নোয়াখালী ৯ উপজেলায় (২০১৪-১৫ অর্থবছর) প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায় বিশেষ গ্রামীন অবকাঠামো রাস্তা সংষ্কার কর্মসুচী (কাবিখা সাধারণ) রক্ষনাবেক্ষন, সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সোলার কর্মসুচীর আওতায় (টিআর) ও গ্রামের কাঁচা রাস্তার সংষ্কার করতে হতদরিদ্র শ্রমিকদের কর্মসৃজন প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা উন্নয়নের নামে সভাপতি, সদস্য, ট্যাগ অফিসার, পিআইও, সুপারভাইজারদের বিরুদ্ধে হরিলুটের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ওই প্রকল্পের তথ্য জানার জন্য ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গন ও ওয়ার্ড প্রকল্পের এলাকায় দৃশ্যমান সাইন বোর্ড দেওয়ার বিধান থাকলেও প্রকল্প সভাপতি ও সদস্যরা বোর্ডে দেয়নি। এ সুযোগে প্রকল্প কাজে চলছে ব্যাপক হরিলুট ও ভাগ ভাটোয়ারা।

এসব উন্নয়ন কর্মকান্ডের তথ্য জনগণের জানার অধিকার থাকলেও প্রকল্পের সভাপতি, সদস্য, উপজেলার ট্যাগ অফিসার, ফিল্ড সুপার ভাইজার, ও পিআইও সহ সংশ্লিষ্টরা লুট করতে তা গোপন করেছে। সরেজমিনে উপজেলার ইউনিয়ন প্রাঙ্গন ও ওয়ার্ডের প্রকল্পের এমন চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রকল্প এলাকার কোথাও দেখা মেলেনি সংষ্কার কাজের বিবরণী সংক্রান্ত প্রদর্শনী সাইনবোর্ড।

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ ভুয়া প্রকল্প সাজিয়ে রাস্তা নির্মানে মাটি ভরাট না করে শুধু ড্রেজিং করে প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত ঘোষনা করেছে প্রকল্পের সভাপতি ও সংশ্লিষ্টরা।

অধিকাংশ প্রকল্পের সিঁকি পরিমান কাজ না করেই অর্থ উত্তোলন করে তারা ভাগাভাগি করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অথচ এ কাজ তদারকি করার জন্য উপজেলা বিভিন্ন অফিসের ট্যাগ অফিসার, পিআইও, সুপারভাইজার নিযুক্ত থাকলেও প্রকল্প পরিদর্শন এমন নজির নেই।

জেলা ত্রান ও পুনর্বাসন অফিস সুত্রে জানায়, হতদরিদ্র কর্মসৃজন গ্রামের সড়কে মাটি ভরাট করতে প্রতিদিন ৪০ জন শ্রমিক ৪০ দিন কাজ করার কথা থাকলেও প্রকল্প সভাপতি, ট্যাগ অফিসার, সুপারভাইজার এবং সদস্যদের যোগসাজশে ১০-১২ জন শ্রমিক নিয়ে কাজ করছে। তবে হাজিরা বইতে ৪০ জন শ্রমিকের হাজিরা তোলা হয়েছে।

পরে প্রকল্প সভাপতি সদস্যরা সুপারভাইজার, ট্যাগ অফিসার ও পিআইও’কে ম্যানেজ করে বিলে স্বাক্ষর করে ইউনিয়ন পরিষদের সচিব সংশ্লিষ্ট সরকারী ব্যাংক থেকে টাকা উত্তেলন করেন।

সচিব ইউনিয়ন পরিষদের টাকা এনে নাম মাত্র কয়েকজন শ্রমিককে টাকা দিয়ে বাকী টাকা ভাগাভাগি করে নিয়ে যায়।

অথচ ভুয়া প্রকল্প দেওয়ায় রাস্তাটির সিঁকি কাজও বাস্তবায়িত হয়নি। প্রথম পর্যায়ে, ওই অর্থবছরে ২৫ মার্চ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নোয়াখালী ৬ নির্বাচনী আসনে প্রতি এমপির নামে ৩০০ মেট্রিক টন চাল ৯ উপজেলায় ৮ পৌরসভায় ৮৭ টি ইউনিয়নে বরাদ্দ দেয়া হয়।

