রনাঙ্গনের লড়াকু সৈনিক মওলা বকর ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোকাদ্দেস হোসেন। দেশকে ভালোবেসেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুক্তি সংগ্রামে। জীবন বাজি রেখে লড়েছেন ৬/৭ টি সম্মুখ যুদ্ধ।

পরিকল্পনা করে সহযোদ্ধাদের সাথে নিয়ে গুড়িয়ে দিয়েছেন একের পর এক আস্তানা। শুত্রু মুক্ত করে ছিনিয়ে এনেছেন স্বাধীনতা। যুদ্ধে পাকহানাদার বাহিনীর গুলিতে গুলিবৃদ্ধ এবং গ্রেনেডের স্প্রীলিংটারে গুরুত্বর আহতও হয়েছেন।

পাকবাহিনী দুই দিন আটকে রেখে নির্যাতন করে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে দেয়। এতোকিছুর পরও এখনও জোটেনি তাদের ভাগ্যে যুদ্ধাহত ভাতা। মুক্তিযোদ্ধা মওলা বক্স এবং কমান্ডার মোকাদ্দেস হোসেন বলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছি।

যুদ্ধে পাকবাহিনী নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছি। গ্রেনেডের আঘাতে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছি। অথচ সেই সম্মান পায়নি। যুদ্ধাহত ভাতা আজো জুটিনি। অথচ যারা ভুয়া যুদ্ধাহত তারা পাচ্ছে যুদ্ধাহত ভাতাসহ বিভিন্ন সুবিধা।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের কমান্ডার মোকাদ্দেস হোসেন। তার নেতৃত্বে ২৬ জন মুক্তিযোদ্ধা সম্মুখ যুদ্ধে অংশনেয়। এছাড়াও তিনি পরিচালনা করেন একাধিক সফল অভিযান। ‘৭১ সালে ১৮ বছরের টগবগে তরুন মোকাদ্দেস।

স্বাধীনতার ঘোষনার পরই তিনি ট্রেনিং নেওয়ার জন্য চলে যান ভারতে। ট্রেনিং শেষ করে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। ছোট বড় ৬টি সম্মুখ যুদ্ধে তিনি অংশনেন। তিনি বলেন, যুদ্ধের সময় বন্দুকের কার্টিস দিয়েই যুদ্ধ পরিচালনা করা হতো।

গাছেরদিয়াড়, ভুরকারবাঁধ, সাঁড়া হার্ডিঞ্জ ব্রীজ এ ভয়াবহ সম্মুখ যুদ্ধে তিনি প্রানপন লড়েছেন। তিনি স্মৃতি চারন করে বলেন, ৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর হার্ডিঞ্জ ব্রীজে গ্রেনেড নিক্ষেপ করে ভেঙ্গে ফেলা হয়।

এর আগেই আমরা হার্ডিঞ্জ ব্রীজ এলাকায় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। তখন হার্ডিঞ্জ ব্রীজের আকাশে মেঘ বিমান, হান্ডার বিমান এবং ফাইটার বিমান উড়তে ছিল। হঠাৎ করেই দেখি মেঘ বিমান আকাশে মেঘ ছড়িয়ে অন্ধকার সৃষ্টি করে চলে যায়।

এরপর হান্ডার বিমান দিয়ে পর পর দু’টি শক্তিশালি গ্রেনেড নিক্ষেপ করে ভেঙ্গে ফেলা হয় হার্ডিঞ্জ ব্রীজ।

তিনি বলেন, ওই দিন সাঁড়া হার্ডিঞ্জ ব্রীজ এবং ভেড়ামারা রেলগেট এলাকায় ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। যুদ্ধের সময় গ্রেনেডের স্প্রীলিংটারে তিনি গুরুত্বর আহত হন। যুদ্ধে আমার সহযোদ্ধা চাঁদ গুলিবৃদ্ধ হয়ে নিহত হয়।

আমরা ১২ ডিসেম্বর তার মৃত দেহ ভেড়ামারায় নিয়ে আসি এবং ১২ ডিসেম্বরই ভেড়ামারা শুত্রু মুক্ত হয়।

৭১ সালে ডিগ্রী ফাইনাল ইয়ারের মেধাবী ছাত্র ছিলেন মওলা বক্স। ২৩ মার্চ পকিস্থানের প্রজাতন্ত্র দিবসের দিনেই ভেড়ামারায় উড়ানো হয় লাল সবুজের পতাকা।

২৫ মার্চের কালোরাত্রির পর স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের ট্রেনিং দেওয়ার লক্ষে ভেড়ামারা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে গড়ে তোলা হয় ট্রেনিং ক্যাম্প। এখানে ভেড়ামারার প্রায় ৪ শতাধিক শিক্ষার্থীকে ট্রেনিং দেওয়া হয়।

এ খবর ছড়িয়ে পড়লে পাকহানাদার বাহিনী নিয়ন্ত্রনে নেয় স্কুলটির। এরপরই মওলা চলে যান ভারতের শিকারপুর ট্রেনিং ক্যাম্পে। ট্রেনিং শেষ করে অগাষ্ট মাসের প্রথম দিকেই প্রাগপুর বর্ডার দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন।

এরপর অংশনেন ছোট বড় বেশ কয়েকটি সম্মুখ যুদ্ধে। তিনি বলেন, নভেম্বর মাসের দিকে বড় একটি অপারেশন সফল করার লক্ষে আমি এবং আমার বন্ধু সিরাজ খাঁড়ারা এলাকায় অবস্থান নিই।

খবর পেয়ে রাজাকাররা আমাদের ধরিয়ে দেয় পাকবাহিনী কাছে। আমাদের হত্যার উদ্দ্যেশে পাকহানাদার বাহিনী দুই দিন দুই রাত পা ঝুলিয়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করে।

এবং ব্যানেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যার চেষ্টা করে। পরে হত্যার উদ্দ্যেশে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় প্রাগপুর ডাঙ্গের বাজারে। সেখানে হত্যার চেষ্টাকালে আমাদের পরিচিত ইনতাজ আহম্মেদ রক্ষা করে। গুরুত্বর আহতাবস্থায় ৩ দিনপর আমরা মুক্ত হই।

তিনি বলেন, সে সময় আমাদের আটক করে নির্যাতনের খবর পাকিস্থানের রেডিও থেকে ২ দিন ফলাও করে প্রচার করা হয়। এরপর সুস্থ হয়ে আবারও ঝাঁপিয়ে পড়েন দেশ রক্ষার সংগ্রামে।

এসএইচ