সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) এবং ফ্রেডরিখ-এবার্ট-স্টিফটুঙ (এফ-ই-এস) বাংলাদেশ-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই বিশেষ কর্মসূচির তৃতীয় পর্ব মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট ২০২৬) সকাল সাড়ে ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী এবং দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।
টেকসই অংশীদারিত্বে সহযোগিতার বিকল্প নেই: ইইউ রাষ্ট্রদূত
অনুষ্ঠানের মূল বক্তা বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার ইইউতে তাঁর দীর্ঘ তিন দশকের কাজের অভিজ্ঞতার আলোকেই বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিবর্তনশীল ধারা উপস্থাপন করেন।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো দেশের সঙ্গে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা, পারস্পরিক জোট এবং সমান স্বার্থ রক্ষা। কোনো একপক্ষের ওপর অহেতুক নির্ভরতা সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করে না।
বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্কের ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, "আমাদের সম্পর্ক এখন কেবল অর্থনৈতিক লেনদেনে সীমাবদ্ধ নেই; এটি আরও কৌশলগত ও রাজনৈতিক অংশীদারিত্বের দিকে ধাবিত হচ্ছে।" বাণিজ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এই সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও গভীর হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
জলবায়ু সংকটের মতো বিশ্বজনীন ইস্যু মোকাবিলায় বাংলাদেশের পদক্ষেপের প্রশংসা করে মাইকেল মিলার বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান ও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হলেও এ দেশের ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা প্রশংসনীয়। জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি একটি টেকসই সমাধানের প্রস্তাব দেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক স্বার্থ ও মতপার্থক্য দূরে রেখে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং 'গ্রিন এনার্জি' নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে তার আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের সাথে সমন্বিত কূটনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
দেশের ভেতরের গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার সংস্কার সম্পর্কে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাষ্ট্রদূত স্পষ্ট করেন, উন্মুক্ত নাগরিক স্থান (open civic space) তৈরি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিত মজবুত করা এবং কঠোরভাবে আইনের শাসন নিশ্চিত করাই একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা তৈরি করে। আইন ও সুশাসনের অনুকূল পরিবেশ থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিজ থেকেই উৎসাহিত হয়, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভিত্তিকে টেকসই গতি প্রদান করে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ সরকারের মানবিক ভাবমূর্তির প্রশংসায় রাষ্ট্রদূত স্মরণ করিয়ে দেন, রোহিঙ্গা সংকট এখন নয় বছরে পদার্পণ করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে লক্ষ লক্ষ শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ অত্যন্ত মানবিক নজির গড়েছে। কক্সবাজারে চলমান বৈশ্বিক ও মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়ে ইইউ প্রতিনিধি বলেন, এই সংকট দূর করতে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই কূটনৈতিক সমাধানের ওপর ক্রমাগত চাপ বজায় রাখতে হবে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায় থেকে বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও রূপান্তর প্রক্রিয়ার ওপর ইঙ্গিত করে মিলার জানান, যেকোনো জাতীয় রূপান্তরে সময় এবং সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার লাগে। রূপান্তরের এই যাত্রায় বাংলাদেশ একা নয়; ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগী অংশীদাররা সার্বক্ষণিক পাশে থাকবে।
তরুণদের সঙ্গে সরাসরি কূটনীতির প্রয়োজনীয়তা: ঢাবি উপাচার্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ. বি. এম. ওবায়দুল ইসলাম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গঠনে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থার রূপরেখা তুলে ধরেন।
তিনি উল্লেখ করেন, আধুনিককালে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল পুরোনো পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে হস্তান্তরের চিরাচরিত কেন্দ্র নয়। বিশ্ববিদ্যালয় হলো এমন এক বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তমঞ্চ যেখানে পুরনো ধারণা বা চিন্তাধারাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়, চিন্তার মানচিত্র প্রসারিত হয় এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পথ তৈরি হয়।
