বিদ্যুতের অসহনীয় লোডশেডিং-এ জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। একদিকে তীব্র গরম, অন্যদিকে মারাতিরিক্ত লোডশেডিং।

ফলে হাঁসফাঁস করছে টাঙ্গাইলবাসী। এরই মধ্যে রমজান শুরু হয়েছে। বিদ্যুতের লোডশেডিং অব্যাহত থাকলে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়বে।টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকার মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে ২৪ ঘন্টায় ১৫ থেকে ২০ বার লোডশেডিং হয়।

দিঘুলিয়া এলাকার হেকমত আলী বলেন, রাত-দিন মিলে প্রায় ১০-১২ বার লোডশেডিং হয়। লোডশেডিংয়ের কারণে শান্তিমতো ঘুমাতেও পারি না। নামাজ ও খাবার সময়ও অনেক সময় বিদ্যুত থাকে না।

বাঘিল ইউনিয়নের দইন্যা এলাকার মো. হানিফ মিয়া বলেন, তিন মাস যাবৎ আমাদের এলাকার ট্রান্সফরমার তিন বার বিকল হয়েছে। বিদ্যুৎ থাকে না বললেই হয়। লোডশেডিং তিনগুণ বিদ্যুৎ বিলও তিনগুণ।

আগে বিল আসতো ২৫০ থেকে তিনশ টাকা। বর্তমানে পাঁচ থেকে ছয়শ টাকা বিল আসছে। এই ভোগান্তী থেকে রক্ষা চাই।

কাগমারা এলাকার মো. হযরত আলী বলেন, বর্তমানে ভোগান্তীর আরেক নাম লোডশেডিং। বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে।

একই এলাকার মো. হুমায়ুন মিয়া বলেন, বিদ্যুতের কারণে ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া করতে অসুবিধা হয়। রাতের বেলায় মোমের আলোতে লেখা-পড়া করতে হয়। নিরালার মোড় এলাকার কম্পিউটারের দোকানদার মো. জুয়েল মিয়া বলেন, বিদ্যুতের কারণে দোকানের কোন কাজই করতে পারি না। এখানে দিনে ৭-৮ বার বিদ্যুৎ চলে যায়। মাঝে-মধ্যে ৩-৪ ঘন্টায়ও বিদ্যুৎ আসে না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টাঙ্গাইলের কোন কোন এলাকায় একটানা দুই তিন ঘন্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। অতিরিক্ত লোডশেডিং ও তীব্র তাপদাহে অফিসগামী মানুষ, শ্রমিক, স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী এবং অল্প বয়সের শিশুরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। লোডশেডিং, বিদ্যুতবিভ্রাট ও লো-ভোল্টেজের কারণে প্রায় সকল কাজ ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

যান্ত্রিক ও ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। বিদ্যুতের ঘনঘন আসা-যাওয়া এবং গ্রামে দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিংয়ে আবাসিক গ্রাহকরা পড়েছে চরম দুর্ভোগে। বিদ্যুতের ঘনঘন আসা-যাওয়ার ফলে ইন্টারনেট সংযোগেও দেখা দিয়েছে বিভ্রাট। ফলে অফিস আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জরুরী কাজসহ সংবাদকর্মীদের সংবাদ প্রেরণেও ব্যাপক সমস্যা হচ্ছে।

বিদ্যুত বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার কাছ থেকে জানা যায়, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় কিছুটা দুর্বলতার কারণে ঝড়বৃষ্টি হলেই বিদ্যুত বিভ্রাট হয়। দুর্বল সঞ্চালন, বিতরণ ব্যবস্থা এবং বেশকিছু পুরনো ও নিম্নমানের ট্রান্সফরমারের কারণে এই বিভ্রাট বেশি হচ্ছে।

বিদ্যুৎ অভিযোগ কেন্দ্রের সেলফোনগুলোতে অধিকাংশ সময় কাউকে পাওয়া যায় না। তীব্র গরমে লোডশেডিং হওয়ায় শিশু, নারী ও বয়ষ্ক মানুষের কষ্টের সীমা নেই। ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা ব্যাহত হচ্ছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড টাঙ্গাইলের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহাদৎ আলী জানান, টাঙ্গাইল পৌর এলাকায় ডিভিশন ১ এর অধীনে প্রায় ২৪ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সরবরাহ রয়েছে ১৮ থেকে ২০ মেগাওয়াট। ন্যাশনাল গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। ফলে এ ঘাটতি থাকছে বলে তিনি জানান।

বৈল্লা গ্রিড ডিভিশন ২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ারুল ইসলাম জানান, টাঙ্গাইল জেলায় ১৪৫ থেকে ১৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ৮০ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ ঘাটতি ও ট্রান্সফরমারসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশের ওভার লোডিংয়ের কারণে লোডশেডিং হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় বর্তমানে কম বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে। এজন্য লোডশেডিং হচ্ছে। তবে কিছুদিনের মধ্যেই এ সমস্যা কমতে পারে বলে জানান তিনি।

এদিকে বিদ্যুৎ চুরির ঘটনাও ঘটছে। টাঙ্গাইলের বিসিক শিল্প নগরীর উত্তর পূর্বদিকে এ আর টেক্সটাইল মিল নামে একটি প্রতিষ্ঠান ছিল।এলাকাবাসীর কাছ থেকে জানা যায়, মিলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যন্ত্রাংশ বিক্রি করার পর মিলের বিদ্যুৎ লাইনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করে রাতে চোরাই লাইন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

সেখানে ব্যাটারী চালিত অটো চার্জ দেয়া হয় প্রতি রাতে। বিদ্যুৎ বিভাগের কিছু অসৎ কর্মকর্তার যোগসাজশে এসব হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। শহরের কয়েক জায়গায় এরকম বিদ্যুত চুরি হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এর শিকার হচ্ছে গ্রাহকরা।

এ ব্যাপারে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড টাঙ্গাইলের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহাদৎ আলী বলেন, বিদ্যুৎ ধরে রাখার জিনিস নয়। বিদ্যুৎ আসলেই তা বিতরণ করতে হয়। সারা দেশের তুলনায় টাঙ্গাইলে লোডশেডিং অনেক কম। কোন অতিরিক্ত বিল আদায় করা হয় না বলে তিনি জানান।
কাওছার/জেড