পুরান ঢাকার ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত তিনি। কেউ বলেন ঠাণ্ডা মাথার কিলার। কেউ বলে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ। হত্যাসহ বহু মামলার এই আসামী র্যা ব ও পুলিশের খাতায় শহীদ কমিশনার হিসেবে পরিচিত। তবে তাঁর পুরো নাম সাইদুর রহমান ওরফে শহীদ কমিশনার।
রাজধানীর ৮৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার এই সাইদুর রহমান। তবে তার ভয়ঙ্কর সব কর্মকাণ্ডের কারণে খুব দ্রুত পরিচিত পান শহীদ কমিশনার হিসেবে। পুরান ঢাকার সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া ও শ্যামপুর এলাকার অপরাধ জগতের সম্রাটও বলা হয় তাকে। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
আজ মঙ্গলবার ভোররাতে সেই দুর্ধর্ষ শহীদ কমিশনারের রাজধানীর গেন্ডারিয়া এলাকার বাসায় তল্লাশি চালায় র্যা্পিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন। অভিযানে অবৈধ অস্ত্রসহ ২৩ রাউন্ড শর্টগানের গুলি ও ১২ রাউন্ড পিস্তলের গুলিসহ সহিদ কমিশনারকে আটক করেছে র্যাউব।
র্যা বের আইন ও গণমাধ্যম শাখার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাদিরা খাতুন এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, রাত ৩টার দিকে শহিদ কমিশনারের গেন্ডারিয়ার সতীশ সরকার লেনের বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। সেখান থেকে তিনটি বিদেশি পিস্তল, তিনটি ম্যাগজিন ও ৬২ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। তাকে র্যাীব-১০ এর কার্যালয়ে আটক রাখা হয়েছে। পরে গেন্ডারিয়া থানায় হস্তান্তর করা হবে।
যে কারণে গ্রেফতার শহীদ কমিশনার
ফাঁসির দণ্ডাদেশ থেকে মুক্তির পর ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-৬ (সূত্রাপুর-কোতোয়ালি) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। এরপর তিনি নির্বাচনের মাঠে আওয়ামী লীগের হয়ে ক্যাডার বাহিনী নিয়ে সক্রিয় হন।
সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘ দিন আত্মগোপনে থাকার পর বিরোধী দলের ডাকা হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি শুরু হলে প্রকাশ্যে আসেন শহীদ কমিশনার। স্বতন্ত্র এমপি প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়াতে তার পক্ষে বিশাল ক্যাডার বাহিনী এলাকাবাসীকে ভয় দেখিয়ে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করেন।
গত মাসের ২ জানুয়ারি তাঁর গেন্ডারিয়া বাসায় তল্লাশি চালায় র্যায়রের ১০ সদস্যের একটি দল। ওই সময় র্যাঁব অবৈধ অস্ত্রসহ ২৩ রাউন্ড শর্টগানের গুলি ও ১২ রাউন্ড পিস্তলের গুলি জব্দ করে। তিনটি আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে শর্টগান ও পিস্তলের লাইসেন্স থাকলেও উদ্ধার করা রিভলবারের লাইসেন্স ছিল না। ওই ঘটনায় শহীদ কমিশনারের সহযোগী হাফিজুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। এঘটনায় গেন্ডারিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করে পুলিশ।
স্থানীয় সূত্র জানায়, একটি হত্যা মামলায় ১০ বছর জেল খাটার পর সম্প্রতি তিনি জেল থেকে ছাড়া পান। জেল থেকে বেড়িয়ে তিনি চির চেনা পথে পা বাড়ান। শুরু করেন চাঁদাবাজি, গেন্ডারিয়া সূত্রাপুর এলাকাসহ রাজধানীর অনেক স্থানেই আধিপত্য স্থাপন করেছেন তিনি। একারণে ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে শিল্পপতি পর্যন্ত সকলেই তার কথায় উঠে আর বসে। কেউ কথা না শুনলে প্রথমে হুমকি-ধামকি। এর পরেও কাজ না হলে ওপারের টিকেট হাতে ধরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করতেন এই শহীদ কমিশনার। অতিষ্ট এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী মানুষ প্রধানমন্ত্রী বরাবর লিখিত অভিযোগও করেছে একাধিকার।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, সংসদ নির্বাচনের অজুহাতে শহীদ কমিশনার পুরান ঢাকায় নতুন করে চাঁদাবাজি শুরু করেন। এঘটনায় সংশ্লিষ্ট এলাকার ব্যবসায়ীরা আতঙ্কিত হয়ে পুলিশ প্রশাসনের কাছে একাধিবার অভিযোগ করে। এতে কোনো প্রতিকার না হওয়ায় শহীদের হাত থেকে রক্ষা পেতে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিতভাবে আবেদনও করা হয়।
