"পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে বিড়ি খাচ্ছি, অহন কি বাদ দিবার পারুম, অনেকবার ভাবছি ছাইড়া দিমু কিন্তু পারি নাই" ডান হাতে ধরা সিগারেটের ধুয়া ছাড়তে ছাড়তে কথাগুলো বলছিলেন ষাঁটোর্ধ বয়োবৃদ্ধ আব্দুল করিম মিঞা। পেশায় তিনি বাবুর্চি। গ্রাম নারায়নগঞ্জ। ঢাকার একটি হোস্টেলে রান্নার কাজ করেন। ছেলে-মেয়ে তিনজন। দুই ছেলেই সংসারের হাল ধরেছেন। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন সরকারি এক কর্মকর্তার সঙ্গে।
আব্দুল করিম মিঞা ১৮ বছর বয়স থেকেই ধুমপান করছেন। মরণ-ব্যাধি যক্ষার হাত থেকে বাঁচলেও বাঁচতে পারেননি বুকের ব্যাথা এবং সংক্রামক কাঁশি থেকে। তার মতে বিড়ি সিগারেটের জন্য তিনি যত টাকা খরচ করেছেন সেগুলো সঞ্চয় করলে অনেক টাকার মালিক হতেন। ধুমপান বর্জন দিবস উপলক্ষে ধুমপান বর্জন করতে বললে তিনি বলেন, "অনেকবার ভাবছি ছাইড়া দিমু কিন্তু পারিনাই। তবে এবার রমযানে ছাইড়া দিমুই"।
বয়বৃদ্ধ আব্দুল করিম মিঞার ন্যায় অনেকেই হয়ত প্রতিবছরই ভাবেন ধুমপান ছেড়ে দিবেন। নানা কারণে তারা ছাড়তে না পারলেও তামাক বর্জন দিবস কিন্তু তাদের প্রতিবছরই ধুমপান ছাড়তে আহ্বান জানায়। কিন্তু এই আহ্বান কতটাই বা ফল দিচ্ছে?
আজ(৩১মে) "বিশ্ব তামাক বর্জন দিবস"। বয়োবৃদ্ধ আব্দুল করিম মিঞার সাথে তাই কথা হচ্ছিলো তামাক বর্জন নিয়ে।
১৯৮৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে প্রতিবছরের একটি দিনকে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস হিসাবে উদযাপন করার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। কিন্তু সেটা বাস্তবায়িত হয় ১৯৮৮ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে এবং ৩১ মে তারিখটিকে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস হিসাবে উদযাপন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিবছর আলাদা আলাদা প্রতিপাদ্য বিষয়ে ৩১ মে বিশ্বব্যাপি তামাকমুক্ত দিবস হিসাবে উদযাপিত হয়ে আসছে।
পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। “Stop illicit trade of tobacco products”, অর্থাৎ ‘তামাকজাত দ্রব্যের অবৈধ ব্যবসা বন্ধ কর’। এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এবছর দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে।
তামাক বিরোধী সংস্থাগুলো বলছে, বাংলাদেশে ধুমপানজনিত রোগে মৃত্যুর হার খুবই উচ্চ। তাই ধুমপান নিরুৎসাহিত করতে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ দরকার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী বছরে বাংলাদেশে ১২ লক্ষ মানুষ তামাক ব্যবহারজনিত রোগে আক্রান্ত হয়, যার মধ্যে প্রায় ৫৭ হাজারের মতো মানুষ প্রতিবছর মারা যান। শারীরিক অক্ষমতার শিকার হন আরও প্রায় চার লাখ মানুষ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যে বলা হয়, পৃথিবীতে যত সিগারেট বিক্রি হয়, তার ১০ভাগের এক ভাগ চোরাচালানের মাধ্যমে বিক্রি হলেও এর প্রভাব অনেক। সিগারেটের চোরাচালানের কারণে শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোই তামাকের কর বাবদ ১০ বিলিয়ন ইউরো থেকে বঞ্চিত হয়, যা বাংলাদেশি টাকায় ১ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি। সিগারেট ও তামাকের চোরাচালান শুধু উন্নত দেশের সমস্যাই নয়, এটা দরিদ্র দেশের জন্যও একটি সমস্যা।
তামাক বরিোধী সংগঠনগুলোর দাবি, ঢাকাসহ সারাদেশে চোরাচালানকৃত সিগারেটে বাজার সয়লাব। অথচ বাংলাদেশে বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলা সতর্কবাণী ব্যতিত কোন সিগারেট বিক্রয় করা যাবে না। বিদেশি এসব সিগারেট বাজার থেকে উচ্ছেদ করতে প্রশাসনেরও কোন পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায় না।
