বগুড়ার শেরপুর উপজেলার জুয়ানপুর কুঠিবাড়ি এলাকায় একটি বাড়িতে বোমা বানাতে গিয়ে বিস্ফোরণে দুই ব্যক্তি নিহত হওয়ার পর পুলিশ সেখানে অভিযান চালিয়ে গ্রেনেড এবং গ্রেনেড তৈরির বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম, বিস্ফোরক, পিস্তল ও গুলি উদ্ধার করেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, জঙ্গিরা বাড়িটিকে বোমা তৈরির কারখানা হিসেবে ব্যবহার করছিল বলে তাদের ধারণা। বোমা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রেনেডগুলো যে কায়দায় তৈরি করা হয়েছে সেটা একমাত্র জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) জঙ্গিরাই করে থাকে। এর আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে
জেএমবির আস্তানা থেকে স্থানীয়ভাবে তৈরি যেসব গ্রেনেড পাওয়া গেছে তার সঙ্গে এগুলোর মিল আছে।
গত রবিবার দিবাগত রাত ৮টার দিকে শেরপুর উপজেলার গাড়িদহ ইউনিয়নের জুয়ানপুর কুঠিবাড়ি গ্রামের একটি বাড়িতে গ্রেনেড তৈরির সময় বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই একজন নিহত হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরেকজনের মৃত্যু হয়। রাতে স্থানীয় পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে কারোর পরিচয় জানাতে পারেনি। তবে তারা জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে সন্দেহের কথা জানিয়েছিল।
নিহত এই দুজনের মধ্যে সিরাজগঞ্জের তরিকুল ইসলাম থাকতে পারেন বলে জেলা পুলিশ জানিয়েছে। গতকাল সোমবার তরিকুলের পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তবে বগুড়া পুলিশ বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি। তারা বলছে, পরিবারের সদস্যরা এসে শনাক্ত না করা পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না।
ঢাকা থেকে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটি) বোমা বিশেষজ্ঞদল গতকাল সকাল ৯টা থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে বাড়িটিতে তল্লাশি চালিয়ে গ্রেনেড, বোমা তৈরির সরঞ্জাম, অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করে। দলটির নেতৃত্ব দেন কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সহকারী কমিশনার রহমতুল্লাহ চৌধুরী। তাঁর সঙ্গে ইউনিটের আট সদস্য।
এরপর দুপুরে ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিক এক ব্রিফিংয়ে বগুড়ার পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান জানান, চার কক্ষের ওই এক তলা বাড়িটি জঙ্গিদলের সদস্যরা বোমা তৈরির কারখানা হিসেবে ব্যবহার করছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর সবচেয়ে বেশি সন্দেহ করা হচ্ছে জেএমবিকে। কারণ এ অঞ্চলে এর আগেও একই ধরনের তৎপরতার সঙ্গে জেএমবি জড়িত ছিল।
পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ঘটনাস্থল থেকে ২০টি তৈরি গ্রেনেড, চারটি বিদেশি পিস্তল, ৪০টি গুলি, তিন শতাধিক গ্রেনেড তৈরির সরঞ্জাম ও দেড় বস্তা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক (নাইট্রোগ্লিসারিন) উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে সেখানে একটি বাজাজ মোটরসাইকেল, একটি বাইসাইকেল, বেশ কিছু জমির দলিল, ব্যাংকের চেক বই ও অন্যান্য কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়। দুটি মোবাইল ফোনসেট পাওয়া গেলেও সেগুলোর সিমকার্ড ছিল না।
দুপুর ১২টার থেকে বোমা বিশেষজ্ঞদলের সদস্যরা বাড়িটির সামনের একটি মাঠে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করে এক এক করে ২০টি গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিষ্ক্রিয় করেন। আর সেখানে বিস্ফোরণ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বিকেলে দেড় বস্তা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক (নাইট্রোজেল) যমুনার দুর্গম চরে নিয়ে গিয়ে বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়।
