শেরপুরে জেলার সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় এলাকায় ভারতীয় বন্য হাতির সঙ্গে বাংলাদেশি সীমান্তবাসীর লড়াই এখন নতুন কোনো খবর নয়। দীর্ঘদিন থেকে প্রায় বছর জুড়েই সীমান্তবাসী তাদের ফসল বাঁচাতে জীবন বাজি রেখে হাতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত এ লড়াই করে যাচ্ছে।

 তবে এবার পূর্বের মতো আবারও সীমান্তবাসীর মনে নতুন করে আশার আলো জ্বলতে শুরু করেছে। এবার হাতি তাড়াতে বা হাতির আক্রমণের হাত থেকে বাচঁতে  সোলার প্যনেলের মাধ্যমে বিশেষ ব্যবস্থায়  ‘বৈদ্যুতিক শক’ এর প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার।

ইতোপূর্বে এ বন্য হাতি তাড়াতে ওয়ার্ল্ডভিশনের হাতি বিশেষজ্ঞদের পাটের আঁশে মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে প্রতিরোধের পরামর্শ, বিগত জোট সরকারের সময় সাবেক হুইপ প্রয়াত জাহেদ আলী চৌধুরীর মৌমাছি প্রকল্প, বিগত মাহাজোট এবং বর্তমান সরকারের কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীর বেত গাছ প্রকল্প, জেলা কৃষি বিভাগের সাবেক উপ-পরিচালক প্রয়াত বানেজ আলী মিয়ার সীমান্ত এলাকায় বরই গাছ লাগানো প্রকল্প, ‘হাতি-মানুষের সহাবস্থান’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনার কোনটিই কাজে লাগেনি হাতির কবল থেকে সীমান্তবাসীকে বাঁচাতে।

সর্বশেষ গত প্রায় ৫ বছর আগে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. নাসিরুজ্জামানের সীমান্তে ‘হাতির অভয়াশ্রম’ নির্মাণের প্রাথমিক প্রস্তাবনা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও সেটিও আজ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। বরং হাতি আসছে হাতির মতই। তাদের ধ্বংসলীলা চালাচ্ছে অব্যাহতভাবে। মানুষ মারা যাচ্ছে, আহত হচ্ছে, ঘর-বাড়ি হারাচ্ছে মানুষ, সীমান্তের বিস্তৃর্ণ ফসলের মাঠ পতিত হয়ে পড়ে রয়েছে বছরের পর বছর।

সম্প্রতি সরকার কর্তৃক ঘোষিত বন্য প্রাণির আক্রমণে নিহত হলে এক লাখ টাকা, আহত ব্যক্তি ৫০ হাজার টাকা এবং ফসল ও ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্তদের ২৫ হাজার টাকা দেয়ার ঘোষণায় সন্তুষ্ট নয় সীমান্তবাসী। তারা সাহায্য বা জীবনের মূল্য নয়, চায় হাতির কবল থেকে স্থায়ীভাবে বাঁচতে।

গত এক বছর পূর্বে শেরপুরে ‘স্ট্রংদেনিং রিজওয়ানাল কো-অপারেশন ওয়াইল্ডলাইফ প্রটেকশান প্রজেক্ট’ এসআরসিবব্লিউপি) প্রকল্পের আওতায় ওয়াইল্ডলাইফ এন্ড নেচার কনজারভেশন সার্কেল এর শেরপুর জেলা সদরে বন বিভাগের দ্বিতীয় তলায় একটি নতুন অফিস উদ্বোধন করা হয়েছে। সে অফিসের কর্মক্ষেত্র যদিও এখন নির্ধারণ করা হয়নি তারপরও তাদের জরিপের কাজ চলছে। আর এ প্রকল্পের কনজারভেটর অব ফরেষ্ট (সিএফ) ও বন্যপ্রাণি বিষেজ্ঞ ড. তপন কুমার দে সম্প্রতি শেরপুরের ওই অফিস পরিদর্শনে আসেন।

এসময় তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জানান, সম্প্রতি ভারতের শিলিগুড়িতে এক ওয়ার্কসোপে গিয়ে সেখানকার হাতি-মানুষের সহাবস্থানের প্রকল্প দেখে এসেছেন। সেখানে সোলার প্যানেলের মাধ্যমে হাতি তাড়াতে বৈদ্যুতিক শকের ব্যবস্থা করেছে। সেখানে এ প্রকল্প বেশ সফল হয়েছে। এতে মানুষও মরবে না কিন্তু হাতি বৈদ্যুতিক শক খেয়ে চলে যাবে। এ প্রকল্প নিয়ে আমাদের দেশের  ময়মনসিংহ এলাকার বৃহৎ গারো পাহাড়ে বিশেষ করে হাতির আক্রমণ যে সব এলাকায় বেশী হয় সেসব এলাকায় পরীক্ষামূলক ভাবে চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এরমধ্যে শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী নালিতাবাড়ি, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলার প্রায় ১৮ কিলোমিটার হাতির বিচরণ ক্ষেত্র এবং হাতির আক্রমণের সম্ভাব্য গতিপথে ‘সোলার প্যানেল শক ’প্রকল্প করা হবে। তবে প্রাথমিকভাবে ৬ কিলোমিটার এ প্রকল্প চালু করার সম্ভাব্যতা যাচাই ও জরিপ কাজ চলছে। ইতোমধ্যে দুটি এনজিওকে এর জড়িপ কাজ দেওয়া হয়েছে। তাদের জরিপ প্রায় শেষের দিকে। খুব শিগগিরই এ প্রকল্পের প্রাথমিক ও পীরক্ষামূলক ৬ কিলোমিটারের কাজ শুরু হবে। তবে সীমান্তের কোন এলাকা থেকে শুরু হবে এখনও চিহিৃত করা হয়নি বলে তিনি জানান।

তবে সীমান্তবাসী এ প্রকল্পের ব্যাপারে কিছুই না জানলেও সীমান্তবাসীর সঙ্গে  কথা বলে জানা গেছে তারা আবারও আশায় বুক বাধছেন। যদি এ প্রকল্পের মাধ্যমে সত্যি সত্যিই হাতির হাত থেকে বাঁচা যায় তবে ভালো।

এ ব্যাপারে গজনি বিট অফিসার দ্বীন মোহাম্মদ জানান, হাতি-মানুষের সহাবস্থান এবং হাতির হাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে যে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে   ইতোমধ্যে ‘হিড্স’ এবং ‘আইসিইউএন’ নামে দুটি সংস্থা তার জরিপ কাজ এবং বেশকয়েকটি ওয়ার্কসোপ করেছে। তবে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে আমি কিছু জানি না।

এ ব্যাপারে হিড্স এর পিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর (পিআই) আব্দুল ওয়াহাব আকন্দ বলেন, আমরা জরিপের কাজ সীমান্তের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে করছি। আরো কাজ করতে হবে। তবে প্রাথমিকভাবে আমরা হাতির বিচরণ ক্ষেত্র, অবস্থান ও ক্ষয়-ক্ষতি করার কারণ সম্পর্কে ধারণা নিয়েছি। তবে পুর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পেশ করা হয়নি।

জেআই