নিরাপত্তকর্মী লিটন কয়েক দিন পরই সৌদি আরব যাওয়ার কথা ছিল। পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে সব প্রস্তুতও হয়েছিল। কিন্তু যাওয়া হলো না তার। অপহরণকারীদের হাত থেকে ফাতেমাকে বাঁচাতে গিয়ে বলি হন লিয়াকত হোসেন লিটন (৩৮)। অপহরণকারীরা তাকে গুলি করে হত্যা করে।
আর এর হত্যাকাণ্ডের কেন্দ্রে একাধিক পুরুষের প্রেমিকা ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রী ফাতেমা-তুজ-জোহরা (১৯)। দুই শিক্ষক, এক ব্যবসায়ী ও দুই সহপাঠী ছিল তার প্রেমিকের তালিকায়। শেষ পর্যন্ত অন্য প্রেমিকদের ফাঁকি দিয়ে বেছে নিয়েছিলেন একজনকে। নিজের ও পরিবারের পছন্দে ক্যামব্রিয়ান কলেজেরই শিক্ষক মাহফুজুল হকের সঙ্গে আংটি বদল হয় তার। অন্যদের কেউ কেউ বিষয়টি মানতে পারেনি। তাই অপহরণ করে নিয়ে যায় ফাতেমাকে। আর এত প্রেমিকের কবল থেকে ফাতেমাকে উদ্ধার করতে গিয়ে প্রাণ হারালো লিটন।

ফাতেমার মা নুরুন্নাহার সাইফুল অকপটে স্বীকার করলেন- মেয়ের বহুপ্রেমের কথা। তিনি বলেন, ফাতেমা ক্যাম্রবিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। কলেজে পড়ার সুবাদে ফাতেমার অনেক বন্ধু ছিল। তাদের সঙ্গে প্রায় সময় মোবাইল ফোনে কথা বলতো। শুধু কলেজের ছাত্ররাই না ফাতেমা বেশ কয়েকবার আমাকে বলেছে তার কলেজের দু’জন শিক্ষক তাকে প্রায়ই উত্ত্যক্ত করতো। এমনকি তাকে প্রেম নিবেদনও করেছে। আমার ধারণা ফাতেমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে জেনে ওই দুই শিক্ষক বিপ্লব ও আদ্রিন অথবা অন্য কেউ ফাতেমাকে অপহরণ করেছিল। রাতেই অভিযান চালিয়ে পুলিশ প্রেমিকদের একজন ব্যবসায়ী রুম্মন এবং তার দুই ভাই ও পিতাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে। অপহরনের ৭ ঘণ্টা পর ভোরের দিকে অপহরণকারীরা তাকে ছেড়ে দেয়।
তিনি জানান, বেশ কিছুদিন আগে উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরের ৪/এ নম্বর রোডের ১৯ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা মাহফুজের সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়। সপ্তাহ খানেক আগে তাদের দু’জনের আংটি বদলও হয়েছে। দুই পরিবারের সম্মতিতেই এ বিয়ে ঠিক করা হয়েছিল। হবু জামাই মাহফুজ তাদের বাসায় নিয়মিত যাতায়াত করতো। বৃহস্পতিবার ইফতারের পর মাহফুজ এসে সবাইকে বাইরে খাওয়ার জন্য নিয়ে যায়।
হবু জামাইয়ের সঙ্গে মা-মেয়ে প্রথমে রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্সে যান। সেখানে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সেরে তারা হেলভেসিয়া রেস্টুরেন্টে ডিনার করেন। রাত ১১টার দিকে তারা পায়ে হেঁটে উত্তরা চার নম্বর সেক্টরের ৩ নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাসায় ফিরছিলেন। ওই বাসার ৩/এ ফ্ল্যাটের বাসিন্দা তারা। তিন নম্বর সড়কের ৬ নম্বর বাসার সামনে আসার পরই ৪-৫ জন অপরিচিত যুবক তাদের পথরোধ করে। তারা ফাতেমাকে জোর করে গাড়িতে তুলে নেয়ার চেষ্টা করে। এসময় তিনি ও মাহফুজ মিলে ফাতেমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করলে তারা চাপাতি দিয়ে মাহফুজের হাতে আঘাত করে। এসময় তাদের চিৎকার শুনেই পাশের ৬ নম্বর বাসার দারোয়ান লিটন এগিয়ে আসেন। তিনি মাইক্রোবাস থেকে ফাতেমাকে বের করতে গেলে তারা লিটনের পেটে গুলি করে পালিয়ে যায় অপহরণকারীরা।
যেই বাসায় লিটন নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন ওই বাসার এক বাসিন্দা জানান, গুলিতে আহত হওয়ার পর লিটনকে উদ্ধার করে উত্তরার বাংলাদেশ মেডিকেল ও সেন্ট্রাল হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ কেস হওয়ায় কেউ তাকে চিকিৎসা করতে রাজি হননি। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। নিহতের শ্যালক হুমায়ূন কবীর কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, প্রায় ৩ মাস আগে তার দুলাভাই কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসেন। ঢাকায় এসে তিনি ওই বাসায় নৈশপ্রহরীর দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার সৌদি আরব যাওয়ার কথা ছিল। ভিসা ও পাসপোর্ট সব প্রস্তুত করা হয়েছিল। আমার ছোট ছোট দু’জন ভাগ্নে রয়েছে। তাদের এখন কে লালন পালন করবে? তিনি এ হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন।
নিহত লিটনের পিতার নাম নাজমুল হুদা। তার গ্রামের বাড়ি রংপুর জেলার পীরগাছা উপজেলার ইটাকুমারীর নামাপাড়া এলাকায়।
ঢাকা. ৫ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম) // জেএ





