শহীদ পরিবারের সন্তান সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের মামলায় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। সোমবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ফরিদপুরের আমলি আদালত-১ এর বিচারক হামিদুল ইসলাম এই নির্দেশ দেন।
ফেসবুক স্ট্যাটাসে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম উল্লেখ করায় মর্যাদাহানির অভিযোগ এনে আইসিটি এ্যাক্টে করা মামলাটিতে পুলিশ তার বিরুদ্ধে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। আদালত শুনানির জন্য মঙ্গলবার দিন ধার্য করেছেন।
এর আগে জীবন শঙ্কা নিয়ে সম্প্রতি ফেসবুকের এক স্ট্যাটাসে প্রবীর সিকদার স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম উল্লেখ করেন।
প্রবীরের ওই স্ট্যাটাসে রবিবার রাত ১১টার দিকে ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানায় তথ্যপ্রযুক্তি আইনে ফরিদপুরের এপিপি এ্যাডভোকেট স্বপন কুমার পাল মামলাটি করেন।
সম্প্রতি ফেসবুকে মুসা বিন শমসের ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মোশাররফ হোসেনকে নিয়ে বেশ কয়েকটি পোস্ট দেন সাংবাদিক প্রবীর সিকদার।
গত ২৫ জুলাই প্রবীর সিকদার ফেসবুক পেজ থেকে এ রকম একটি স্ট্যাটাসে তিনি মুসা বিন শমসেরকে নিয়ে লেখেন। স্ট্যাটাসটিতে শেরেবাংলানগর থানায় তার জিডি না নেওয়ার বিষয় উল্লেখ করেন।
জনতার আদালতে সাধারণ ডায়েরি !
‘রাজাকার নুলা মুসা ওরফে প্রিন্স ড. মুসা বিন শমসেরের একাত্তরের কুকীর্তি ফাঁস করেছিলাম আমি ২০০১ সালের ২৪ মার্চ দৈনিক জনকণ্ঠে। তারপর আমি নৃশংস হামলার শিকার হই। অতি সম্প্রতি এক দালাল নুলা মুসাকে বঙ্গবন্ধুর সাথে তুলনা করে নিবন্ধ লিখেছে। অবশ্য এই দালালি নতুন নয়। এক সময় রাহাত খানও নুলা মুসার জুতা কীর্তন করেছে। ক্ষোভে-বিক্ষোভে আমি অনলাইন নিউজ পোর্টাল উত্তরাধিকার ৭১ নিউজে দৈনিক জনকণ্ঠে ২০০১ সালে প্রকাশিত নুলা মুসা সম্পর্কিত লেখাটি আবার প্রকাশ করি। উত্তাল হয়ে ওঠে ফেসবুক টুঁইটারসহ অনলাইন মিডিয়া। একই সঙ্গে বাড়তে থাকে আমার জীবন শংকা। আমার ও আমার পরিবারের সদস্যদের জীবন শংকার কথা জানিয়ে গত ২২ জুলাই ২০১৫ সকালে ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করতে যাই। পুলিশ কর্মকর্তাদের আচরণে আমি মুগ্ধ হই। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহনের আশ্বাস দিয়ে থানার ইন্সপেক্টর তদন্ত সাব্বির আহমেদ রাতে অনুলিপি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমার কাছ থেকে সাধারণ ডায়েরির কাগজপত্র রেখে দেন। ওই দিনই বিকেলে জলিল নামের একজন এসআই আমার সাথে দেখা করে বিস্তারিত জেনে যান। তারপর তিন দিন পেরিয়ে গেলেও থানায় আমার সাধারণ ডায়েরি এন্ট্রি হয়নি। আজ দুপুরে আমি টেলিফোনে কথা বলি থানার অফিসার ইনচার্জের সাথে । তিনি বেশ আন্তরিক। আমার নিরাপত্তা বিধানেও নানা তৎপরতার কথা বললেন। কিন্তু সাধারণ ডায়েরি এন্ট্রি করার ব্যাপারে অনাগ্রহ দেখালেন। আমি এখন বাধ্য হয়ে আমার ও আমার পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা শংকার সেই সাধারণ ডায়েরিটি জনতার আদালতে পেশ করলাম : (ছবি সংযুক্ত)
এরপর আগস্ট মাসে তার ফেসবুক পেজে বেশ কয়েকটি স্ট্যাটাস দেন তিনি।
১৬ আগস্টের ফেসবুক স্ট্যাটাস
বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিধন্য ফরিদপুর জেলা কারাগারে জাতীয় শোক দিবস নিষিদ্ধ !
প্রতি বছর বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিধন্য ফরিদপুর জেলা কারাগারের অভ্যন্তরে হাজতি-কয়েদিদের উদ্যোগে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস পালন করা হয়। কিন্তু এবার রহস্যজনক কারণে ফরিদপুর জেলা কারাগার কর্তৃপক্ষ ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস পালন করতে দেয়নি। এই ঘটনায় হাজতি-কয়েদিরা দারুণভাবে মর্মাহত।
১৩ আগস্টের ফেসবুক স্ট্যাটাস
মুক্তিযোদ্ধা মানস মুখার্জির নিঃশর্ত মুক্তি চাই
হাইব্রিড আওয়ামী লীগারদের ষড়যন্ত্রের শিকার মুক্তিযোদ্ধা মানস মুখার্জির নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে ফরিদপুর এবং ঢাকায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচির আয়োজন চলছে।
খুব তাড়াতাড়ি ওই কর্মসূচির দিন তারিখ সময় ঘোষণা করা হবে।
একই দিন বিকেলে, একদল হিন্দুকে নিজের ডেরায় ডেকে এনে এক মহান নেতা বয়ান দিলেন, ‘আমি যদি একটু ইঙ্গিত করি তাহলে আর তোমরা হাত-পা নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারবে না।’
১২ আগস্টের ফেসবুক স্ট্যাটাস
অরুণ গুহ মজুমদার ও তার পরিবার আসলেই এখন কোথায় ?
