হিলি চেকপোস্ট জাতীয় নাগরিক তালিকা (এনআরসি) নিয়ে ভারতের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় স্থলবন্দরগুলো দিয়ে মানুষের আসা-যাওয়া কমে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে পাসপোর্টধারী যাত্রী পারাপার প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। বেনাপোল, আখাউড়া ও ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে এখন পর্যন্ত যাত্রী পারাপার স্বাভাবিক রয়েছে। তবে ভারত থেকে ফিরে আসা যাত্রীরা জানিয়েছেন আন্দোলন-বিক্ষোভের কারণে ভোগান্তিতে পড়ার কথা।
হিলি ইমিগ্রেশন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ সীমান্ত দিয়ে গড়ে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ জন পাসপোর্ট যাত্রী দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত করেন। বছরের এই সময়টায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধসহ ছুটিছাটা বেশি থাকায় যাত্রীর চাপ বাড়ে। তবে বর্তমানে সেই সংখ্যা কিছুটা কমে এসেছে। এখন দিনে ৩০০ থেকে ৪০০ জনের মতো পাসপোর্টযাত্রী পারাপার হচ্ছেন।
তাদের হিসাবে, গত ১ ডিসেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যান তিন হাজার ৩৮৩ জন যাত্রী। আর এসময়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে আসেন ৮০৮ জন। আর চলতি মাসের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ভারতে যান এক হাজার ৮৩২ জন, এসময়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে আসেন ৪৭ জন। যাত্রী পারাপার কমায় সরকারের রাজস্ব আয়ও কমেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পাসপোর্টধারী যাত্রীদের চলাচল কমেছে। এদিকে ভারতে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন চিকিৎসা, ব্যবসা, ভ্রমণসহ বিভিন্ন কাজে ভারতে যাওয়া যাত্রীরা।
সম্প্রতি ভারতে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাস হওয়ায় ভারতের দিল্লি, পশ্চিমবঙ্গ, আসামসহ বিভিন্ন রাজ্যে মানুষ এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু করে। বিক্ষোভ অনেক স্থানে সহিংসতায় রূপ নেয়, বিক্ষোভকারীরা অনেক স্থানে রেললাইন উপড়ে ফেলে এবং ট্রেনে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের বালুরঘাট থেকে কলকাতা, শিলিগুড়ি, মালদা ও কলকাতা থেকে চেন্নাইগামী ট্রেন চলাচল বন্ধ ও বাতিল করা হয়।
ভারত থেকে চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরা খোকন নামের এক যাত্রী বাংলা বলেন, ‘আমি ভারতের চেন্নাইতে আমার চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলাম। কিন্তু সম্প্রতি ভারতে পাস হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাস হওয়ার পরপরই বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার কারণে অনেক রুটে রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এতে করে আমাদের দেশে ফিরতে সমস্যার পড়তে হয়েছে। এ কারণে বিমানে করে বেশি ভাড়া দিয়ে কলকাতা হয়ে সেখান থেকে বাসে দেশে ফিরে এসেছি।’
ভারতে যাওয়ার উদ্দেশে রেলের টিকিট কাটা আমান ও ফারুক নামের দুই যাত্রী বলেন, ‘গত ১৮ তারিখে ব্যবসা ও চিকিৎসার জন্য ভারতের কলকাতা ও চেন্নাইতে যাওয়ার জন্য ট্রেনের টিকিট বুক করা ছিল। ১৮ তারিখে ভারতে ঢুকবো, সেই সময় জানতে পারি সেদিনের সেই ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়েছে। যার কারণে আমরা আর ভারতে যেতে পারিনি। এছাড়াও সম্প্রতি ভারতে পাস হওয়া জাতীয় নাগরিকপঞ্জি নিয়ে বিভিন্ন রাজ্যে আন্দোলন চলছে। এ কারণে ট্রেন ও বাস চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। যার কারণে অনেককে বাধ্য হয়ে বিমানে ভারতের বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসাসহ ব্যবসার কাজে যেতে হচ্ছে। কিন্তু এতে বাড়তি খরচ হওয়ার কারণে আমরা ভারতে যেতে পারছি না। আমাদের মতো অনেকেই, বিশেষ করে রেলপথে যারা চলচল করেন, তারা ভারতে যেতে সমস্যায় পড়েছেন। ভারতের বালুরঘাট থেকে হাওড়া ও গৌড় এক্সপ্রেস নামের দুটি ট্রেন যাতায়াত করে। তবে বর্তমানে শুধু গৌড় একপ্রেস ট্রেন চলাচল করছে। মাঝে মধ্যে সেটিও বন্ধ থাকছে বলে জানতে পেরেছি। আমরা নিয়মিত খোঁজখবর রাখছি, রেলপথের যোগাযোগ স্বাভাবিক হলে আমরা ভারতে প্রবেশ করবো।’
