গত তিন মাসে চালের ঊর্ধ্বমুখী দাম নিয়ন্ত্রণে অন্তত দুই দফা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রথম দফায় আমদানি শুল্ক ২৮ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে নামিয়ে এনে এবং বাজারের ওপর দ্বিতীয় দফায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে মজুতদারি ঠেকাতে চাল কলে অভিযান চালিয়েছে।

চালের দাম যেখানে দুই দফায় বেড়েছে কেজিতে ২০ টাকা সেখানে কমেছে মাত্র ৫ টাকা। চালের দামের এই অধিক বৃদ্ধি এবং সামান্য কমতিকে বানরের তৈলাক্ত বাঁশে ওঠার সাথে তুলনা করছেন ভোক্তারা।

রাজধানীর মালিবাগ চৌধুরী পাড়ায় অবস্থিত পাইকারি চালের মোকাম সততা রাইস এজেন্সির সামনে গতকাল কথা হয় বেসরকারি কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির হিমুর সঙ্গে। চালের বাজারে বিশৃঙ্খলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, চালের দাম গত তিন মাসে দুই দফায় কেজিতে অন্তত ২০ টাকা বেড়েছে। অথচ কমেছে মাত্র ৫ টাকা।

এটা যেন বানরের তৈলাক্ত বাঁশে ওঠার মতো ঘটনা। প্রথম মিনিটে তিন ফুট উঠে পরের মিনিটে এক ফুট নামছে। সরকার আবার দাম কমানোর জন্য বাহবাও নিতে চাচ্ছে। চালের দাম এভাবে ওঠানামা করতে থাকলে দেশের মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সততা রাইস এজেন্সির ম্যানেজার কলিম উল্লাহ জানান, তার দোকানে কেবল পাইকারি হিসেবে চাল বিক্রি হয়। গত এক সপ্তাহে মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি ৫ থেকে ৬ টাকা এবং সরু চালের দাম ২ থেকে ৩ টাকা কমেছে বলে জানান তিনি। তার দেয়া হিসাব অনুযায়ী গত তিন মাসে চালের দাম দুই দফায় কেজিপ্রতি ২০ থেকে ২২ টাকা বেড়েছে। কমেছে ৫ থেকে ৬ টাকা। মোটা চাল প্রতি কেজি ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা, মিনিকেট ৬০ থেকে ৬২ টাকা, নাজিরশাইল ৬১ থেকে ৬৪ টাকা এবং মাঝারি মানের চাল বিক্রি হচ্ছে ৫২ থেকে ৫৪ টাকা দরে।

রাজধানী ঢাকার কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, পাইকারির পর খুচরা বাজারেও চালের দাম কমতে শুরু করেছে। কিন্তু পাইকারিতে যে হারে কমেছে, খুচরা বাজারে দাম এখনো সেই হারে কমেনি। গত তিন দিনে পাইকারিতে মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি ৫ টাকা কমলেও খুচরায় কমেছে মাত্র ২ টাকা।

মিনিকেট চাল পাইকারিতে প্রায় ৩ টাকা কমলেও খুচরায় কমেছে মাত্র ১ টাকা। এর কারণ হিসেবে খুচরা ব্যবসায়ীদের যুক্তি, দাম কমার আগে তারা অনেক চাল কিনে রেখেছিলেন। এ কারণে পাইকারি বাজারের মতো খুচরায় দাম ততটা কমেনি। বেশি দামে কেনা চাল কম দামে বিক্রি করা সম্ভব নয়। তা ছাড়া চালের দাম আবারো বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন অনেক বিক্রেতা। কাজেই মজুদ ধরে রাখতে অনেকে সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে।

চালের বাজারে এমন অস্থিরতার জন্য সরকার দূরদর্শিতার অভাবকেই দায়ী করছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি গতকাল বলেন, চাহিদা ও জোগান সম্পর্কে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সচেষ্ট ছিল না। সরকারের নিজস্ব মজুদ স্মরণকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এলেও তারা মজুদ বাড়ানোর জন্য সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। এরই মধ্যে বন্যায় ফসলহানি হয়েছে। সরকার সেটাও আমলে নেয়নি।

