কুষ্টিয়ায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে দেশীয় বীজ। ফলে আবির্ভূত বিদেশি হাইব্রিড বীজে সয়লাব এখানের হাট-বাজার। যুগোপযোগী পদক্ষেপ না থাকায় গত ৩০ বছরে বিভিন্ন ফসলের কয়েক’শ প্রজাতির নিজস্ব বীজ হারিয়ে গেছে। অন্যদিকে কৃষকরা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত বীজের উপর।

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আমবাড়িয়া গ্রামের হাসান আলী (৬৫) জানান, এক সময়ে জমিতে বোনা ধানের বীজ এখন কেবলই অতীত। জমি না বাড়লেও মানুষ বেড়েছে। তাই বাস্তবতার তাগিদ থেকেই বর্ধিত প্রয়োজন মেটাতে এখন কম জমিতে বেশি উৎপাদন করতে কৃষকরা বেছে নিয়েছে হাইব্রিড ও উফশী জাতের বীজ। ফলে ব্যবহার না থাকায় হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় নানা ফসলের বীজ।

কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার আলামপুরের প্রবীন কৃষক আনোয়ার আলী (৭০) জানান, এক সময় চাষিরা নিজের জমিতে ফলানো ফসল থেকেই বেছে নিয়ে ভালো মানের বীজ রেখে দিত এবং পরবর্তী মৌসুমে আবার তা থেকেই ফসল ফলাতো। কিন্তু এখন তা আর কেউ করে না। এখন তারা বাজারের ওপরই নির্ভরশীল।

কুমারখালী উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা কাইজারুল ইসলাম জানান, বর্তমান দেশের ক্রমবর্ধমান খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে হাইব্রিড ও উফশী জাতের বীজ ব্যবহারের কোন বিকল্প নেই। কারণ আমাদের দেশীয় বীজে যে ফলন হয় তা দিয়ে কোন ভাবেই উৎপাদনের কাংখিত লক্ষ অর্জন সম্ভব নয়। এর ফলে ধান, গমসহ বিভিন্ন কৃষি পণ্যের দেশীয় বীজ আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।

তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে প্রধান খাদ্য ফসল ধানের দেশীয় বীজ কালোবকরি, হাসিকলমী, ঝিঙেশাইল, হলুদ জাকন, বাঁশফুল, বিআর-১,৩,৬ ও ৮ এরকম প্রায় ৩০টি প্রজাতির বীজ এখন আর কৃষকরা ব্যবহারও করে না এবং এর কোন অস্তিত্বও আর দেখা যায় না। বর্তমান কৃষকরা উফশী ও হাইব্রিড জাতের বীজ ব্যবহার করে হেক্টর প্রতি যথাক্রমে ৪-৫ টন এবং ৮-১০ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন করছে, সেখানে দেশীয় বীজে উৎপাদন হয় মাত্র ২-৩ মেট্রিক টন। সেকারণে অতি স্বাভাবিক নিয়মেই দেশীয় বীজের স্থান দখল করেছে হাইব্রিড বীজ।

পরিবেশ কর্মী গৌতম রায় জানান, বাস্তবতাই আমাদের নির্ভরশীল করে তুলেছে এসব বীজের ওপর। তবে কাক্সিক্ষত ফল পেতে রাসায়নিক উপাদান সার, কীটনাশক প্রয়োগের কারণে প্রাকৃতিক ভাবেই উর্বর মাটি হারাচ্ছে তার স্বকিয়তা।

কুষ্টিয়া বিএডিসি অনুমোদিত বীজ পরিবেশক এএম যুবায়ের রিপন জানান, বর্তমান দেশের কৃষি পণ্যের উফশী জাতের বীজ সিংহভাগই সরবরাহ করে থাকে বিএডিসি’র বীজ বিপনন বিভাগ থেকে। তবে এর বাইর্ওে বিভিন্ন ব্যক্তি মালিকানা প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে আমদানিকৃত হাইব্রিড বীজ বাজার জাত করে আসছে। আমদানিকৃত এসব বীজের বাজার দখল করে আছে যথাক্রমে এসিআই বীজের জাত- ‘এস্আিই-১’ ‘তেজ’, ব্রাক ‘আলোড়ন’, সুপ্রিম সিড ‘হীরা’, কুষ্টিয়া সিড ‘মানিক-২’ সহ এরকম ৮/১০টি কোম্পানি তাদের আমদানিকৃত বীজের বিভিন্ন ব্রান্ড নাম দিয়ে বাজারে ছেড়েছে।

বিএডিসি কুষ্টিয়া ডিভিশন’র আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক (বীজ বিপনন) মাসুদ আহমেদ জানান, দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও শিল্পায়নসহ নানা বিধ কারণে আবাদি জমি দিন দিন কমে যাচ্ছে। এবিষয়টা বিবেচনায় নিয়েই দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান’র গবেষকরা উফশী ও হাইব্রিড বীজ উদ্ভাবনে নিজস্ব খামার থেকে উৎপাদন করে তা কৃষকদের মাঝে সরবরাহ করে আসছে।

এসব বীজ সরবরাহের ক্ষেত্রে তিনটি স্তরকে বিবেচনায় রাখা হয়। যেমন- ১. বিডার বীজ : যা কেবলমাত্র গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জন্য আমদানি করা হয়। ২. ভিত্তি বীজ : যা প্রধানত বিএডিসি’র খামারে বীজ পূণঃ উৎপাদনের লক্ষ্যে ব্যবহৃত হয়। ৩. প্রত্যায়িত বীজ : যা কোন কৃষক নিজ জমিতে উৎপাদন করে উপযুক্ততার প্রমাণ করে তা বাজারজাত করতে পারে।

ইআর