হিলি কাস্টমসের এসআই বেলায়েত হোসেন জানান, ‘আগে হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে গড়ে প্রতিদিন বাংলাদেশ-ভারতের মাঝে যাওয়া-আসা মিলে সাত-আটশ জন পাসপোর্ট যাত্রী পারাপার করতো। এখন গড়ে প্রতিদিন তিন-চারশ জনের মতো দুদেশের মধ্যে যাতায়াত করছেন।’
হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট পুলিশের এএসআই মোত্তালেব হোসেন জানান, ‘ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে আগের চেয়ে যাত্রী পারাপার কিছুটা কমেছে। তবে কী কারণে কমেছে এটি বলতে পারছি না। তবে ভারতে এনআরসির কারণে কমেছে কিনা এমন কোনও কথা কোনও পাসপোর্ট যাত্রী আমাদের জানায়নি।’
বেনাপোলে যাত্রী পারাপার
তবে ভারতে এনআরসির বড় কোনও প্রভাব পড়েনি যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরে। এই রুটে যাত্রীদের যাতায়াত স্বাভাবিক রয়েছে। ডিসেম্বরে ভারতে যাওয়া পাসপোর্টযাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে।
১৫ ডিসেম্বর থেকে ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় বেনাপোল চেকপোস্টে ভারতগামী পাসপোর্টযাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। নিরাপত্তা ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে দায়িত্বে রয়েছে পুলিশসহ কয়েকটি নিরাপত্তা বাহিনী। সকাল ৬.৩০ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৬.৩০ মিনিট পর্যন্ত বেনাপোল ইমিগ্রেশনে দীর্ঘ লাইন দেখা যায় যাত্রীদের। এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ভারত গেছেন ৪৫ হাজার ২৯৪ জন পাসপোর্টধারী যাত্রী। আর ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন ৪১ হাজার ১৫৯ জন। মোট ৮৭ হাজার ৪৫৩ জন পাসপোর্টধারী ভারত-বাংলাদেশ যাতায়াত করেছেন।
যশোর ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সেলিম রেজা জানান, ‘ভারতে এনআরসির কোনও প্রভাব সীমান্তে নেই। প্রভাব থাকলে অনুপ্রবেশ বাড়তো। বর্তমানে সীমান্তে কোনও অনুপ্রবেশ নেই। তারপরও বিজিবি সদস্যরা সর্বদা সতর্ক অবস্থায় দায়িত্ব পালন করছেন।’
আখাউড়া স্থলবন্দরে
এনআরসি নিয়ে আসাম ও ত্রিপুরায় উত্তেজনা চললেও এর প্রভাব পড়েছে আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে যাত্রী পারাপারে।
ভারতের ব্যাঙ্গালুরু থেকে ফিরে আসা হবিগঞ্জের রণক বর্মন জানান, ‘আমরা চিকিৎসার জন্যে ভারতের ব্যাঙ্গালুরু গিয়েছিলাম আগরতলা বিমানবন্দর ব্যবহার করে। যেতে সমস্যা হয়নি। তবে ফেরার পথে সেখানকার বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভের কারণে সড়ক পথে যানবাহন বন্ধ ছিল। ফলে অধিক যাত্রীর চাপ সৃষ্টি হয় বিমানবন্দরে। এ কারণে বিমানের ফেরার টিকিট আমাদের দ্বিগুণ দাম দিয়ে কিনতে হয়েছে। তবে ত্রিপুরায় কোনও সমস্যা হয়নি।’
ভোমরা দিয়ে যাত্রী পারপারে আতঙ্ক আছে
সাতক্ষীরা শহরের কাটিয়া এলাকার আসিফ রহমান খান নামে এক বাংলাদেশি পর্যটক বলনে, ‘গত সপ্তাহে পাঁচ বন্ধু ভারতে নবাব সিরাজ উদ দৌলার স্মৃতিবিজড়িত এলাকা মুর্শিদাবাদ যাওয়ার ট্রেনের টিকিট কেটেছিলাম। এনআরসি’র কারণে হাওড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভকারীরা গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় ও ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ করে। সে জন্য ট্রেন বন্ধ হয়ে যায়। আমরা মুর্শিদাবাদ যেতে পারিনি। কলকাতা থেকে ফিরে এসেছিলাম। ফেরার সময় ট্রেন বন্ধ ছিল। সে কারণে ফিরতেই বেশ ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।’
ভোমরা স্থলবন্দরের ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের বলেন, ‘আগে ব্যবসার কাজে মাসে দুই-চার বার ভারতে যেতাম। এনআরসি নিয়ে সমস্যার পর যেতে একটু ভয় লাগছে। সেজন্য আর যাওয়া হয়নি।’
এদিকে সাতক্ষীরা ভোমরা শুল্ক স্টেশন কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট শাখার সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইমাদুল হক বলেন, ‘ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে অধিকাংশ স্থানীয় লোকজন যাতায়াত করেন। তারা কেনাকাটা, ডাক্তার দেখানো এবং আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যান। এনআরসির প্রভাবে কলকাতার বাইরের যাত্রীর সংখ্যা কিছুটা কমেছে। কলকাতার ওপাশের যাত্রীর সংখ্যা খুবই কম পাওয়া যাচ্ছে।’
এএইচ





