মানুষের ডাকে সাড়া দিয়ে বকের ছানারা উড়ে এসে বসে হাতের উপরে। তুলে দেয়া খাবার নিয়ে আবার উড়ে চলে যায় নিজ গন্তব্যে। অবিশ্বাস্য শোনালেও এই দৃশ্য গাইবান্ধার ঘাঘট আর ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকায় গড়ে ওঠা পাখির অভয়াশ্রমের।

গাইবান্ধার জেলার ফুলছড়ি উপজেলার মদনেরপাড়া ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কদমতলা গ্রামে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিবিড় ভালোবাসায় গড়ে উঠেছে পাখির অভয়াশ্রম। অভয়ারণ্যে নিজেদের প্রজনন আর বংশবিস্তার করে চলছে পাখিরা।

কদমতলা গ্রামের ক্ষীতিশ চন্দ্র ও অনিল চন্দ্র বলেন, ‘আয় আয় করে ডাকলে বকের বাচ্চাটি হাতের ওপর এসে বসে। এ দৃশ্য কেউ না দেখলে বিশ্বাস করবে না।’বন-বাদাড় আর বাঁশের ঝাড় উজাড় হয়ে যাওয়ায় অনেক প্রজাতির পাখি এখন আর চোখে পড়ে না। আবাদি জমি আর নতুন নতুন বসতবাড়ি গড়ে ওঠায় ঝোপ-জঙ্গল সব নিঃশেষ হচ্ছে। নদী-নালা, খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়ায় খাদ্য সংকটের কারণে অন্যত্র চলে যাচ্ছে পাখি।

এ অবস্থায় গাইবান্ধার ঘাঘট ও ব্রহ্মপুত্র নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয় পাখির অভয়াশ্রম। বিদেশি সাদা বড় বক, কানি বক, পানকৌড়ি, রাতকানা ইত্যাদি নানা ধরনের পাখির বাস সেখানে। চোরা শিকারিদের হাত থেকে নিরাপদ এ অভয়াশ্রম।

মদনেরপাড়া গ্রামের সোলায়মান আলী (৪৫) ও তার ভাই মন্টু মিয়ার বাড়ির পেছনে বাঁশঝাড় জুড়ে কয়েক হাজার পাখির বাস। বাঁশঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে বাসা বেঁধেছে এসব পাখি। মাঝেমধ্যে পাখিদের খাবার দেন সোলায়মান আলীর স্ত্রী রোজিনা বেগম। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি তখন ভিড় জমায় উঠানে তার চারপাশে।
রোজিনা বেগম বলেন, প্রায় এক যুগ ধরে এসব বুনো পাখির সঙ্গে আমাদের বাস। এখন আর ওরা বুনো নেই। আমাদের কথা শোনে। ওদের ডাকলে কাছে আসে। হাত থেকে খাবার তুলে খায়। গায়ে এসে বসে। পাখির নরম ডানায় হাত বোলাতে খুব ভালো লাগে। নিজেদের আদরের ধন মনে হয় তখন।

নার্সারি মালিক সাইদুর রহমান বলেন, রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় কখনো কখনো পাখির বিষ্ঠা এসে গায়ে পড়ে। কাপড় নষ্ট হয়ে যায়। কাপড়টা তখন পাল্টে নেই। কিন্তু পাখির কোনো ক্ষতি করি না। চিড়িয়াখানায় মানুষ পাখি দেখতে যায়, সেই পাখি এখন আমাদের দুয়ারে। বাইরে থেকে মানুষ এই পাখি দেখতে আসে এখানে। এটা আমাদের গর্বের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আহাদ আলী জানান, আমরা কাউকে পাখি মারতে দিই না। ওরা আমাদের সন্তানের মতোই থাকে এখানে। ওদের কিচিরমিচির শব্দে আমাদের ঘুম ভাঙে। ওদের ডানা ঝাঁপটানির শব্দে পালায় আপদ-বিপদ।