নড়াইল থেকে ঢাকাগামী হানিফ পরিবহন ফরিদপুরের ভাঙ্গায় ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পড়ে। এ দুর্ঘটনায় নিহতদের অধিকাংশের বাড়ি নড়াইলের বিভিন্ন এলাকায়। নিহতদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম।

এদিকে পুড়ে চেহারা বিকৃত হওয়ায় অনেকেই তাদের স্বজনদের চিনতে পারছেন না। দুর্ঘটনায় আহত ১৪ জনের চিকিৎসা চলছে নড়াইল সদর হাসপাতালে।

শুক্রবার রাত ৯ টায় নড়াইল চৌরাস্তা কাউন্টার থেকে  ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় এ হানিফ পরিবহনটি। ভাঙ্গা এলাকায় পৌছালে সামনের চাকা ফেটে দুর্ঘটনায় পতিত হয়। দুর্ঘটনায় নিহত ১৩ জনের অধিকাংশই নড়াইলের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। স্বজন হারিয়ে এসব বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। পরিবারের আপনজনকে হারিয়ে দিশেহারা স্ত্রী,সন্তান ও ভাই বোনেরা নির্বাক হয়ে পড়েছে।

এ দূর্ঘটনায় নিহত শেখ আলমগীর হোসেন(৫৬) এর পরিবারের উপর নেমে এসেছে চরম অমানিশা। তার বাড়ি নড়াইল পৌরসভার বরাশুলা গ্রামে। এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে বিপাকে পড়েছেন স্ত্রী সালমা সুলতানা(৪২)। ছেলে সাইদুল ইসলাম সৌরভ (১৬) এসএসসি পরীক্ষার্থী। বাবার লাশ দাফন করে পরদিন ভোরে তাকে অংক পরীক্ষা দিতে হয়েছে। মেয়ে আদিবা জান্নাত (৮) বাড়ির পাশে বরাশুলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেনীর ছাত্রী। নড়াইলের কালিয়া উপজেলার প্রত্যন্ত পাটেশ্বরী গ্রামের আফসার শেখের বড় ছেলে আলমগীর।

১৯৯৩ সাল থেকে একটি বেসরকারী চাকুরী দিয়ে জীবন শুরু করেন। ১৯৯৬ সালে বৈবাহিক জীবনে পা দেন। ৫ ভাই ও ৬ বোনের মধ্যে সে সবার বড়। তাই অভিভাবক হিসেবে অর্থনৈতিক সহায়তা ছাড়াও সব ধরনের পরামর্শ দিতে হতো তাকে।

টেক্সটাইল টেকনিক্যাল কাজ জানা থাকার সুবাদে তার চাকুরীর ঘাটতি হয়নি কোনদিন । চাকুরী করতেন মেইনটেনস অফিসার পদে। কর্মরত ছিলেন ঢাকার বাইপাইল এলাকার সিএমসি কামাল টেক্সটাইল মিলে। টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এ ডিপ্লোমা করা অভিজ্ঞ আলমগীর চাকুরীর শুরুতেই প্রতিমাসে আয় করতেন ৪০ হাজার টাকা। নিজের সঞ্চিত অর্থে নড়াইল শহরতরী এলাকার বরাশুলা চরপাড়ায় ৭ শতক জমি কিনেন। সেখানে টিনের চালদেয়া একতলা ঘরে ৪ জনের পরিবারে বেশ স্বচ্ছল ভাবেই চলছিল। পরিবারের সদস্যদের ৫ বছর আগে শহরের এ বাড়িকে নিয়ে আসেন। ছেলেকে ভর্তি করেন নড়াইল সরকারী উচ্চ বিদ্যলয়ে।

ভাই -বোনদের প্রত্যেকের সংসার আলাদা হলেও বড়ভাই ছাড়া তাদের কোন কাজই চলতো না। মেজভাই মহসীন শেখ কাদতে কাদতে বলেন, কুড়ি বছর ধরে বড়ভাই ছাড়া কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি, কোথায় চাকরী করবো ,গ্রামে জমি রাখার ব্যাপারে এমনকি আমাদের প্রত্যেক ভাই বোনের শ্বশরবাড়ির সব ঝামেলা মেটাতেন বড় ভাইজান। স্ত্রী সালমা সুলতানা নির্বাক হয়ে পড়েছেন। নিজের ও ছেলে মেয়ের ভবিষ্যত নিয়ে শংকিত তিনি।

অনেক কষ্টে বললেন, আমি সব হারিয়েছি। ভাই আমি তো এখন নিস্ব। আমার ছেলে কিভাবে পরীক্ষা দেবে। এরপর ওর ভবিষ্যৎ কি হবে। ওর বাপের ইচ্ছা ছিলো ছেলেকে বিবিএ পড়াবে। কোম্পানীর বড় অফিসার বানাবে। এখন কে এসব করবে। কে দেবে আমাদের আশা। আমার পরিবার আমার শ্বশুর বাড়ির পরিবার দেবর ননদ সবাই যার মুখের দিকে তাকায়ে থাকতো আজ সে নেই। তাকে না পেয়ে অন্যরা কিভাবে চলবে। গ্রামের বাড়িঘর ছেড়ে ভালো জীবনের আশায়,ছেলে মেয়েকে ভালোভাবে মানুষ করা দুরে থাক,আমার ছেলে-মেয়েকে কিভাবে খাওয়াব সেই চিন্তায় আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি।

ছেলেটি ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদছে,তার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছেনা। তোমার পরীক্ষা কেমন হচ্ছে, এর উত্তরে তার মুখ দিয়ে কেবল গোঙ্গানীর শব্দ বের হয়ে আসলো।

শুক্রবার (১০ ফেব্রুয়ারী) রাতে হানিফ পরিবহনের চৌরাস্তা কাউন্টার থেকে এ-থ্রি আসনে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন তিনি। কয়েকদিন আগে ছোট একবোন মারা যাওয়ায় সে বিষয়ে জরুরীভাবে  ৯ ফেব্রুয়ারী রাত সাড়ে ৯টায় বাড়িতে আসেন। দূর্ঘটনার খবর পেয়ে পরিবারের লোকেরা ছুটে যান ফরিদপুর মেডিকেলে। সেখানে ভাইয়ের শার্ট এবং সোয়েটারের কলারের পুড়ে যাওয়া অবশিষ্ট অংশ দেখে আলমগীরকে সনাক্ত করেন। শনিবার রাতে লাশ নিয়ে এসে গ্রামের বাড়ি পাটেশ্বরীতে গভীর রাতে তাকে দাফন করেন।

রিন্টু/এমই