বিস্ময়করভাবে দেশে ধানসহ খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিমাণ বেড়েছে। মানুষ এখন না খেয়ে নেই । এটি সব হয়েছে দেশের পরিশ্রমী কৃষকসমাজসহ রাষ্ট্রপক্ষের সংশ্লিষ্টজনের কৃষি - সংবেদনশীল কর্মসূচির ফলে । কিন্তু তারপরও প্রতিনিয়ত দেশের কৃষিখাত বারবার নানা সংকটে পড়ছে বলে মন্তব্য করেন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পাবা)।
সোমবার (২৭মে) জাতীয় প্রেসক্লাবে 'ধান ও কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য : সংকট ও প্রস্তাবনা' ব্যানারে আয়োজিত এক সেমিনারে সংগঠনটি এসব মন্তব্য করেন।
সেমিনারে বক্তরা বলেন, এদেশে শতকরা ৭৫ ভাগ লােক গ্রামে বাস করে। গ্রাম এলাকায় ৫৯.৮৪% এবং শহরের ১০.৮১% লােকের কৃষিখামার আছে। ধান , পাট , তুলা , আখ , ফুল ও রেশমগুটির চাষসহ বাগান সম্প্রসারণ , মাছ চাষ , সজি , পশুসম্পদ উন্নয়ন , মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি , বীজ উনড়বয়ন ও বিতরণ ইত্যাদি বিষয়সমূহ এ দেশের কৃষি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহের কর্মকান্ডের অন্তর্ভূক্ত। কিন্তু , কৃষিক্ষেত্রে দিন দিন রাষ্ট্রীয় প্রণােদনা ও জাতীয় বাজেট কমছে। কয়েক বছর আগে মােট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান ছিল ১৯ .১% এবং এ খাতের মাধ্যমে ৪৮.১% মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। ২০১৭ - ২০১৮ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ . ২৩ %। রাষ্ট্র কৃষিকে দেখে খাদ্য উৎপাদনের মূলখাত হিসেবে ।
তারা বলেন, ২০১৩ সনের ভেতর সকলের জন্য খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকার ‘ ভিশন ২০২১ ' গ্রহণ করে। কৃষি কেবলমাত্র এককভাবে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নয় ; দেশের মানুষের আয় এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত করণের পাশাপাশি প্রতিটি বাস্তুসংস্থানের অপরাপর জীবিত প্রাণসত্তার বেচে থাকাকে সহায়তা করে।
বক্তরা আরও বলেন, কৃষিজমি সুরক্ষা , কৃষির যান্ত্রিকীকরণ , জৈবকৃষি বনাম রাসায়নিক কৃষি , কৃষিতে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ , অপ্রতুল ভতুর্কী , কৃষিপণ্যের বাজার ও নিরাপদ খাদ্য , জেন্ডারবৈষম্য , দুর্যোগজনিত কারণে ফলন বিপর্যয় এবং জলবায়ুজনিত প্রভাব মােকাবিলার মতাে সংকটগুলাে সামাল দিয়েই প্রতিদিন মাথা তুলে দাঁড়ায় বাংলাদেশের কৃষি । তাহলে বাংলাদেশের কৃষির চলমান সংকট কী? গত কয়েকবছর ধরে ধান ও চালের ন্যার্য্যমুল্য বিতর্ক এক্ষেত্রে এক প্রধান বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। কৃষিকাজে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ কমছে , পাশাপাশি রােপণ ও সংগ্রহ মওসুমে তৈরি হচ্ছে নিদারুণ শ্রমিক সংকট। উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য এবং উৎপাদনে জড়িত মানুষের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাওয়া দেশের কৃষিক্ষেত্রের সংকটকে জটিল করে তুলছে। এই সংকট সুরাহা হওয়া জরুরি।
সেমিনার থেকে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পাবা) ধানের ন্যায্যমূল্য ও কৃষির চলমান সংকট নিরসনের লক্ষ্যে কিছু প্রস্তাবনা দেওয়া হয়:
১. ধানসহ কৃষিপণ্যের একটি সুনির্দিষ্ট মূল্যতালিকা নির্ধারণ করতে হবে।
২. ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ক্রয় - বিক্রয়ের জন্য একটি সক্রিয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামাে গড়ে তুলতে হবে।