কূটনীতির প্রচলিত ধারা বদলানোর তাগিদ দিয়ে উপাচার্য বলেন, জলবায়ু সংকট, আন্তর্জাতিক অভিবাসন কিংবা মানবাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়গুলো সরাসরি তরুণদের জীবন, ক্যারিয়ার এবং ভবিষ্যতের ওপর প্রভাব ফেলে। সুতরাং, সরকারি দপ্তরের বন্দিদশা কিংবা এলিট ক্লাসের আড্ডা থেকে বের হয়ে এসে কূটনীতিকে সরাসরি যুবসমাজের মুখোমুখি করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি আহ্বান জানান—আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সোচ্চার হতে, খোলামেলা প্রশ্ন তুলতে এবং সরাসরি মতবিনিময় করতে। ‘মিট দ্য অ্যাম্বাসেডর’ কর্মসূচি তরুণদের এমন এক সুযোগ করে দিয়েছে যা কেবল বিদেশি রাষ্ট্রদূতের ভাষণ শোনার প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং নিজেদের কণ্ঠস্বর বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়ার এক অনন্য ডিজিটাল সেতুবন্ধন। উপাচার্য আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়ে শিক্ষক ও গবেষকদের পারস্পরিক নেটওয়ার্ক জোরদারের পরামর্শ দেন।
সামাজিক ন্যায়বিচার ও এফইএস-এর বার্তা
অনুষ্ঠানের সূচনাতেই ফ্রেডরিখ-এবার্ট-স্টিফটুঙ (এফ-ই-এস) বাংলাদেশের রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. ফেলিক্স গ্রেদেস তাঁর প্রতিষ্ঠানের শতবর্ষী পথচলার তাৎপর্য বর্ণনা করেন।
১৯২৫ সালে শ্রমজীবী শ্রেণির অধিকার এবং শিক্ষামূলক সহায়তার দর্শন নিয়ে পথচলা শুরু করা এফইএস আজ বিশ্বজুড়ে সংলাপ, গঠনমূলক গবেষণা এবং নীতিনির্ধারণী সহযোগিতার প্রতীক। ড. গ্রেদেস বর্তমান পৃথিবীর চারটি প্রধান ঝুঁকি—দারিদ্র্য, তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য, সংকুচিত সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অনিয়ন্ত্রিত জলবায়ু পরিবর্তনকে চিহ্নিত করে তা মোকাবিলায় তরুণ সমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি বিশ্বাস করেন, আন্তর্জাতিক সহমর্মিতা ও অর্থবহ সংলাপই পারে বিশ্ব রাজনীতিকে সঠিক পথের দিশা দিতে।
কূটনীতিতে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ও সিজিএস-এর দর্শন
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী তাঁর স্বাগত বক্তব্যে এই উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করেন। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, অনেক সময় আমাদের দেশের কূটনৈতিক তৎপরতা শুধু উচ্চবিত্ত, প্রভাবশালী এবং নীতিনির্ধারক একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। সিজিএস এই বাঁধ ভেঙে সাধারণ জনগণ, গবেষক এবং শিক্ষার্থীদের সাথে কূটনৈতিকদের সরাসরি সেতুবন্ধন তৈরি করতে চায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক চেতনা, সামাজিক সংস্কার ও ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি এই মিলনায়তনকে উন্মুক্ত সংলাপের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান হিসেবে চিহ্নিত করেন।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের সভাপতি জিল্লুর রহমান। সূচনা বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি জানান, কোনো প্রকার প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতা বা বন্ধ ঘরের কূটনৈতিক পরিভাষার বাইরে এসে তরুণেরাই যেন বিশ্ব রাজনীতিকে বুঝতে পারে এবং প্রশ্ন করতে পারে—সেটাই ‘মিট দ্য অ্যাম্বাসেডর’ সিরিজের মূল সফলতা।
অংশগ্রহণমূলক উন্মুক্ত সংলাপ
বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক পর্ব শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে এক চমৎকার ও প্রাণবন্ত উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতকে সরাসরি নানা প্রাসঙ্গিক ও কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন।
বাণিজ্য ও অর্থনীতি: ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সুবিধা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বাণিজ্য পরিবেশ সৃষ্টিতে ইইউর ভূমিকা কী হতে পারে।
শিক্ষাবৃত্তি ও গবেষণা: 'ইরাসমাস মুন্ডুস' সহ ইউরোপীয় বিভিন্ন ফ্ল্যাগশিপ স্কলারশিপে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো ও গবেষণা খাত প্রসারিত করা।
জলবায়ু অর্থায়ন: ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশে ইইউর জলবায়ু তহবিলের সরাসরি ও সহজলভ্য ব্যবহার নিশ্চিত করা।
অভিবাসন ও সুশাসন: ইউরোপে দক্ষ জনশক্তি অভিবাসনের বৈধ পথ সুগম করা এবং বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা আনয়নে পরামর্শ।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত প্রতিটি প্রশ্নের সাবলীল ও স্পষ্ট উত্তর দেন। বৈশ্বিক কাঠামোর রূপান্তরে তরুণদের এই আগ্রহ ও সচেতনতার ভূয়সী প্রশংসা করে আয়োজনের পরিসমাপ্তি ঘটে।
এমএম