দ্বিতীয় পর্যায়ে, চলতি বছর ১লা জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নোয়াখালী ৬ নির্বাচনী আসনের এমপিদের নামে ৩০০ মেট্রিক টন গম ও অবকাঠামো বাস্তবায়ন করতে ৯ উপজেলার ৮ পৌরসভায় ৮৭ ইউনিয়নে ও নগদ ৫ কোটি ৪৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়।

সোলার/বায়োগ্যাস বাস্তবায়ন করতেও ওই উপজেলায় ও ৮ পৌরসভায় ১ হাজার ৫’শ ১১ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

হতদরিদ্র শ্রমিকদের কর্মসংস্থান করতে গ্রামের কাঁচা রাস্তা সংষ্কার কর্মসুচী বাস্তবায়নে ৯ উপজেলার ৮৭ ইউনিয়নে গত বছর প্রথম দফায় ১লা জুন থেকে ১০ জুলাই ও চলতি বছর ১ লা জুলাই থেকে ৩০ জুলাই দ্বিতীয় দফায় কাজ করতে ৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা সংশ্লিষ্ট সরকারী তফসিল ভুক্ত ব্যাংকে বরাদ্দ দেয়া হয়।

সুত্রে জানায়, প্রথম পর্যায়ে গত বছর নোয়াখালী ৯ উপজেলার ৮৭ ইউনিয়নে কর্মসৃজন বাস্তবায়ন করতে ওই অর্থবছরে সদর উপজেলার ১৩ ইউনিয়ন গ্রামের অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ করতে হতদরিদ্র কর্মসৃজন ৪৩ টি প্রকল্পে ১৫৩৯ কার্ডে ১ কোটি ২৩ লাখ ১২ হাজার টাকা, সুবর্ণচর উপজেলার ০৮ ইউনিয়নে একই কাজ করতে ৩৬ টি প্রকল্পে ১৫৮৪ কার্ডে ১ কোটি ২৩ লাখ ৮৪ হাজার টাকা, কবিরহাট উপজেলার ০৭ ইউনিয়নে ৩০ টি প্রকল্পে ৬৯৭ কার্ডে ৫৫ লক্ষ ৭৬ হাজার টাকা, হাতিয়া উপজেলার ০৯ টি ইউনিয়নে ৩৫ প্রকল্পে ২০৩৫ কার্ডে ১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, সোনাইমুড়ি উপজেলার ১০ ইউনিয়নে ১৬ টি প্রকল্পে ৪৭০ কার্ডে ৩৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা, চাটখিল উপজেলায় ০৯ ইউনিয়নে ১৫ টি প্রকল্পে ৩১৯ কার্ডে ২৫ লাখ ৫২ হাজার টাকা, সেনবাগ উপজেলার ০৯ ইউনিয়নে ১৯ প্রকল্পে ৪৩৬ কার্ডে ৩৬ লাখ ৬৪ হাজার টাকা, কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার ০৯ প্রকল্পে ৫৪৬ কার্ডে ৪৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা সহ ৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