বোমা বিশেষজ্ঞদলের প্রধান কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সহকারী কমিশনার রহমতুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘গ্রেনেডগুলো যে ফর্মুলায় তৈরি করা হয়েছে সেই কাজটি একমাত্র জেএমবি করে থাকে। এর আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে জেএমবির আস্তানা থেকে স্থানীয়ভাবে তৈরি যেসব গ্রেনেড পাওয়া গেছে তার সঙ্গে বগুড়ায় উদ্ধার করা গ্রেনেড মিলে গেছে।’
তিনি আরো বলেন, স্থানীয়ভাবে নাইট্রোজেল ও ডেটোনেটর ব্যবহার করে তৈরি করা এই গ্রেনেডের কার্যক্ষমতা বাড়াতে জঙ্গিরা লোহার বল, পেরেক ও তারকাঁটার মতো বস্তু স্প্লিন্টার হিসেবে ব্যবহার করে। এর কারণে এটির ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা বেড়ে যায় বহুগুণ। ৫ থেকে ১০ মিটার এলাকায় যে কোনো বস্তু ও মানুষকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করার ক্ষমতা এই গ্রেনেডের রয়েছে।
জুয়ানপুর কুঠিবাড়ি এলাকার স্থানীয় লোকজন জানায়, ছয় মাস ধরে মিজান নামের এক ব্যক্তি নিজেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক পরিচয় দিয়ে জুয়ানপুর গ্রামের মাহবুবুর রহমানের বাড়িটি ভাড়া নেন। বাড়ির মালিক মাহবুবুর রহমান ঢাকার আশুলিয়ায় বসবাস করেন। তাঁর সেখানে থাই অ্যালুমিনিয়ামের পণ্য বিক্রির দোকান রয়েছে। তাঁর মেয়ে সুমাইয়া আক্তার পলি জুয়ানপুর গ্রামে স্বামীর বাড়িতে বসবাস করেন। তিনিই মূলত এ বাড়ির দেখভাল করেন।
পাশাপাশি লাগোয়া বাড়িতে অবস্থানরত সুমাইয়া আক্তার পলি জানান, চার কক্ষের এক তলা বাড়িটি তিনি মাসিক দুই হাজার ২০০ টাকায় অটোরিকশাচালক পরিচয় দেওয়া মিজানকে ভাড়া দিয়েছেন। কথা ছিল, তিনি স্ত্রী, ১১ বছরের মেয়ে ও তাঁর ভগ্নিপতি কাঁচামাল ব্যবসায়ী এক ব্যক্তিকে নিয়ে বাড়িতে থাকবেন। পাশাপাশি বাড়িতে অবস্থান করলেও এর আগে কখনো এ বাড়িতে কোনো সন্দেহজনক লোকজনের আনা গোনা কিংবা অন্য কোন অপকর্ম তাঁর চোখে পড়েনি বলে পলি জানান।
তিনি বলেন, বাড়িতে অবস্থানকারীরা নিজেদের বাড়ি নওগাঁ জেলায় বললেও কখনো তাঁদের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা কিংবা মোবাইল ফোন নম্বর দেয়নি। জানতে চাইলে নানা অজুহাতে বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন তাঁরা।
পলি জানান, শুক্রবার সকালে মিজান তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি নওগাঁয় বেড়াতে যাচ্ছেন বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। এরপর দুপুরের দিকে মিজানের ভগ্নিপতি পরিচয়দানকারী ওই ব্যক্তির সঙ্গে অজ্ঞাতপরিচয় আরো একজন বাড়িতে আসেন। তাঁরা মিজানের অনুপস্থিতে সেখানে অবস্থান করেন। এরপর রবিবার রাত ৯টার দিকে সেখানে বোমা বিস্ফোরণের বিকট আওয়াজ শুনে তিনি ও পরিবারের অন্য সদস্যরা বাড়িতে ছুটে গিয়ে মেঝের মধ্যে রক্তাক্ত অবস্থায় ওই দুজনকে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের লোকজন তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
গতকাল সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, শেরপুর-ঢাকা মহাসড়কের গাড়িদহ এলাকায় মহাসড়ক থেকে মাত্র ৫০০ মিটার কাঁচা রাস্তা দিয়ে ভেতরে ঢুকলেই জুয়ানপুর গ্রাম। গ্রামের প্রথম বাড়িটিই মাহবুবুর রহমানের। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো এবং বাড়িটির পেছন দিকে পালানোর মতো একাধিক পথ থাকায় জঙ্গিরা বাড়িটি সিএনজিচালকের ছদ্মবেশে ভাড়া করে। এরপর সেখানে অবস্থান করে শক্তিশালী গ্রেনেড তৈরির কাজ চালিয়ে যায়।
