ভূ-কম্পনের পর জেগে ওঠে প্রশাসন। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণ-তালিকা তৈরি এবং উচ্ছেদ নিয়ে আলোচনা হয়; কিন্তু কিছুদিন যেতেই সবকিছু চুপসে যায়। কারো কোনো খবরই থাকে না। নতুন করে ভূমিকম্প, দুর্যোগের পর আবার সক্রিয় হয় ‘বেহুঁশ’ প্রশাসন। কিছুদিন পর আবার চুপচাপ। চট্টগ্রামে ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবেলার কার্যক্রম এটুকুই।

কয়েক বছর ধরেই এমন কার্যক্রম চোখে পড়লেও বস্তুত এর থেকে কোনো সুফলই আসেনি। গত ১৩ এপ্রিলের ভূ-কম্পনের পরও এমন কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে। ভূমিকম্পে নগরীর বিভিন্ন এলাকার নয়টি বহুতল ভবন হেলে পড়ার পর নড়ে উঠেছে প্রশাসন। ঝুঁকি মোকাবেলায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণ, উচ্ছেদসহ নানা কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা চলছে।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক উপাচার্য ও ভূমিকম্প বিষয়ক গবেষক ড. জাহাঙ্গীর আলমকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটিও হয়েছে। ওই কমিটি ইতিমধ্যে হেলে পড়া ভবনগুলো পরিদর্শন করেছে; কিন্তু এবারও আগের কায়দায় কিছুদিন পর সবকিছু চুপসে যায় কি না তা নিয়ে সংশয় কাটছে না।

গবেষক জাহাঙ্গীর আলম বলছেন, ‘চট্টগ্রাম যে পরিমাণ ঝুঁকিতে আছে তাতে পেছনে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্টদের প্রতিদিনের রুটিন ওয়ার্কে এটা রাখা উচিত। অতীতেও দেখা গেছে ভূমিকম্পের পর তোড়জোড় করে কিছুদিন পর সব কার্যক্রম স্থগিত। আবারো এমন করলে কোনো ফল আসবে না। এটিকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা উচিত। দেড় লাখ ভবনের ঝুঁকি হ্রাসকরণ কর্মসূচি নেয়া উচিত। না হলে ভূম্পিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যাবে না।’

তিনি জানান, তার নেতৃত্বে গঠিত কমিটি আগামী রবি অথবা সোমবারের দিকে পরিদর্শনের প্রাথমিক প্রতিবেদন সিডিএ-কে হস্তান্তর করবে। প্রতিবেদনে কিছু করণীয় ও সুপারিশ উল্লেখ করা হবে। সংশ্লিষ্টরা আন্তরিক হলে পরবর্তীতে সময় নিয়ে আরো বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে ফল্ট জোনের (ভূ-তাত্ত্বিকচ্যুতি) যে অবস্থা তাতে এই অঞ্চলে যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা আছে। সাম্প্রতিক সময়ে ছোট আকারের ঘন ঘন ভূ-কম্পনও সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। আর যদি তেমন কিছু হয়, তাহলে চট্টগ্রাম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। এখানকার দুই লাখ ভবনের তিন-চতুর্থাংশই ভেঙে পড়বে। সর্বশেষ ভূমিকম্পে নয়টি ভবন হেলে পড়ার পর এ আশঙ্কা আরো জোরালো হয়ে উঠেছে। তাই ঝুঁকি মোকাবেলায় এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এএসএম মাকসুদ কামাল বলেছেন, ‘ক্ষয়ক্ষতি কমাতে চাইলে ইমারত নির্মাণ বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগ করতে হবে। ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা ও নির্মাণকৌশল সঠিকভাবে নির্ধারণ করে কাজ করতে হবে।’

২০০৯ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির (সিডিএমপি) অধীনে চালানো জরিপ বলছে, চসিক এলাকায় এক লাখ ৮২ হাজার ভবনের মধ্যে এক লাখ ৪২ হাজার ভবন ভূমিকম্পে চরম ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে ১৬২টি ছোটবড় হাসপাতাল, এক হাজার ৩৩টি বিদ্যালয়, ১২টি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, ১১টি থানা ভবনসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে।

ড. জাহাঙ্গীর আলমের গবেষণা বলছে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ফল্ট জোন (ভূ-তাত্ত্বিকচ্যুতি) বড় ভূমিকম্পের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ৮ দশমিক ৫ মাত্রার কম্পনে চট্টগ্রামের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ প্রায় দেড় লাখ ভবন ভেঙে পড়বে। বিদ্যালয় চলাকালীন ভূ-কম্পন হলে হাজারো শিক্ষক-শিক্ষার্থীর হতাহতের আশঙ্কা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, অতীতে বিভিন্ন সময়ে ভূমিকম্পের পর কিছুদিন তোড়জোড় করে এরপর সব থমকে যায়। ২০০৬ সালে নগরীর ৫৭টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের একটি তালিকা তৈরি করে পরের বছরের শেষদিকে চসিককে হস্তান্তর করে সিডিএ। রানা প্লাজা ট্রাজেডির পর এই তালিকায় আরো ছয়টি ভবন যোগ হয়। সিটি করপোরেশনের ২০০৯ সালের ইমারত নিয়ন্ত্রণ বিধি অনুসারে- নগরীতে জরাজীর্ণ ভবন অপসারণের দায়িত্ব চসিকের; কিন্তু গত এক দশকে মাত্র দুইটি ভবন অপসারণ করেছে ওই প্রতিষ্ঠান।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কাজী মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেছেন, ‘ভূমিকম্পের পর ওয়ার্ড পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তথ্য নেয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের দিয়ে যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

জেলা প্রশাসনের দায়িত্বের মধ্যেও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত। রানা প্লাজা ধসের পর জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে সিডিএ, চসিককে নিয়ে একটি কমিটিও হয়েছিলো; কিন্তু এই কমিটির কার্যক্রমও বেশিদূর এগোয়নি। বিষয়টি স্বীকার করে জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন বলেছেন, ‘ওই কমিটি ফলপ্রসূ আলোচনা কিংবা বৈঠকের আয়োজন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ১৩ এপ্রিলের ভূমিকম্পের পর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। কয়েকদিনের মধ্যে সবাইকে নিয়ে বসা হবে।’

অন্যদিকে সিডিএ-এর প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ শাহীনুল ইসলাম খান বলেছেন, ‘সিডিএ ভবন নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি করে দিয়েছে। ভবন অপসারণের দায়িত্ব চসিকের।’

এআই