ঢাকা আহছানিয়া মিশনের এক গবেষণায় দেখা ঘেছে,বিভিন্ন সিগারেটের ব্র্যান্ডসহ ১১৫টি তামাকজাত দ্রব্য আমাদের দেশে পাওয়া যায়, যা অবৈধ পথে বাংলাদেশে এসেছে। যারা এটা গ্রহণ করছেন, তাদের ৪৮% ভিন্ন স্বাদ, ২২% সহজলভ্যতা এবং ২২% সামাজিক অবস্থানকে কারণ হিসাবে উল্লেখ করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাকজাত দ্রব্য হিসাবে বিড়ি বা সিগারেট সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। যারা বিড়ি বা সিগারেট খান তারা হলেন প্রত্যক্ষ ধূমপায়ী। কিন্তু তাদের ছাড়া ধোঁয়া যাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও গ্রহণ করতে হয়, সেই পরোক্ষ ধূমপায়ীদের সংখ্যা আরো বেশি এবং বিপদও বেশি। কারণ প্রত্যক্ষ ধূমপায়ীরা ধূমপানের সময় সিগারেট বা বিড়ির তামাক পোড়ানোর ধোঁয়াটুকু স্বতস্ফুর্ত হয়ে গ্রহণ করেন। তারপর তার নিঃশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে আসা হাজারো রকমের দূষিত পদার্থ পাশের জনকে গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়। তিনি অপরাধ না করেও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, কারণ প্রথমত সিগারেটের ধোঁয়া, দ্বিতীয়ত ধূমপায়ীর বিষাক্ত নিঃশ্বাস।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বে প্রতি ৬ সেকেন্ডে একজন, প্রতিদিন ১৫হাজারের অধিক এবং প্রতিবছর ৬০ লক্ষাধিক মানুষ তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
তামাক-বিরোধী সংগঠন 'ওয়ার্ক বেটার ফর এ বাংলাদেশ(ডাব্লিউবিবি) এর এক জরিপে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতিবছর ৩৩ হাজার হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয় এবং দেশে প্রতিবছর ৪০ হাজার মেট্রিক টন তামাক উৎপাদিত, ৬৭১২ মেট্রিক টন আমদানি এবং ৪৫৫৪ মেট্রিক টন রপ্তানি করা হয়।
জরিপে আরো বলা হয়, বাংলাদেশে ১৫ বছরের বেশী বয়স্কদের মধ্যে ৩৬.৮% কোন না কোন ভাবে তামাক ব্যবহার করছেন। তার মধ্যে ধুমপানে আসক্ত পুরুষ ৪১% ও মহিলা ১.৮% এবং চর্বনযোগ্য তামাক ব্যবহারকারি পুরুষ ১৪.৮% এবং মহিলা ২৪.৪%। ১৪ বছরের কম বয়সী কিশোর কিশোরীদের মধ্যে ১.৮% ধুমপান এবং ৪% অন্যান্যভাবে তামাক ব্যবহার করছেন।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক ব্লুমবার্গ তামাক বিরোধী সংগঠন ইনিশিয়েটিভ টু রিডিউস টোব্যাকো এর জরিপে বলা হয়, বাংলাদেশে ৪৩.৩% প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ তামাক সেবন করেনএবং বর্তমান তামাক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪ কোটিরও বেশি। যার মধ্যে নারী ২৯% এবং পুরুষ ৫৮%।
জরিপে বলা হয়, ধুমপানের চেয়ে ধোঁয়াবিহীন তামাকের ব্যবহার অনেক বেশি আর এক্ষেত্রে নারীরাই এগিয়ে। যেখানে নারী ২৮% এবং পুরুশ ২৬%। ধুমপানের ক্ষেত্রে পুরুষরাই এগিয়ে যেখানে ৪৫% পুরুষ ও ১.৫% নারী সিগারেটের মাধ্যমে এবং ২১% ও ১.১% নারী বিড়ির মাধ্যমে ধুমপান করে থাকেন।
২০০৯ সালের তথ্য অনুসারে, ৩০% প্রাপ্তবয়স্ক নারী কর্মস্থলে এবং ২১% নারী জনসমাগমস্থলে পরোক্ষ ধুমপানের শিকার হচ্ছেন। অর্থাৎ ধুমপান না করেও পরোক্ষ ধুমপানের শিকার হচ্ছেন প্রায় ১ কোটি নারী।
বাংলাদেশ তামাকবিরোধী জোটের সংগঠক ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) অন্যতম সদস্য আমিনুল ইসলাম সুজন টাইমনিউজবিডিকে বলেন, সিগারেটসহ তামাকজাত দ্রব্য চোরাচালানের সঙ্গে তামাক কোম্পানিগুলোও জড়িত। তরুণদের আকর্ষণ বৃদ্ধির জন্যে তামাক কোম্পানিগুলো কর ফাঁকি দিয়ে স্বল্পমূল্যে বিদেশী সিগারেট বিক্রি করে।
সিগারেটের চোরাচালান একটি অর্থনৈতিক বাধা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রে সুশাসনের অভাব ও দুর্ণীতি প্রকট। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাও বিরাট হুমকি। চোরাকারবারীরা সিগারেট চোরাচালানের অর্থ দিয়ে অস্ত্র ও মাদক চোরাচালানও করে থাকে। তাই সিগারেট চোরাচালান বন্ধে তিনি কাস্টমস কর্তৃপক্ষ, পুলিশ, বিজিবিসহ সংশ্লিষ্টদের আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান। দায়ীদের কঠোর সাজাও দাবি করেন তিনি।
২০০৫ সালে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ 'ধুমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার আইন' পাশ করে। ওই বছরের ২৬ মার্চ তা কর্যকর হয়। এই আইন অনুসারে পাবলিক প্লেস এবং পাবলিক পরিবহনে ধূমপান শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপনকেও এই আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে।
এমআর, কেবি