দ্বিতীয় পর্যায়ে, সদর উপজেলায় ১৪৬৪ কার্ডে ১৩ ইউনিয়নে ৪৪ প্রকল্পে ১ কোটি ১৭ লাখ ১২ হাজার টাকা, সৃবর্ণচর উপজেলায় ০৮ ইউনিয়নে ৩৯ প্রকল্পে ১ কোটি ৪৮ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, কবিরহাট উপজেলায় ০৭ ইউনিয়নে ২৭ প্রকল্পে ৬১ লাখ ৪ হাজার, বেগমগঞ্জ উপজেলায় ১৬ ইউনিয়নে ৪৮ প্রকল্পে ৭৬ লাখ টাকা, সোনাইমুড়ি উপজেলায় ১০ ইউনিয়নে ১৭ প্রকল্পে ৪০ লাখ ১৬ হাজার টাকা, চাটখিল উপজেলায় ০৯ ইউনিয়নে ১৩ প্রকল্পে ২৬ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, সেনবাগ উপজেলায় ০৯ ইউনিয়নে ২০ প্রকল্পে ৩৯ লাখ ৪ হাজার টাকা, কোম্পানিগঞ্জ উপজেলায় ০৮ ইউনিয়নে ২০ প্রকল্পে ৪৬ লাখ টাকা ও হাতিয়া উপজেলায় ০৯ ইউনিয়নে ৩৮ প্রকল্পে ১ কোটি ৭৮ লাখ ৮৮ হাজার টাকা সহ ৭ কোটি ৩৩ লাখ ৩৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আন্ডারচর ইউনিয়নে ৩ টি প্রকল্প, ১ নং চরমটুয়া ইউনিয়ন ৪ টি প্রকল্প, অশ্বদিয়া ইউনিয়নে ২ টি প্রকল্প, সুবর্নচর উপজেলার চর জুবলী ইউনিয়নের ২ টি প্রকল্প, চরবাটা ইউনিয়নের ৩ টি প্রকল্প, চর জব্বর ইউনিয়নে ২ টি প্রকল্প, সেনবাগ উপজেলার ছাতারপাইয়া ইউনিয়নে ৩ টি প্রকল্প, নবীনগর ইউনিয়নে ২ টি প্রকল্প, ডুমুরিয়া ইউনিয়নের ২ টি প্রকল্প, সোনাইমুড়ী উপজেলার অম্বরনগর ইউনিয়নের ২ টি প্রকল্প, দেওটি ইউনিয়নের ২ টি প্রকল্প, বেগমগঞ্জ উপজেলার কুতুবদিয়া ইউনিয়নের ২ টি প্রকল্প, আলাইয়াপুর ইউনিয়নের ১ টি প্রকল্প, কাদিপুর ইউনিয়নের ১টি প্রকল্প, বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের ১টি প্রকল্প, চাটখিল উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়নের ২ টি প্রকল্প, নোয়াখোলা ইউনিয়নের ১ টি প্রকল্প অধিকাংশ কাজ না করেই লুট করেছে।

অপরদিকে অভিযোগ রয়েছে, হাতিয়া উপজেলার ০৯ ইউনিয়নে ৩৮ প্রকল্পে সিঁকি পরিমানও কাজ না করেই হাতিয়া উপজেলা আসনের এমপি আয়েশা ফেরদৌসের স্বামী মোহাম্মদ আলী, পিআইও, প্রকল্প সভাপতি, সুপারভাইজার ও ট্যাগ অফিসাররা ভাগাভাগি করে কোটি টাকা লুটপাট করেছে।

সুবর্নচর উপজেলার পিআইও ও হাতিয়া উপজেলার ভারপ্রাপ্ত পিআইও ইসতিয়াক হোসাইন উজ্জল জানান, হাতিয়া উপজেলা আসনের এমপির স্বামী মোহাম্মদ আলী টিআর-কাবিখা ও কর্মসৃজন প্রকল্পের কাজ না করেই প্রকল্পের সমুদয় কোটি টাকা নিয়ে যায়। বেগমগঞ্জ উপজেলার পিআইও মোঃ জাহিদ হাসান খান জানান, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ইউনিয়ন নেতারা ভুয়া প্রকল্প দিয়ে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে টিআর-কাবিখা ও কর্মসৃজন প্রকল্পের অধিকাংশ টাকা লুট করছে। এতে আমার করার কিছুই নাই।

এদিকে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা সাইরুল ইসলাম আবু হেনা জানান, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কাঁচা রাস্তা সংষ্কার, গ্রামীন অবকাঠামো উন্নয়ন করতে সরকার টিআর (সাধারণ), কাবিখা, কর্মসৃজন প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে অধিকাংশ টাকা রাজনৈতিক নেতা, পিআইও, ট্যাগ অফিসার ও প্রকল্প কর্মকর্তারা ভাগাভাগি করে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। আমি স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়ে শুধু রিপোর্ট দেওয়া ছাড়া আইনগত ব্যবস্থা নিতে জটিলতা আছে।

এসএইচ