হজ ইসলামের মৌলিক পাঁচটি স্তম্ভের একটি। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ ফরজ ইবাদতে যেমন রয়েছে প্রচুর ফজিলত, তেমনি রয়েছে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ দর্শন। দুই খ-ের সাদা কাপড় পরিধান করে হজের এহরাম বেঁধেই হাজীরা বলেন, লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইকÑ হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির। ফজিলত ও দর্শনের শুরু এখান থেকেই।
কারও ডাকে সাড়া দেয়ার সময় লাব্বাইক বলা হয়। এটাকে তালবিয়া বলে। হাজীদের কে ডাকলেন? কার ডাক শুনে হাজীরা এহরাম বেঁধেই জবাব দিতে থাকেন, লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইকÑ হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির? এ প্রশ্নের জবাব পেতে আমাদের ফিরে যেতে হবে কয়েক হাজার বছর পেছনের ইতিহাসে। হজরত নুহ (আ.) এর সময় পাপাচার মানুষের শাস্তির জন্য যে মহাপ্লাবন হয়েছিল, তা থেকে আল্লাহর ঘর পবিত্র কাবাও রেহাই পায়নি। পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে গেছিল তার চিহ্নটুকু। এরপর হজরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহ তায়ালার আদেশে সেই কাবাঘর পুনর্নির্মাণ করলেন। আল্লাহ তায়ালা ইবরাহিম (আ.) কে কাবাঘরের স্থানটি দেখিয়ে দেন। এরপর ইবরাহিম (আ.) তার ছেলে ইসমাঈল (আ.)সহ কাবাঘরের নির্মাণকাজ সমাপ্ত করেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যখন আমি ইবরাহিমকে সেই ঘরের স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম, তখন বলেছিলাম, আমার সঙ্গে কাউকে শরিক করো না এবং আমার ঘরকে পবিত্র রাখ তাওয়াফকারীদের জন্য। নামাজে দ-ায়মানদের জন্য এবং রুকু-সিজদাকারীদের জন্য।’ (সূরা হজ : ২৬)।
অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর যখন ইবরাহিম ও ইসমাঈল কাবাঘরের ভিত্তি স্থাপন করছিলেন, তারা দোয়া করেছিলেন, হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের এ কাজ কবুল করো। নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা।’ (সূরা বাকারা : ১২৭)। কাবাঘর নির্মাণ শেষ হলে আল্লাহ তায়ালা ইবরাহিম (আ.) কে লক্ষ্য করে বললেন, ‘মানুষের মধ্যে হজের জন্য ঘোষণা প্রচার করো। তারা তোমার কাছে আসবে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে।’ (সূরা হজ : ২৭)।
তাফসিরে রুহুল বয়ানে আছে, কাবাঘর নির্মাণ শেষ হলে আল্লাহ তায়ালা হজরত ইবরাহিম (আ.) কে হজের ঘোষণা দিতে বললেন। মানুষকে কাবার দিকে আসার আহ্বান জানাতে বললেন। তাফসিরে মাআরেফুল কোরআনে আছে, ইবরাহিম (আ.) কে বলা হলো, মানুষের মধ্যে ঘোষণা করে দাও যে, বায়তুল্লাহর হজ তোমাদের ওপর ফরজ করা হয়েছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, যখন ইবরাহিম (আ.) কে হজ ফরজ হওয়ার কথা ঘোষণা করার আদেশ দেয়া হলো, তখন তিনি আল্লাহর কাছে আরজ করলেন, হে আল্লাহ, আমার আওয়াজ কতদূর যাবে? কেইবা শুনবে আমার আহ্বান? এখানে তো জনমানবহীন শূন্য প্রান্তর। ঘোষণা শোনার মতো কেউ নেই এখানে। যেখানে জনবসতি আছে সেখানে আমার আওয়াজ পৌঁছবে কীভাবে? আল্লাহ তায়ালা বললেন, ‘হে ইবরাহিম, তোমার কাজ শুধু আহ্বান করা। আহ্বান পৌঁছানোর কাজ আমার।’ হজরত ইবরাহিম (আ.) আবু কুবাইস পাহাড়ে উঠলেন। কোনো কোনো বর্ণনায় সাফা পাহাড়ের কথা আছে। আবার কিছু বর্ণনায় মাকামে ইবরাহিমের কথা বলা হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, সবক’টিই হতে পারে। ভিন্ন ভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা দেন। কানে আঙুল দিয়ে ডানে, বামে, সামনে, পেছনে সজোরে আহ্বান জানালেন, হে মানুষ সব, তোমাদের রব নিজের ঘর নির্মাণ করেছেন এবং তোমাদের ওপর এ ঘরের হজ ফরজ করেছেন। তোমরা এ ঘর জিয়ারতের জন্য আসো। হজ পালন করো। তোমাদের সওয়াব দেয়া হবে। জান্নাত প্রদান করা হবে। জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়া হবে। আল্লাহ তায়ালা ইবরাহিম (আ.) এর আওয়াজ সুউচ্চ করে দেন এবং বিশ্বের কোণে কোণে পৌঁছে দেন। হজরত ইবরাহিম (আ.) এর এ আহ্বান আসমান-জমিনের মাঝের সব অধিবাসী শুনতে পেল।
তখনকার জীবিত মানুষই শুধু নয়, বরং ভবিষ্যতে কেয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ আগমনকারী হবে আলমে আরওয়াহে (রুহের জগতের) সবার কান পর্যন্ত এ আওয়াজ পৌঁছে দেয়া হয়। যার যার ভাগ্যে আল্লাহ তায়ালা হজ লিখে দিয়েছেন, তাদের প্রত্যেকেই এ আওয়াজের জবাবে লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইকÑ হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির বলেছেন।
হজরত মুজাহিদ (রা.) বলেন, যিনি একবার জবাব দিয়েছেন, তিনি একবার হজে হাজির হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করবেন।যিনি দুইবার জবাব দিয়েছেন, তিনি দুইবার হজ করার সৌভাগ্য অর্জন করবেন। মোটকথা, যিনি যতবার জবাব দিয়েছেন, তিনি ততবার হজ করার সৌভাগ্য অর্জন করবেন। বলাবাহুল্য, হাজীরা ইহরাম বেঁধেই যে লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির বলে আওয়াজ দেন তা মূলত আলমে আরওয়াহে শোনা হজরত ইবরাহিম (আ.) এর আহ্বানের জবাব। ওই সময় তারা জবাব দিয়েছিলেন বলে এহরাম বেঁধে তালবিয়া পাঠের সৌভাগ্য আজ তাদের হয়েছে। হজের নিগূঢ় এ দর্শনের সারকথা আল্লাহপ্রেম। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ইবরাহিমি আওয়াজের জবাবই হচ্ছে ‘লাব্বাইক’ বলার আসল ভিত্তি।’ (তাফসিরে কুরতুবি)।
সুতরাং হাজীরা যখন লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক বলবেন, তখন এ কথা মনে করবেন যে, এটা আল্লাহ তায়ালার ডাকে সাড়া দেয়ার জবাব। আমরা যারা এ সৌভাগ্য অর্জন করিনি, হে আল্লাহ তুমি আমাদেরও তৌফিক দাও, আমরাও যেন তোমার ডাকে সাড়া দিয়ে বলতে পারি, লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইকÑ হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির।

এসএ/টা্ইম