৩. সকল কৃষকের জন্য কৃষিকার্ড ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নিশ্চিত করতে হবে।
৪. দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ধানসহ কৃষিপণ্য মজুতকরণের শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
৫. কৃষিপণ্য ক্রয় - বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ফড়িয়া , মহাজন , দালাল , মধ্যস্বত্বভােগীদের প্রতাপ ও খবরদারি বন্ধ করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
৬. কৃষক সরাসরি সরকারি কৃষিপণ্য বিক্রয়কেন্দ্রে কৃষিপণ্য বিক্রয় করার সুব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে। কৃষকের নিজস্ব কৃষিকার্ড ( পরিবারের সদস্যসহ ) এবং জাতীয় পরিচয়পত্র , ভােটার আইডি ব্যবহার করা যেতে পারে ।
৭. দেশের প্রতিটি প্রান্তে কত দামে কৃষিপণ্য ক্রয় - বিক্রয় হচ্ছে এবং প্রতিটি মওসুমে কী ধরণের কৃষিপণ্য কতটুকু উৎপাদন ও মজুত হয়েছে এবং ক্রয় - বিক্রয় হচ্ছে এসবের সামগ্রিক তথ্য সরকারিভাবে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন ডিজিটাল তথ্যকেন্দ্রে হালনাগাদ থাকতে হবে।
৮. ধনসহ কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণে স্থানীয় পর্যায়ে ইউনিয়ন ভিত্তিক কমিটি গঠন করতে হবে। কমিটিতে স্থানীয় সরকার সদস্য , কৃষক প্রতিনিধি , নারী কৃষক , আদিবাসী প্রতিনিধি , যুব প্রতিনিধি , দুর্যোগ কমিটির সদস্য , বাজার কমিটির সদস্য , প্রশাসনের সদস্য , মানবাধিকার সংগঠক , সাংবাদিক থাকতে হবে।
৯. কৃষকের জন্য সহজ বিনাশর্তে কৃষিঋণ ও ভতুর্কী ও বিশেষ প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে।
১০. কৃষিপণ্যের নানামুখী ব্যবহার ও ভ্যালু যুক্তকরণের জন্য বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
১১. দেশীয় কৃষিপণ্যের আন্তজাতিক বাজার প্রবেশাধিকার ও রপ্তানীর জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
১২. কৃষিজমির অকৃষিখাতে ব্যবহার সামগ্রিকভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে।
১৩. কৃষিতে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ বাড়াতে সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
১৪. গ্রামীণ দারিদ্র্যের স্বরূপ সন্ধান ও বিশ্লেষণ করে দেশের প্রতিটি এলাকায় আয়বৈষম্য , কর্মহীনতা , কর্মসংস্থানের অভাব , কৃষি পেশার মর্যাদাহীনতাকে বিশ্লেষণ করে দেশের প্রতিটি এলাকার তরুণ প্রজন্মকে আরাে কার্যকরভাবে কৃষির নানামুখী ক্ষেত্রে যুক্তকরণের কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
১৫. উৎপাদন থেকে কৃষিপণ্য ব্যবহার অবধি সকল স্তর ও পর্যায় ক্ষতিকর রাসায়নিক দূষণ , শ্রমশােষন ও ন্যূণতম বৈষম্য দূর করে কৃষিকে দেশের কৃষক পরিবারের পারিবারিক কৃষিঐতিহ্য হিসেবে বিকশিত হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে।
১৬. কৃষির সাথে স্থানীয় থেকে জাতীয় পর্যায়ে জড়িত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং কর্মসূচি সমূহের তথ্য নিয়মিত পাবলিক করা জরুরি এবং সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা আরাে দায়িত্বশীল ও দায়বদ্ধকরণের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
সেমিনারে আবু নাসেরের সভাপতিত্বে এবং ফেরদৌস আহমেদ উজ্জলের সঞ্চলনায়, প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, কৃষিক লীগের সহ-সভাপতি ছবি বিশ্বাস, আজহারুল ইসলাম, রোকেয়া বেগমসহ প্রমুখ।
এসএম





