হাজারীবাগের ট্যানারি থেকে দৈনিক ২২ হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত বর্জ্য এখনও বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলা হচ্ছে। এসব বর্জ্যে ক্রোমিয়াম, লেড, সালফিউরিক এসিড, চামড়া প্রক্রিয়াকরণে ব্যবহৃত ভারী ধাতু এবং লবণসহ বিভিন্ন বিষাক্ত ও বিপজ্জনক রাসায়নিক দ্রব্যাদি রয়েছে। আর্থিক মূল্যে যার পরিবেশগত ক্ষতি বর্তমানে ২ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) উদ্যোগে বৃহস্পতিবার রাজধানীর কলাবাগানে সংগঠনটির কার্যালয়ে আয়োজিত ‘ট্যানারি স্থানান্তরের সর্বশেষ অবস্থা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ চিত্র তুলে ধরা হয়।
পবার চেয়ারম্যান আবু নাসের খানের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পবার সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মো. আবদুস সোবহান। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন- পবার সহ-সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম, স্থপতি শাহীন আজিজ, সমন্বয়কারী আতিক মোরশেদ প্রমুখ।
ট্যানারি শিল্পের স্থানান্তর নিয়ে বৃহস্পতিবার পবা তাদের ৮ম প্রতিবেদন প্রকাশ করল।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দীর্ঘ ৬৬ বছর ধরে বুড়িগঙ্গা নদীকে দূষণ করে চলেছে হাজারীবাগের ট্যানারি। বর্তমানে বুড়িগঙ্গার পানি শিল্প, কৃষি ও গৃহস্থলী কাজে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এমনকি ওই পানি পরিশোধন করেও ব্যবহারের উপযোগী করা সম্ভব না। হাজারীবাগের ট্যানারি থেকে প্রতিদিন আনুমানিক ১০ মেট্রিক টন কঠিন বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। সর্বোচ্চ উৎপাদনকালে এর পরিমাণ প্রায় ২০০ মেট্রিক টন।
এদিকে সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপির) বর্জে্যর অভাবে চালু হচ্ছে না। ট্যানারি স্থানান্তরে ব্যর্থ শিল্প মালিকদের প্লট বাতিলসহ গ্যাস, পানি, বিদুুৎ বিছিন্ন করা এবং বিদ্যমান আইনে সংশ্লিষ্ট মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও জানিয়েছে পবা।
পবার পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ দলের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, সিইটিপির দুটি মডিউলের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। সিইটিপির বাকি দুটি মডিউলের নির্মাণকাজ ধীর গতিতে চলছে। এদিকে ট্যানারির বর্জ্য তিনটি ইপিএসের (বর্জ্য পাম্পিং স্টেশন) মাধ্যমে সিইপিটিতে যাবে। বর্জ্য ইপিএস হয়ে সিইটিপিতে যাওয়ার পাইপ স্থাপন করা হয়েছে। তবে ২ নম্বর ইপিএসের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলেও ১ নম্বর ইপিএসের নির্মাণকাজ চলছে এবং ৩ নম্বর ইপিএসের নির্মাণকাজ অত্যন্ত ধীর গতি চলছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ৩৯টি ট্যানারিতে ট্যানিং ড্রাম স্থাপনের কাজ চলছে। ছয়টি প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন শুরু হয়েছে। সিসিআরইউ চালু না হওয়ায় ক্রোমিয়াম মিশ্রিত বর্জ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ইপিএস-১ সম্পন্ন না হওয়ায় পাইপের মাধ্যমে বর্জ্য ইপিএস-২ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সাবস্টেশন নির্মাণ এবং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে ১৪২টি ট্যানারি আবেদন করেছে। ১৩২টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ডিমান্ড নোট ইস্যুর পর ২৬টি প্রয়োজনীয় অর্থ জমা দিয়েছে। ১৭টি প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সাবস্টেশনের মধ্যে কিছু সংখ্যক নির্মাণ করা হয়েছে এবং কিছু নির্মাণাধীন।
এদিকে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত ট্যানারির তরল বর্জ্য পাইপের মাধ্যমে সিইটিপিতে ফেলা হলেও কঠিন বর্জ্য ধলেশ্বরী নদীর পাড়ে, প্রকল্প কার্যালয়ের রাস্তার দুপাশে ও আবাদি জমিতে ফেলা হচ্ছে। এর ফলে এলাকার পরিবেশ এবং ধলেশ্বরী নদী দূষণ ও ভরাট হচ্ছে।
অন্যদিকে যে ৩৯টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ট্যানিং ড্রাম স্থাপনের কাজ চলছে তার প্রায় সবগুলোতেই বিদ্যুৎ সাবস্টেশনের নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। ফলে সব কিছু প্রস্তুত হলেও বিদ্যুতের অভাবে শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু করা সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছে পবা।
২০০১ সালে হাইকোর্ট এক রায়ে হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর ২০০৯ সালের ২৩ জুন আরেক আদেশে ট্যানারি সরানোর জন্য ২০১০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন। পরবর্তীতে সরকার পক্ষের আবেদনে ওই সময়সীমা কয়েক দফা বাড়ানোর পরও ট্যানারি স্থানান্তরে হাইকোর্টের আদেশ বাস্তবায়ন হয়নি।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ গত ১৮ জুলাই হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর না করা পর্যন্ত ১৫৪টি ট্যানারির মালিকের প্রত্যেককে পরিবেশ দূষণের ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
এসএ





