সামিয়ার মা যখন কাঁদছিলেন, তখনও সামিয়া নির্বিকার। খেলার মতো তেমন কোনো উপকরণই তার হাতের কাছে ছিল না। কখনও নিজের চুলে আটকানো ক্লিপ খুলে নাড়াচাড়া করছিল। কখনও আবার মায়ের ভ্যানিটিব্যাগ খুলে খুচরো পয়সা নিয়ে মুগ্ধ হয়ে দেখছিল ।
সে বুঝতেই পারছিল না অদূরে আগুনের কুণ্ডে আটকা পড়ে আছেন তার বাবা। বোঝার কথাও না ওর, বয়স যে মাত্র তিন বছর চার মাস। কিন্তু ওর মা রূপালী জানেন সামিয়ার বাবা মাসুমের ওই অগ্নিকুণ্ড থেকে জীবিত ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনাই নেই। তবু এমন অসম্ভব স্বপ্নের কথাই বলছিলেন রূপালী তার প্রতিবেশী বোন সালমার কাছে, 'দোয়া কর না। 'ওপরওয়ালা চাইলে কত কিছুই তো করতে পারেন'
টঙ্গীর টাম্পাকো ফয়েলসের অদূরে জেলা প্রশাসকের তথ্যকেন্দ্রের সামনের বারান্দায় বসেছিলেন রূপালী। কোলে তার কন্যা সামিয়া। হাতে মেয়ের সঙ্গে বাবার হাস্যোজ্জ্বল একটি ছবি। রূপালী জানালেন, তার স্বামী মাসুম আহমেদ ১২-১৩ বছর ধরে কাজ করছেন টাম্পাকোতে। তাদের বিয়ে হয়েছে বছর পাঁচেক আগে। বিয়ের পর কোনো দিনই স্বামীকে দেরি করে অফিসে আসতে দেখেননি। শনিবার সকালেও অফিস শুরুর নির্ধারিত সময় সকাল ৬টার আগে অফিসে ঢুকে গিয়েছিলেন।
সময় যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে টাম্পাকোর নিখোঁজদের তালিকা। শনিবার দুর্ঘটনার পরপরই টাম্পাকোর কর্মীদের সঙ্গে আলাপে ধারণা পাওয়া গিয়েছিল, তিন শিফটে সাড়ে ৫০০ জনের মতো কর্মী হবে তাদের। প্রত্যেক শিফটে কাজ করেন গড়ে ২০০ জনের মতো। তবে আগের দিন ছিল শুক্রবার। তাই যাদের ওভারটাইম করার ইচ্ছা ছিল, তারাই কেবল কাজ করতে গিয়েছিলেন। তাই ওই সময় রাতের শিফটের ১০০ জনের বেশি কর্মী ভেতরে ছিলেন না বলে অনুমান করেছিলেন তারা।
নিখোঁজদের একজন রফিকুলের ছেলে রাকিবুলের কণ্ঠে আক্ষেপ ঝরে পড়ল, শুক্রবার সন্ধ্যায় আব্বা অসুস্থ বোধ করছিলেন। তবু ওভারটাইম করলে কয়েকটা বাড়তি টাকা রোজগার হবে বলে অফিস করতে এসেছিলেন। রাকিবুল এই জন্য নিজেকেই দায়ী করছিল। সামনে তার এসএসসি পরীক্ষা। তার প্রাইভেট পড়ার খরচ জোগানোর জন্যই বাবা ওভারটাইম করছিলেন। রাকিবুল থাকে তাদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে। তার বাবা রফিকুল মা এবং অন্য দুই ভাইবোনকে নিয়ে টঙ্গীতেই থাকতেন।
নিখোঁজ মুরাদের মামী রিনা বেগম অপেক্ষা করছিলেন তার দুই মেয়েকে নিয়ে। জহিরুলের স্ত্রী নূরুন্নাহার শনিবার বিকেলে এসে পৌছেছেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থেকে। সেই থেকে একবার মাত্র রাত ১২টার দিকে গিয়েছিলেন টাম্পাকোরই এক কর্মীর বাসায়। ভোর না হতেই আবার ফিরে এসেছেন। স্বামীর লাশ হলেও সঙ্গে নিয়ে ফিরতে চান তিনি।
টাম্পাকোর ভেতর থেকে ঘুরে আসা ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মী বললেন, 'ভেতরে কয়েকটি লাশ আমি দেখেছি। তবে সবই পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। চেনার কোনো উপায় নেই।' নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফায়ার সার্ভিসের ওই কর্মী তার বক্তব্যের সমর্থনে মোবাইল ফোনে আনা একটি ছবিও দিলেন, ছবিটা এমনই বীভৎস যার দিকে তাকানোই যায় না। প্রকাশ তো পরের বিষয়।
এসএ





