আজ শনিবার আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস। আন্তর্জাতিক সমবায় মৈত্রী সংস্থা (আইসিএ) কর্তৃক দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে কো-অপারেটিভ : দ্য পাওয়ার টু এ্যাক্ট ফর এ সাসটেইনেবল ফিউচার।

প্রতি বছর বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে দিবসটি গুরুত্বের সাথে পালিত হয়ে আসছে। ১৯২৩ সালে আন্তর্জাতিক সমবায় মৈত্রী (আইসিএ) প্রতিবছর জুলাই মাসের প্রথম শনিবার আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সেই থেকে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস পালন শুরু।

পরবর্তীতে অবশ্য ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদও জুলাইয়ের প্রথম শনিবার আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস পালনের জন্যে একটি রেজুলেশন গ্রহণ করে।

সপ্তদশ শতকের শেষভাগ থেকে সমবায় সংগঠনের ভাবনা দানা বাঁধলেও শিল্প বিপ্লবের শুরুর পর এ চিন্তা বাস্তব রূপলাভ করে । ১৭৫২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে সমবায় সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। বৃটেনে আনুষ্ঠানিকভাবে সমবায় সংগঠন গঠিত হয় ১৮৪৪ সালে। রচডেল শহরে ১৮ জন বেকার যুবকদের নিয়ে রবার্ট ওবেন যে সমবায় আন্দোলনের যাত্রা শুরু করেছিলেন, তাদের ১৪ জনই ছিল তাঁত প্রযুক্তিবিদ্যা ডিপ্লোমাধারী। তাদের মূলধন ছিল মাত্র ২৮ পাউন্ড। তারা সেদিন সুতা-তাঁতকল রংয়ের সাথে সকলের লব্ধ প্রযুক্তিজ্ঞান সমন্বয় ঘটিয়ে ইতিহাসে সমবায় আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন।

এরপর জার্মানিতে কৃষক সমবায় সমিতি ও ফ্রান্সে উৎপাদক সমবায় সমিতি গঠিত হয়। পরবর্তীতে সমবায় সংগঠন সারা বিশ্বে একটা আন্দোলন হিসেবে গড়ে ওঠে। যা বাংলাদেশেও বিস্তৃতি লাভ করেছে। আমেরিকা, ইউরোপ, সিঙ্গাপুর, চীন, জাপান, কোরিয়াসহ পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে সমবায়ের অস্তিত্ব ও সাফল্য বিশেষ ঈর্ষণীয়।

আমেরিকা, ইউরোপ, সিঙ্গাপুর, চীন, জাপান, কোরিয়াসহ পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে সমবায়ের অস্তিত্ব ও সাফল্য বিশেষ ঈর্ষণীয়। ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেটিভ এয়ারেন্স (ICA)-র তথ্যমতে, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৮০ কোটি মানুষ সমবায়ের সদস্য। সমবায়ের মাধ্যমে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ১০ কোটি মানুষের। পৃথিবীর ৩০০ কোটি বা ৪৩ শতাংশ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছে সমবায়ের মাধ্যমে।

ভারতীয় উপমহাদেশে সর্বপ্রথম সমবায় আন্দোলনের সূত্রপাত করেন ফ্রেডারিক নিকলসন ১৮৯৫। সর্বপ্রথম কিছু ব্রিটিশ সিভিলিয়ান তাদের কর্মস্থল জেলাগুলিতে এ উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করে।

আমাদের দেশে প্রায়সর্বত্রই সমবায় প্রতিষ্ঠান বিস্তৃতি লাভ করেছে সত্য। তবে দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৬ শতাংশ সমবায়ের সদস্য। সমবায় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাথমিক সমবায় সমিতি ১ লাখ ৬৩ হাজার ৪৮০টি। সমিতি সমূহের সদস্য সংখ্যা ৮৫ লাখ ৫ হাজার ৭৩৮ জন। অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যার ২০ ভাগের প্রায় ১ ভাগ মানুষ সমবায়ের সাথে সম্পৃক্ত। উক্ত সমিতি সমূহের সম্মিলিত ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ১ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা।

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সমবায় সামিতির সংখ্যা ১ হাজার ১০৭ টি । আর জাতীয় ও জাতীয় পর্যায়ের সমিতি ২০টি। উল্লেখিত সমবায় সমিতির অর্ধেকের বেশি এখন আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিআইডিএসএর এক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্যই প্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশে মূলতঃ দুই ধরনের সমবায় ব্যবস্থা বিদ্যমান। একটি হলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা সমবায় । অন্যটি হলো স্বউদ্যোগে গড়ে ওঠা সমবায়। কৃষি, শিল্প, মৎস, দুগ্ধ বিপননসহ বিভিন্ন সেক্টরে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় সমবায় সমিতি গড়ে উঠেছিল যা এক সময় কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সে সব সমিতিগুলো এখন কালের স্বাক্ষী । নামে মাত্র টিকে আছে এই সমিতিগুলো। তবে এই সমিতিসমূহের প্রচুর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ দেশব্যাপী অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেদখল হয়ে গেছে। এই সম্পদ সমবায়িদের কোনো কাজে আসছে না।

অন্যদিকে নাগরিকদের স্বউদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত সমবায় সমিতিগুলো সমবায়ের সুফল জনগণের দোর গোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে। সারা দেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক সমবায় সমিতি সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বিশেষ ধারার সমবায় কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন দেশে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দি কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লীগ অব বাংলাদেশ (কাল্ব) এর তথ্য অনুযায়ী দেশের ৪৮টি জেলার ১৬০ উপজেলায় এ পর্যন্ত ১ হাজার ৫৮টি কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উক্ত সমিতিসমূহের মোট সদস্য ২ লাখ ৩৫ হাজার। মোট সম্পদের পরিমান ৫শ’ ৫২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এই বিশেষ ধারার সমবায় ছাড়াও দেশে কিছু বহুমূখী সমবায় সমিতি, পেশাজীবি সমবায় সমিতি ও মহিলা সমবায় সমিতি স্বস্ব ক্ষেত্রে সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

বাংলাদেশে সমবায়ের সমস্যা যেমন আছে, তেমনি সম্ভাবনাও আছে। বাংলাদেশের মত দরিদ্র জনবহুল দেশে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্যে সমবায়ের কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশে দিবসটি উদযাপনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় ইউনিয়ন মতিঝিলের সমবায় সদনে সকাল ১১টায় পতাকা উত্তোলন ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এ ছাড়া সমবায় অধিদপ্তর কর্তৃক আগারগাঁওয়ের সমবায় ভবনে বিকাল সাড়ে ৫টায় আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে এবং বিভাগ ও জেলা সমবায় কার্যালয়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি উদযাপনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

ওএফ