেলে রমজানে ভোগ্যপণ্যেরও সংকট তৈরি হতে পারে। কারণ ভোজ্যতেল কারখানায় নিয়ে পরিশোধন করতে সময় লাগে।'

যে কারণে বারবার ধর্মঘট :মজুরি বৃদ্ধিসহ ১৫ দফা দাবিতে গত সপ্তাহে ধর্মঘটে যান নৌযান শ্রমিকরা। নৌ ধর্মঘট স্থগিত করতে ২২ এপ্রিল বিভিন্ন পক্ষকে নিয়ে ঢাকায় বৈঠক করেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক। এ বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে ১০ মে পর্যন্ত সময় চাওয়া হয়। কিন্তু এ সময় না দিয়ে সিদ্ধান্তের জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় চান নৌযান ফেডারেশনের কর্মকর্তারা। মঙ্গলবার রাতে ফের সব পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করেন নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। এ বৈঠকে মজুরি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দেওয়া হলে ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেন নৌযান শ্রমিকরা। কিন্তু এবার বেঁকে বসেন জাহাজ মালিকরা। বুধবার ঢাকায় জরুরি বৈঠক করে জাহাজ মালিকরা পাল্টা ধর্মঘটের ঘোষণা দেয়। বর্ধিত মজুরি দেওয়া সম্ভব নয় জানিয়ে তারা ধর্মঘটে যান।

আশুগঞ্জ (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকাল থেকে আশুগঞ্জ তথা পূর্বাঞ্চলে ধর্মঘট শুরু হয়েছে। দেশের পূর্বাঞ্চলীয় কার্গোজাহাজ মালিক সমিতির সভাপতি হাজি মো. নাজমুল হোসাইন হামদু জানান, নৌযান শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির যে একতরফা ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন মালিক পক্ষের সম্ভব নয়। শ্রম মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী শ্রমিকদের বেতন পুনর্নির্ধারণের ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত মালিকরা জাহাজ চালাবেন না। তিনি আরও জানান, এ সময় নৌযান শ্রমিকরা আগের প্রচলিত বেতন-ভাতা পাবেন।

খুলনা ব্যুরো জানায়, নৌযান ধর্মঘট আহ্বান করা হলেও খুলনায় নৌযান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। গতকাল সারাদিনই মংলা বন্দর থেকে মালপত্র নিয়ে কার্গো ও জাহাজ চলাচল করেছে।

খুলনার বন্দর কর্মকর্তা মো. কায়সার আহমেদ জানান, বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই বন্দরে পণ্য খালাস ও বোঝাইয়ের কাজ চলছে। নৌযান চলাচলও স্বাভাবিক রয়েছে।

খুলনা বিভাগীয় নৌপরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব মো. সাইফুল ইসলাম জানান, নৌযান শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির প্রস্তাব গেজেট হলে তারা ধর্মঘটে যাবেন। হঠাৎ করে ধর্মঘট করলে অচলাবস্থা তৈরি হবে। এ জন্য ধর্মঘটের হুমকি দিয়েছেন তারা।

এইচ ই