বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) বিরুদ্ধে কয়েক হাজার কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির  অনুসন্ধানী কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে গত ২ বছরে  ৪ দফা চিঠি পাঠিয়েও ওই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দুর্নীতির নথিপত্র উদ্ধার করতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদককে পাত্তাই দিচ্ছে না বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এমন অভিযোগও উঠেছে ।
২ বছর আগে ওইসব অভিযোগ প্রতিবেদন আকারে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশের পর  দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে  অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত দেন।
একই সঙ্গে দুদককের উপ-পরিচালক মোনায়েম সরকার, সৈয়দ মোমেন হোসেন, আহসান আলী এবং সহকারি পরিচালক মাহবুব আলমকে নিয়ে একটি অনুসন্ধানী টিম গঠন করেন।
এই অনুসন্ধানী কর্মকর্তারা বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত চেয়ে ৪ দফা চিঠি দিয়ে কোনো তথ্য উদ্ধার করতে পারেননি। অর্থাৎ দুদককে পাত্তা দিচ্ছে না বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ।
নাম প্রকাশের শর্তে দুদকের জনৈক অনুসন্ধান কর্মকর্তা টাইমনিউজবিডিকে জানান,গত ১৯ মার্চ চতুর্থ দফা আরেকটি চিঠি  দেয়া হয়েছে।  গত ২ বছরে আরো ৩টি  চিঠি দিয়ে টেন্ডারর তথ্য-উপাত্ত  দেয়া হয়।  তাদের তালিকাভুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কোনো হদিস নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে  হযরত শাহজালাল  আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের তেজগাঁও কোয়ার্টারের  ফুটপাত ও সুয়্যারেজ লাইন মেরামত ও সংস্কার, দুই দিকের রাস্তা কার্পেটিং, খিলক্ষেত গেইট সংলগ্ন জঙ্গল পরিষ্কার, লেভেল ড্রেসিং, ফ্লাইট নিরাপত্তা, কাওলা আবাসিক কোয়ার্টারের বালু ভরাটের কাজে ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা ঘটেছে।
এছাড়া ৫শ কোটি টাকা মূল্যের জমি একটি বেসরকারি হাউজিং কোম্পানীকে আবাসিক প্রকল্পের জন্য দেয়া হয়েছে। ওই কোম্পানী তড়িগড়ি করে বেবিচকের জলাশয় ভরাট করে দখলে নিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলী  সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীর পছন্দের ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দিয়ে অর্থ লোপাট হয়েছে। ২০১০ থেকে ২০১৪ অর্থ বছর পর্যন্ত সিভিল ডিভিশন-১, সিভিল ডিভিশন-২ ও পিঅ্যান্ডডি / কিউএস সার্কেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলীর মাধ্যমে মেসার্স ন্যাশনাল ট্রেডার্স, মেসার্স হাইড্রোটেক, মনির কনস্ট্রাকশন, আদিবা ট্রেডার্স, মেসার্স ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড এসোসিয়েট, বশির এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স ওদুদ মন্ডল, মাসফিয়া ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স ক্ষেত্র আর্কিটেক্ট, ডেল্টা এন্টারপ্রাইজকে কার্যাদেশ দেয়ার নামে ভুয়া বিল ভাউচারে লাখ লাখ টাকা আত্মসাত করেন তারা।
শুধু তাই নয়, বড় বড় কাজের টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি ঘুপচি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রকাশ করে নির্দিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাওয়ার সুযোগ  করে দেন তারা।
অভিযোগ রয়েছে, বেবিচকের নিজস্ব জমি  একটি বেসরকারি হাউজিং কোম্পানীকে  মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।  ফলে বেবিচকের মালিকানাধীন জলাশয় ভরাট করে  রাস্তা নির্মাণে ৫ কোটি ১৫ লাখ টাকার ভুয়া টেন্ডার করানো হয়। ৩০ ফুট প্রশস্ত ও ২ কিলোমিটার লম্বা এই রাস্তা নির্মানে সিভিল এভিয়েশনের ২৫ বিঘার বেশি  জমি  ওই হাউজিং কোম্পানী দখল করে নিয়েছে।
বেবিচক সংলগ্ন কাওলা আবাসিক এলাকায় ২ কোটি টাকার বালু কিনে জলাশয় ভরাট, ৪২টি আবাসিক ভবনের নির্মাণ কাজ পাইয়ে দিতে ঠিকাদারদের কাছ থেকে  মোটা অংকের উৎকোচ  নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়াদের প্রশিক্ষণ অনিয়ম:  দেশের বিমান বন্দরগুলোর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সিভিল এভিয়েশন কর্মকর্তাদের বিদেশ প্রীতির বিষয়টিও অনুসন্ধান করছে দুদক।  বিমান কর্তৃপক্ষের কয়েকজন কর্মকর্তার  বিরুদ্ধে  কোটি কোটি টাকার উৎকোচ গ্রহণ এবং সরকারের অনুমোদনবিহীন বিদেশ ভ্রমণ বিষয়ে বেসরকারি বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও সংশ্লিষ্টরা কোনো ব্যাখ্যা  দেননি।
২০১২-২০১৩ অর্থ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভ্রমণ ভাতা বিল ভাউচার পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রাপ্ত ব্যক্তিকে প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ ভ্রমণের ব্যয় বহন করে বেবিচকের কী পরিমান  টাকা আর্থিক ক্ষতিসাধন করা হয়েছে।
এভাবে একেকজন পরামর্শকের পেছনে ভ্রমণ বিল পরিশোধ করা হয়েছে ৭ লাখ ১৩ হাজার ৮৫৭ টাকা। ফ্লাইট ওঠা-নামা,পার্কিং, রানওয়ে থেকে বোর্ডিং ব্রিজে যাওয়া, ইঞ্জিন মেরামত, ফিটনেস সার্টিফিকেট  প্রদান থেকে শুরু করে পাইলট কেবিন ক্রুদের ফ্লাইট পরিচালনায় প্রতি কাজেই বেবিচকের শরণাপন্ন হতে হয়।
এদিকে দুদকের বর্তমান চেয়ারম্যান মো.  বদিউজ্জামান বলেন, সংশোধিত দুদক আইন অনুযায়ী যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দুদকের অনুসন্ধানী টিমের চাহিবা মাত্র তথ্য-উপাত্ত দিতে বাধ্য। কোনো ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠান দুদকের চাহিদা মোতাবেক তথ্য উপাত্ত না দিলে তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯/১০৯ এবং দুদক আইনের ১৯(৩) ধারায় আইনী ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। এই ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অবশ্যই দুদক আইনগত ব্যবস্থা  গ্রহণ করবে।
[b]ঢাকা,একে ২২ মার্চ (টাইমনিউজবিডি.ডকম) // কেবি[/b]