টাঙ্গাইলে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে ঘরবাড়ি ও নদীপাড়ের ফসলি জমি ভেঙে অনেকে ইতোমধ্যে সহায় সম্বলহীন হয়ে পড়েছেন। এছাড়া কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, টাঙ্গাইলে মোট ৪৩টি বালুমহাল রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১২টি জেলা প্রশাসনের ইজারা দেওয়া। ৩১টি বালুমহালের কোনো ইজারা নেই। এ সব বালুমহাল থেকে আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতা প্রভাব খাটিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। দরপত্রে কাঙ্ক্ষিত অর্থ না আসায় ১২টি বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়নি।
এছাড়া উচ্চ আদালতে জমিসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে রিট মামলা থাকায় স্থিতাবস্থা দেয়া হয়েছে ১২টি বালুমহালে। অপর ৭টি বালুমহালে শ্যালো মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর পাড় ভেঙে যাওয়ায় ইজারা বন্ধ রাখা হয়েছে।
জেলার হাতিয়া, সল্লা, আনালিয়াবাড়ি, বড় বাসালিয়া, শালিনা পাছবেথইর, ছিলিমপুর, বাবুপুরা, খল্লদবাড়ি, কৃষ্ণপুর, রেনুকুশা, পাছ বেথইর, মেঘাখালী, ফটিকজানী, নথখোলা, একঢালা, পংবরটিয়া, করটিয়া, বেরবাড়ি, স্বল্পলাড় গ্রাম, খানুরবাড়ী-কোনাবাড়ী, দোভায়া, গোপালগঞ্জ-দোভায়া, পলাশিয়া-পাথাইলকান্দি-বাইতান, চরগাবসারা, নলীন, মহেলা, পৌলী, এলেঙ্গা-পাথাইলকান্দি, হাকিমপুর, বাঁশি, ভুক্তা, বড়রিয়া, উত্তর তারটিয়া, বাউশাইদ, নন্দিপাড়া, চারাবাড়ী, জাঙ্গালিয়া- এ সব বালুমহাল থেকে অবৈধভাবে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী কতিপয় নেতা ইজারা ছাড়াই স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এ সব বালুমহাল থেকে বালু উত্তোলন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভূঞাপুর উপজেলায় প্রভাবশালী কতিপয় নেতা যমুনা নদীর ৫টি ঘাট দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণ করছেন। ঘাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অনেক সময় নিজেদের মধ্যে হামলা-মামলার ঘটনাও ঘটছে। এ সব বালুমহাল থেকে গড়ে প্রতিদিন ৩০০ ট্রাক বালু বিক্রি হচ্ছে টাঙ্গাইলের বিভিন্ন স্থানসহ রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুর, মানিকগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি জেলায়। সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি ট্রাক বালুতে লাভ হয় কমপক্ষে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি মাসে বালুমহাল থেকে তাদের আয় হয় কোটি টাকা। এখান থেকে সরকারকে রাজস্ব দিতে হয় না এক কানাকড়িও। অভিযোগ রয়েছে- প্রশাসন, আওয়ামী নেতা ও দু-একজন এমপিকে নজরানা দিয়ে তারা হাতিয়ে নিচ্ছে অবৈধ বালু ব্যবসার কোটি কোটি টাকা।
এদিকে যমুনা নদীর তীরবর্তী ভাঙনকবলিত এলাকার লোকজন সম্প্রতি বিক্ষোভ মিছিল করে টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেছেন। আলীপুর গ্রামের লাল মাহমুদ কালু শেখ, কাজী নওয়াব আলী, হাজী মান্নান, ঈশা শেখ, হযরত আলী মণ্ডল, হাবিবুর রহমান সরকার ও ভূঞাপুর উপজেলার গোবিনদাসী ঘাট এলাকার গোপালগঞ্জ গ্রামের হালিম মিয়া অভিযোগ করেন, ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে তাদের বাড়িঘর ও আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করার পরও কোনো সুরাহা হয়নি।
সরেজমিন ঘাটে গিয়ে দেখা গেছে, ১০টি ড্রেজার মেশিন বসিয়ে অবাধে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। কয়েকটি ট্রাক বালু নেয়ার জন্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রতিদিন এখান থেকে শতাধিক ট্রাক বালু বিক্রি হয়। ইজারা ছাড়াই পৌলী, সুরুজ, ছিলিমপুর ও বড়রিয়া ঘাট দখল করে রেখেছে সরকারদলীয় কয়েকজন নেতা। তারা প্রশাসনকে মোটা অংকের মাসোয়ারা দিয়ে এ সব বালুঘাট পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানতে চাইলে পৌলী ঘাটের বালু ব্যবসায়ী নবাব মিয়া বলেন, ‘আমরা ২০-২৫ দিন ধরে বালু উত্তোলন করছি। বালু উত্তোলন করায় নদীর কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। এ ছাড়া অনেকেই ব্যবসা করছেন। তাই আমরাও করছি।’
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আবু সালেহ্ মো. মহিউদ্দিন খাঁ বলেন, ‘মামলাসংক্রান্ত জটিলতায় অনেক বালুমহাল ইজারা দেয়া সম্ভব হয়নি। বালু উত্তোলনের ফলে নদীপাড়ের অনেকের ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এ সব কারণেও কিছু কিছু মহাল ইজারা দেয়া হয়নি। তবে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ঢাকা, ১০ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, জেআই