সূত্রাপুর এলাকাবাসী অভিযোগ করে বলেন, অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সন্ত্রাসী শহীদ অংশ নেয়ার সুযোগ পাওয়ায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দী জাতীয় পাটির প্রার্থী অ্যাডভোকেট কাজী ফিরোজ রশীদের প্রধান নির্বাচনী অফিস লালকুঠিরেও অস্ত্র হাতে মহড়া দেয় শহীদ কমিশনারের ক্যাডার বাহিনী।
সূত্রে জানা গেছে, শহীদ কমিশনারের পক্ষে কাজ করার জন্য সূত্রাপুর ও কোতোয়ালি থানা এলাকার সব স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের ভোজসভায় দাওয়াত করেন তিনি। নিয়মিত তার বাড়িতে কয়েক'শ শিক্ষককে দাওয়াত করে খাওয়ানো হয়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, শহীদ লোকজনকে ডেকে আনেন আলোচনার কথা বলে। আর তারা ফিরে যান লাশ হয়ে। সূত্রাপুর, গেণ্ডারিয়া ও শ্যামপুরের অপরাধ জগতের একসময়ের সম্রাট ছিলেন তিনি। অভিযোগ আছে, বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডে তিনি ব্যবহার করেছেন কালা জাহাঙ্গীর আর ডাকাত শহীদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় সন্ত্রাসীকে।
একাধিক মামলার আসামী শহীদ কমিশনার
পুলিশ ও র্যা ব সূত্রে জানা গেছে, অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান মণ্ডল হত্যায় নিম্ন আদালতে শহীদের বিরুদ্ধে ফাঁসির দণ্ডাদেশ হয়। ১০ বছর জেল খাটার পর উচ্চ আদালত থেকে তিনি খালাস পান। তার বিরুদ্ধে সেন্টু ও শাহাদাত হত্যা মামলার কার্যক্রম উচ্চ আদালতে থেমে আছে। ঢালকানগরের সেলিম, ভাট্টিখানার মাহবুব, সূত্রাপুরের নাসির, মিল ব্যারাকের বুংগা বাবু, মাইকেল, ফরিদাবাদের আনু, পিন্টু, পিন্টুর ভাই সেন্টু, পোস্তগোলার শাহাদাৎ কমিশনার, সুমন, ফরিদাবাদ আলমগঞ্জের বাদল এবং কেবি রোডের সেলিম হত্যা মামলার আসামি হিসেবে আলোচিত শহীদ কমিশনার। এসব হত্যা মামলার বেশ কয়েকটিতে তিনি জেলও খেটেছেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে রয়েছে চাঁদাবাজির ৩ ডজন মামলা।
গ্রেফতারের বিষয়ে র্যা বের বক্তব্য
র্যা ব-১০ এর অপারেশন অফিসার সিনিয়র এএসপি ফজলে রাব্বি জানান, ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত শহীদ কমিশনারের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি হত্যা মামলা রয়েছে। অনেক মামলা বিচারাধীন। একটি হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত শহীদ সম্প্রতি জেল থেকে ছাড়া পান। এতাবস্থায় তিনি এলাকায় এসেই চাঁদাবাজি শুরু করেন। অবৈধ অস্ত্র কাছে রাখা ও তা ব্যবহারও করে আসছিলেন তিনি। এ সংক্রান্ত সুনিদিষ্ট প্রমাণ ও অভিযোগ থাকায় তাঁকে মঙ্গলভার ভোরে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রচলিত অস্ত্র আইনে গেন্ডারিয়া থানায় একটি মামলা হয়েছে। র্যা বের-১০ পক্ষ বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন ডিএডি মিতি বিকাশ।
[b]ঢাকা, জেইউ, ৪ জানুয়ারি (টাইমনিউজবিডি.কম) // এসআর[/b]
জাতীয়
যে কারণে গ্রেফতার দুর্ধর্ষ শহীদ কমিশনার
পুরান ঢাকার ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত তিনি। কেউ বলেন ঠাণ্ডা মাথার কিলার। কেউ বলে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ। হত্যাসহ বহু মামলার এই আসামী র্যা ব ও পুলিশের খাতায় শহীদ কমিশনার





