মাগুরা পুলিশের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাসে জেলার চার উপজেলায় ৬৫টি আত্মহনন বা অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
এর মধ্যে সর্বাধিক ৪০ জন গলায় ফাঁস দিয়ে এবং ১৯ জন বিষপানে আত্মহনন করেছে। আত্মহননকারীদের মধ্যে নারী-পুরুষের সংখ্যা প্রায় সমান সমান। অর্ধেকের বেশি আত্মহননকারীর বয়স ৩০ বছরের নিচে। যার মধ্যে শিশু ও কিশোর-কিশোরী আত্মহননকারীর সংখ্যা ১০। প্রশাসনিক ঝামেলা এড়াতে অনেক আত্মহত্যার ঘটনা পুলিশের নথিভুক্ত হয় না।
বেকারত্ব, পারিবারিক কলহ, প্রেম-বিরহ, বিচ্ছেদ ইত্যাদি নানা কারণে মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। সাধারণত মানসিক সমস্যাগ্রস্ত, অত্যন্ত আবেগী চরিত্র ও জেদি প্রকৃতির মানুষ নানা সামাজিক সমস্যা ও ব্যর্থতার কারণে আত্মহত্যা করে। এ ছাড়া ছোটখাটো কারণেও মানুষ আত্মহত্যা করছে।
মাগুরা নাকোল সম্মিলনী কলেজের সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক খান মাজহারুল হক লিপু বলেন, এ বছরের শুরুতে মাগুরা সদরের রামনগর গ্রামে অন্তরা ও চৈতি নামে স্কুল-কলেজপড়ুয়া দুই বোন একসঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে।
বাবা ও পরিবারের অভিভাবকরা দুই বোনের প্রেমিককে অপমান করায় অভিমানে তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। সাম্প্রতিক সময়ে পছন্দের মোবাইল বা পোশাক না পেয়েও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে ঠুনকো বিষয়ে মতপার্থক্যের কারণেও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে।
লিপু মনে করেন, সামাজিক অস্থিরতা আত্মহত্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
বিষপানে আত্মহনন করতে গিয়ে বেঁচে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবক বলেন, মানুষ যখন একা হয়ে যায়, তখন নিঃসঙ্গতাবোধ থেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
আত্মহত্যা নিয়ে গবেষণাধর্মী কাজ করছেন মাগুরার সাংবাদিক আবু বাসার আকন্দ। তিনি বলেন, মাগুরা জেলার মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি হওয়ার কারণ তারা সংগ্রামী নয়। সংগ্রামী মানুষ সব সময় বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। কিন্তু সহজে জীবনযাপনে অভ্যস্ত হওয়ার কারণে মাগুরার মানুষ বেশি আবেগপ্রবণ। যে কারণে সামান্য আঘাতে তারা মুষড়ে পড়েন এবং আত্মহননের পথ বেছে নেন।
মাগুরার পুলিশ সুপার এহসান উল্লাহ বলেন, সামাজিক নৈরাজ্যের পাশাপাশি পরিবারের ভেতরে অস্থিরতার কারণে আত্মহত্যার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এখন যৌথ পরিবার ভেঙে যাচ্ছে। মা-বাবা বা পরিবারের সদস্যরা সন্তানদের সময় দিচ্ছেন না। বিপদে কেউ কাউকে পাশে পাচ্ছে না। প্রতিবেশী বা কাছের স্বজনরা এখন কেউ কারও খোঁজ রাখেন না। বর্তমান প্রজন্ম সঠিক সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা নিতে পারছে না। তথ্যপ্রযুক্তির নেতিবাচক ব্যবহারও কিছু মানুষকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করছে।
তিনি বলেন, সচেতনতা সৃষ্টির জন্য জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে মতবিনিময় সভা করা হচ্ছে। মাগুরা পুলিশ পারিবারিক বিচ্ছেদ রোধে স্বামী-স্ত্রী বা পরিবারের অন্যদের দ্বন্দ্বের কারণে নারী নির্যাতনের মামলা নেওয়ার আগে উভয় পক্ষকে ডেকে সমঝোতার উদ্যোগ নিয়ে থাকে।
ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. আবদুল্লা-হেল-কাফি মনে করেন, সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন নড়বড়ে হওয়ার কারণেও আত্মহত্যা বাড়ছে। ভোগবাদী সমাজে সামান্য না পাওয়ার ঘটনায় মানুষ প্রতিক্রিয়া করছে। অল্পতেই মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে অবশ্যই পারিবারিক বন্ধন মজবুত করতে হবে। একাডেমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে নৈতিক মান বাড়াতে হবে।
এসএ