ফরিদপুর শহরের বহল আলোচিত ‘দয়াময়ী ভবন’-এর মালিক অরুণ গুহ মজুমদার ও তার পরিবারের সদস্যরা এখন আসলে কোথায় সেই প্রশ্নের উত্তর দ্রুত খুঁজে বের করা জরুরি। নিখোঁজ ওই পরিবারটিকে খুঁজে পাওয়া গেলেই ওই ভবন রহস্য উন্মোচিত হবে। যদিও প্রভাবশালী একজন নিশ্চিত করেছেন, অরুণ গুহ মজুমদার ও তার পরিবার ভারতে চলে গেছে। অথচ বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, ভারতে চলে যাওয়ার ব্যাপারে ওই পরিবারটির আত্মীয় স্বজন ও তার নিজের সম্প্রদায়-শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে কোনও তথ্য নেই!
অরুণ গুহ মজুমদার ও তার পরিবার আসলেই এখন কোথায় ? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর কি কারো জানা আছে ?
১১ আগস্টের ফেসবুক স্ট্যাটাস
ফরিদপুরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে মোকাররম মিয়া বাবু, সত্যজিৎ মুখার্জিদের অবদান কম নয়। একটি মাত্র ফু দিয়ে সেই অবদান মুছে ফেলা অসম্ভব। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য হলো, ক্ষমতার রাজনীতি হয়তো ওদের বিপথগামী করেছে। অভিযোগ করা হয়েছে, ওরা চাঁদাবাজি আর লুটপাট চালিয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে। আমি এই অভিযোগ অস্বীকার করবো না এই কারণে যে, আমি আসল সত্যটা জানি না। আমার প্রশ্নটা একটু ভিন্ন।
আমি ধরেই নিচ্ছি, মোকাররম মিয়া বাবু আর সত্যজিৎ মুখার্জিরা চাঁদাবাজ ও লুটেরা। ক্ষমতার একটি প্রভাব বলয়ের মধ্যে থেকে এবং সেই প্রভাব বলয় ব্যবহার করেই তারা দীর্ঘ ৬ বছর চাঁদাবাজি ও লুটপাট চালিয়েছে। আমার প্রশ্ন, এই প্রভাব বলয়টির যারা নিয়ন্ত্রক, তারা ৬ বছর কি করলেন ? ৬ বছরে তারা কি একটি বারও টের পাননি, মোকাররম মিয়া বাবু ও সত্যজিৎ মুখার্জিরা চাঁদাবাজ-লুটেরা ? মোকাররম মিয়া বাবু ও সত্যজিৎ মুখার্জিদের চাঁদাবাজি-লুটপাটের ভাগ কি আর কেউ পায়নি ? প্রভাব বলয়ের নিয়ন্ত্রকরা কি এতোটাই সৎ আর নির্মোহ ?
একই দিন সকালে-‘ক্ষমতার অন্তর্নিহিত অর্থ কিন্তু দায়িত্ব। দায়িত্ব তো একটি বোঝা। আর এই বোঝা যার মাথায় তার তো দাপুটে হওয়ার সুযোগ নেই। দায়িত্বের বোঝা বইতে হয় বিনয় দিয়েই। তারপরও যদি কেউ দাপুটে হন, তাহলে ধরেই নিতে হবে, তিনি ক্ষমতাবান নন, তিনি আসলে লম্পট।’
১০ আগস্টের ফেসবুক স্ট্যাটাস
যে কেউ একজন আওয়ামী লীগ করতেই পারেন। কিন্তু তাদের সকলেই আওয়ামী লীগার হতে পারেন না। আওয়ামী লীগার তারাই হতে পারেন, যাদের রক্তে আওয়ামী লীগ আছে।
একই দিন তিনি আরেকটি স্ট্যাটাস দেন যেটিতে তিনি সরাসরি এক মন্ত্রীর নাম উল্লেখ করেন। এখানে ওই মন্ত্রীর নাম থাকায় তার নামে মামলা করা হয়।
‘আমার জীবন শঙ্কা তথা মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী থাকবেন’ শিরোনামের একটি স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন- “আমি খুব স্পষ্ট করেই বলছি, নিচের ব্যক্তিবর্গ আমার জীবন শঙ্কা তথা মৃত্যুর জন্য দায়ী থাকবেন : ১. এলজিআরডি মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন এমপি, ২. রাজাকার নুলা মুসা ওরফে ড. মুসা বিন শমসের, ৩. ফাঁসির দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী বাচ্চু রাজাকার ওরফে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এবং এই তিন জনের অনুসারী-সহযোগীরা।”
রবিবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে রাজধানীর ইন্দিরা রোডের নিজ পত্রিকা কার্যালয় থেকে জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে প্রবীর সিকদারকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যায় গোয়েন্দা পুলিশ। এর পর সোমবার ভোরে সেখান থেকে তাকে ফরিদপুর থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
২০০১ সালে দৈনিক জনকণ্ঠের ফরিদপুর প্রতিনিধি থাকাকালে যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে ‘সেই রাজাকার’ শিরোনামে একটি ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এই লেখায় সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন প্রবীর সিকদার। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। হামলায় তাকে একটা পা হারাতে হয়। পরে দেশে-বিদেশে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি। এরপর তিনি কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে সাংবাদিকতা করেন। বর্তমানে তিনি নিজে একটি দৈনিক ‘বাংলা ৭১’ ও একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘উত্তরাধিকার নিউজ ডটকম’ চালাচ্ছেন।
এএইচ





