শিশুদের সাথে শ্রমের সম্পৃক্ততা সত্যিই খুব বেমানান। তাদের সঙ্গে শুধুমাত্র মমতা ও ভালবাসার মতো শব্দগুলোই শোভা পায়। শিশুদের যে বয়সে লেখাপড়া করা, মায়ের কোল চষে বেড়ানো, শখের খেলাধুলা ইত্যাদি করে বেড়ানোর কথা, সেই বয়সে শ্রমের শোষণ তাদের জন্য সত্যিই খুব কষ্টদায়ক। একইসাথে তা বিবেকবান লোকদের জন্যও বেদনার কারণ।

শিশু শ্রম সত্যিই সমাজের একটি বিকৃত অবস্থার ইঙ্গিত বহন করে। আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে আমরা মুখে বড় বড় কথা বললেও আমাদের সমাজে অনেক বৈসম্য বিদ্যমান। যেখানে সবার জন্য সমান সুযোগ নেই সেখানে আর যা থাক সমতার বুলি সত্যিই বেমানান।

'উৎপাদন থেকে পণ্যভোগ, শিশুশ্রম বন্ধ হোক' এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস পালিত হচ্ছে। ২০০২ সাল থেকে জুন  মাসের ১২ তারিখকে বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও আজ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় পালিত হয় দিনটি।

দিবসটি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণীতে প্রদান করেছেন। প্রধানমন্তরী তার বাণীতে বলেছেন, সরকার শিশুদের অধিকার রক্ষায় বদ্ধপরিকর। তিনি সরকারের পাশাপাশি শিশুশ্রম প্রতিরোধ ও শিশুদের কল্যাণে বিভিন্ন বেসরকারি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা, সিভিল সোসাইটি, গণমাধ্যম, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, মালিক ও শ্রমিক সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

আমরা আমাদের সমাজে শিশুশ্রমের বিভিন্ন ধরণ দেখতে পাই। আমরা দেখতে পাই শিশুদের যে বয়সে লেখাপড়া করার কথা, বই-খাতা বয়ে বেড়াবার কথা সেই বয়সে তাদের কাঁধে ভিক্ষার ঝুলি তুলে দিচ্ছে একটি মহল। কখনো বা ব্যবসার অভিনব কায়দায় তাদের হাতে চকলেটের ঝুড়ি, বিভিন্ন ফুলের মালা তুলে দেয়া হয়।

কখনো কখনো স্বার্থান্বেষী মহলগুলো নামমাত্র পারিশ্রমিকে শিশুদের দিয়ে মারাত্মক; এমনকি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করিয়ে নেয়। এই শিশুদের ছোটবেলা থেকেই টাকার প্রলোভন দেখানো হলে তারা শুধুমাত্র টাকার কারণে ভুলে যায় নিজেদের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত। কখনো বা টাকার পিছনে ছুটতে গিয়ে জড়িয়ে পড়ে অনেক রাষ্ট্রদ্রোহী কাজে।

আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে (উদাহরণ স্বরূপ: ঢাবি, জাবি, জবি, বুয়েট) এমনকি বিভিন্ন উদ্যানে (পার্ক) বাচ্চাদের দিয়ে ফুল, চকলেট ইত্যাদি বিক্রির কাজ করানো হয়। অনেক হোটেল, কল-কারখানায়, এমনকি ইমারত নির্মাণ কাজেও শিশুশ্রমের ব্যাপক প্রচলন দেখতে পাই। এই শিশু শ্রমিকদের অনেই হয় ভাগ্যবঞ্চিত, অনেকেই আবার সংসারের হাল ধরতে চলে আসে কষ্টকর পেশায়।

সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে দেখা হয় ফুটুফুটে এক মেয়ে বৈশাখীর সঙ্গে। বয়স আনুমানিক ৫-৬ বছর হবে, অথচ এই বয়সেই সে ফুল বিক্রয় করে বেড়ায়। এই বয়সে তো তার বই নিয়ে পড়তে যাওয়ার কথা, মায়ের গলা ধরে আদর খাওয়ার কথা; কিন্তু তাকে নামতে হয়েছে বাধ্যতামূলক শিশুশ্রমে। পাশেই নাকি দূরে দাঁড়িয়ে তাকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বৈশাখীর মতো আরো অনেককেই দেখা যায় মানুষের কাছে হাত পাততে পাততে ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে, রাস্তায় পড়ে থাকে গভীর রাত পর্যন্ত। এমন শিশুদের মধ্যে সুমনের নাম উল্লেখযোগ্য যার বিচরণ স্থান ঢাবির বিভিন্ন হলের প্রবেশ পথে।

এমননিভাবে শিশুশ্রমের চিত্র আমরা দেখতে পাই আমাদের গতিশীল জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে। কিন্তু তাসত্ত্বেও আমরা কোন কার্যকরি ভুমিকা পালন করতে পারি না। কারণ সাধারণ ব্যক্তি হিসেবে আমাদের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব।

আমরা নারী-পুরুষের সমতার কথা বলি। কিন্তু আমরা আদৌ কি ভেবে দেখেছি বঞ্চিতদের কথা বিশেষ করে স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে বঞ্চিত শিশুশ্রমিকদের কথা? তাদের জন্য কি আমরা সমতার কথা কথা ভাবতে পারি না? আমরা কি ভাবতে পারি না কেন আমাদের সকল শিশুদের জন্য সমান অধিকার থাকতে নেই? কেন একজনের ছেলে অবাধে সম্পদ ওড়াবে আবার অন্য শিশুরা কেন দু'মুটো ডাল-ভাতের জন্য নিজের শখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে বাধ্যতামূলক শ্রমের সাথে জড়িয়ে পড়বে? এর দায় আসলে কার?

যে বয়সে একটা শিশু হেসে-খেলে বন্ধুদের সাথে দিনাতিপাত করবে সে বয়সে কেন তাকে পেটের দায়ে কাজে নামতে হয়? আমরাতো সাম্যের কথা বলি তবে কেন শিশুদের কাজে নিজেদের সমতা দাবি করি না? কেন আমাদের স্বাভাবিক জীবনের মতো তাদের স্বাভাবিক জীবনের দাবি করতে পারি না?

সবার সামনে এই প্রশ্নগুলো রেখে শিশুশ্রম বন্ধের জোর দাবি জানাই। আর এই সমাজব্যধি শিশুশ্রম বন্ধ হলে সমাজের চিত্র হবে আরো সুঠাম।  এই সমাজে বিরাজ করবে আরো আনন্দময় পরিবেশ।

এমআইএস