গতকাল সেখানে পুলিশ ও বোমা বিশেষজ্ঞ টিম ছাড়াও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা (ডিএসবি) ও র্যা বসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় জঙ্গি আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত বাড়িটিসহ আশপাশের এলাকা ঘিরে ফেলে জন চলাচল সীমিত করা হয়।
উদ্ধার করা বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব বগুড়া শহর : পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আসা উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক দিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গিগোষ্ঠী জেএমবি সদস্যরা গ্রেনেড তৈরি করছে। এসব বোমা তৈরির কারিগররাও পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। বগুড়ায় উদ্ধার করা বিপুল পরিমাণ গ্রেনেড ও সেগুলো তৈরির জন্য জড়ো করা রসদের পরিমাণ দেখে উদ্বিগ্ন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এ তথ্য দিয়েছেন।
ঢাকা থেকে আসা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের বোমা বিশেষজ্ঞদলের সদস্যরা জানান, বগুড়ায় যে পরিমাণ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক পাওয়া গেছে, তা দিয়ে তৈরি করা বোমায় পুরো বগুড়া শহর উড়িয়ে দেওয়া যাবে। জঙ্গিদের হাতে এত বেশি পরিমাণ এবং দুষ্প্রাপ্য বিস্ফোরক কী করে এলো তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তাঁরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বগুড়া পুলিশের গোয়েন্দা শাখার একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, সামনে বাংলা নববর্ষ বৈশাখী উৎসবকে কেন্দ্র করে নাশকতার জন্য বগুড়ায় এই গ্রেনেডগুলো তৈরি হয়ে থাকতে পারে। একই সঙ্গে জামায়াত নেতা নিজামীর ফাঁসির বিষয়টিও সামনে আসছে। তবে বগুড়ার এই গ্রেনেডগুলো শুধু বগুড়ায় নয়, বরং সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নাশকতার কাজে যে ব্যবহৃত হতো সেটি মোটামুটি নিশ্চিত তাঁরা।
নিহতদের মধ্যে সিরাজগঞ্জের তরিকুল আছেন বলে ধারণা : তরিকুল ইসলাম জেলার সদর উপজেলার শিয়ালকোল ইউনিয়নের জামুয়া গ্রামের মাওলানা আবু বকর সিদ্দিকের ছেলে। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সিরাজগঞ্জ আদালত চত্বরে জেএমবির সিরিজ বোমা হামলার একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি।
এই মামলায় তিনি তিন বছর হাজতবাসও করেন। ২০০৯ সালে ওই মামলার রায়ে তিনি বেকসুর খালাস পেয়ে যান। এরপর তিনি আবারও মাদ্রাসায় পড়ালেখা শুরু করেন। গত কোরবানির ঈদের পর থেকে পরিবারের সঙ্গে তরিকুলের কোনো যোগাযোগ নেই। তিনি নিখোঁজ হওয়ার পর সদর থানায় পরিবারের পক্ষ থেকে একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছে বলে তাঁর বড় ভাই সানাউল্লাহ জানান।
জেলার পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ গতকাল বিকেলে জানান, বগুড়ার শেরপুরে বোমা বিস্ফোরণে যে দুজন নিহত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে সিরাজগঞ্জ সদরের জামুয়া গ্রামের জঙ্গি সদস্য তরিকুল ইসলাম রয়েছেন বলে ধারণা করছেন। তাঁর বিষয়ে আরো কোনো তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায় কি না, সেটি জানতে তাঁর পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুপুরে পুলিশ হেফাজতে আনা হয়েছে।
তরিকুলের বড় ভাই সানাউল্লাহ জানান, ছয় ভাইয়ের মধ্যে তরিকুল ইসলাম সবার ছোট।
স্থানীয় লোকজন জানিয়েছে, দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার আগে ও পরে জঙ্গিনেতা শায়খ আবদুর রহমান ও আতাউর রহমান সানি জামুয়া গ্রামে তরিকুলের বাড়িতে আসা-যাওয়া করতেন।সূত্র- কালের কণ্ঠ।
এমবি