আমদানি শুল্ক কমাতেও সরকার অনেক দেরি করে ফেলেছে জানিয়ে তিনি বলেন, এখন মিল পর্যায়ে যে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে তা থেকে দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল আসবে বলে মনে হয় না। সরকারের নিজস্ব মজুদ কম থাকায় মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার সুযোগও কম বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সরবরাহ ঘাটতির কারণে চালের আমদানি শুল্ক ২৮ শতাংশ থেকে দুই দফায় কমিয়ে মাত্র ২ শতাংশে আনা হয়েছে। আরো এক ধাপ এগিয়ে কোনোরূপ বিনিয়োগ ছাড়াই চাল আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলার সুযোগ করে দিয়েছে ব্যাংকগুলো। সুযোগ পেয়ে বিদেশ থেকে ব্যাপক হারে চাল আমদানি করছেন বেসরকারি উদ্যোক্তারা।

সরকারিভাবে চাল আমদানি করা হচ্ছে ভারত, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশ থেকে। মজুদদারদের ধরতে অভিযান চালানো হয় বিভিন্ন চালকলে। চালকল মালিকদের সাথে সৃষ্ট বিরোধ থামে বৈঠক ও বিতর্ক দিয়ে। দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দেয়ার আগে একাধিক দাবি আদায় করে নেন তারা সরকারের কাছ থেকে।

কিন্তু সেই অর্থে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ মিলমালিক ও পাইকারি আড়তদারেরা সিন্ডিকেট করে চালের দাম বাড়িয়েছেন। তাদের সাথে যুক্ত ছিলেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরাও। তারা যদি উপযুক্ত সময়ে শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নিতেন তাহলে সিন্ডিকেটকারীরা জনগণের পকেট থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ছিনিয়ে নিতে পারত না। দেশবাসী আরো অন্তত ৫ থেকে ১০ টাকা কম দামে চাল খেতে পারতেন।

আমদানি বৃদ্ধির পরও চালের দাম না কমার কারণ হিসেবে রাজধানীর বাদামতলীর লক্ষ্মী রাইস এজেন্সির মালিক নূর মোহাম্মদ বলেন, চাল আমদানি বেড়েছে এ কথা সত্যি। তবে বাজারে চালের যে চাহিদা রয়েছে আমদানি বা সরবরাহ সে তুলনায় বাড়েনি। তা ছাড়া চালের আমদানি শুল্ক এমন সময়ে এসে কমানো হয়েছে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বাড়তি।

এলসির মূল্য বেড়ে যাওয়ায় প্রচুর চাল আমদানি হলেও কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, প্রতিযোগিতার বাজারে মিলপর্যায়ে চালের দাম কমলে যেমন আমাদের কমাতে হয়, তেমনি মিলপর্যায়ে দাম বাড়লে আমাদের বাড়তি দামেই বিক্রি করতে হয়। উৎপাদন ও চাহিদার সঠিক হিসাব না থাকায় বাজারে চালের সঙ্কট কাটছে না বলেও দাবি করেন তিনি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযাযী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে ৩ কোটি ৪৯ লাখ ৬৮ হাজার টন চাল উৎপাদিত হয়েছে; যা আগের বছরের চেয়ে ২ লাখ ৫৮ হাজার টন বেশি।

চলতি অর্থবছরে উৎপাদনের লক্ষ্য ৩ কোটি ৫০ লাখ টন। হওরের পরিস্থিতি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করেছিলেন সংশ্লিষ্টরা। অথচ আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম তখন দাবি করেন হাওর ডুবে গেলেও চালের কোনো ঘাটতি হবে না। তার দাবি ছিল, বাংলাদেশে বছরে ১৫ থেকে ২০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকে।

হাওরে ছয় লাখ টন কম উৎপাদন হলেও কোনো ঘাটতি হবে না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর তখন বলেছিল, এবার বোরো মওসুমে ৪৮ লাখ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। এ থেকে ১ কোটি ৯১ লাখ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্য ঠিক করেছিল সরকার। তবে হাওর তলিয়ে যাওয়ায় তা কিছুটা কম হওয়ার আশঙ্কা আছে। হাওরের ২ লাখ ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছিল। সেখান থেকে প্রায় ৯ লাখ টন চাল উৎপাদনের আশা করেছিল অধিদপ্তর। নয়া দিগন্ত

জেড