১৩ বছরের এক কিশোরকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনায় বাংলাদেশ স্তব্ধ, হতবাক, প্রতিবাদমুখর। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও চলছে নিন্দা, প্রতিবাদের ঝড়। হত্যাকারীদের বিচার চাইতে গিয়ে আবেগতাড়িত হয়ে পড়ছেন অনেকে।

সিলেটের কুমারগাঁওয়ে যা ঘটেছে তা চোখে দেখলে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা সত্যিই কঠিন। চোর সন্দেহে সামিউল আলম রাজনকে বেঁধে পিটিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। হাসতে হাসতে মেরেছে তারা। তৃষ্ণার্ত রাজন কাঁদতে কাঁদতে পানি চেয়েছে। পানি না দিয়ে বলা হয়েছে, ‘‘গায়ের ঘাম খা।''

শেষদিকে ছেলেটি সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় আকুতি জানিয়েছে, ‘‘আমি মরে যাচ্ছি, কেউ আমাকে বাঁচাও।'' কেউ বাঁচাতে যায়নি। বরং হত্যাকারীরা অকথ্য নির্যাতনের মুখে রাজনের আর্তনাদ এবং তার মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ভিডিও করে শেয়ার করেছে ফেসবুকে। ভিডিও দেখে অনেকে ঘুমাতে পারেননি। ফেসবুক, টুইটারে তাঁরা জানিয়েছেনও সে কথা।

গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার লিখেছেন:

‘‘আমি সারারাত ঘুমাতে পারিনি। আমার ধারনা অন্যদেরও একই অবস্থা। মানুষের পক্ষে ঘুমানো অসম্ভব। আসুন, সবাই মিলে রাজনের খুনীদের ঘুম হারাম করি। রাজনের খুনী এই কুলাঙ্গারের নাম কামরুল। এই খুনীকে দেশে-বিদেশে যেখানে পাবেন, রশি দিয়ে বেঁধে পুলিশে খবর দিন। প্রয়োজনে পোস্টার ছাপিয়ে এই খুনীর ছবি ছড়িয়ে দিন সবখানে।''

রবার্ট গিবসন টুইটারে লিখেছেন, ফেসবুকে সিলেটে একটি ছেলেকে নৃশংসভাবে হত্যা করার ছবি দেখলাম। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানাই এবং বিচার চাই। কোনো মানুষের অন্য কারো সঙ্গে এমন আচরণ করার অধিকার নেই''

এমন ঘটনা বন্ধ করার জন্য আইনকে নিজের মতো চলতে দেয়া এবং দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনের কথাও উঠেছে।

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম শুধু প্রতিক্রিয়া জানানোর মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বাংলাদেশে রাজনের মতো আর কাউকে যেন মরতে না হয় এ কামনা করে সবার প্রতি শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

মুশফিক লিখেছেন, ‘‘একটি নিষ্পাপ শিশুকে নির্যাতন করে মেরে ফেলার মতো বড় অপরাধ মনে হয় আর নেই। শিশু নির্যাতনকে ‘না' বলুন।''

মানুষ কোনো মানুষের সঙ্গে, বিশেষ করে কোনো শিশুর সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারে তা অনেকেই বিশ্বাস করতে পারছেননা। এমন একজন বিদ্রুপ করে লিখেছেন, ‘‘এ এক অদ্ভুত ব্যাপার! এতকিছুর পরও আয়নার সামনে দাঁড়ালে আমাদের মানুষের মতোই দেখায়! এ লজ্জা কোথায় রাখি?''

আরেকজন মনে করেন, এমন নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে মারা যাওয়া রাজন হয়তো বাংলাদেশের মানুষকে ক্ষমা করবেনা। তাঁর ভাষায়, ‘‘রাজন আমাদের ক্ষমা করবেনা৷''

আরেকজন মৃত্যুর আগে রাজন যে ‘পানি দাও, পানি দাও' বলে কেঁদেছিল, সে কথা স্মরণ করে লিখেছেন, ‘‘পানির জন্য রাজন কাঁদেনি, মানবতা কেঁদেছে৷''

রবিবার ওয়ানডে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৭ উইকেটে হারিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু রাজনের মৃত্যু সে আনন্দ অনেকটাই মাটি করে দিয়েছে। ম্যাচ শেষ হবার আগেই নৃশংসভাবে পিটিয়ে রাজনকে মেরে ফেলার ঘটনা মনে করে একজন টুইট করেছেন, ‘‘আজ ক্রিকেট মাঠে যা-ই হোক, বাংলাদেশ হেরে গেছে।''

টুইটারে আরেকজন লিখেছেন, ‘‘আমি কয়েকবার ভিডিওটি দেখার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সাহসের অভাবে দেখতে পারিনি। আমি মানুষের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছি।''

এদিকে রাজন হত্যার প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে সমাবেশও হচ্ছে।

হত্যাকারীদের ধরার চেষ্টাও চলছে। একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মুহিত আলম নামের ওই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। (সূত্র: ডি ডাব্লিউ)

এমকে