খসড়া নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর অনুমোদন পেতে যাচ্ছে নতুন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আগামী পাঁচ বছরে (২০১৬-২০) প্রায় ৩২ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে। যার অধিকাংশই আসবে ব্যক্তি খাত থেকে। নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার আশা করছে সরকার। খবর সমকাল।

আগামীকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় নতুন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার খসড়া অনুমোদনের জন্য উঠছে। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও এনইসি চেয়ারপারসন শেখ হাসিনা। এর প্রস্তুতি হিসেবে এরই মধ্যে কয়েক দফা বৈঠক করেছে এ বিষয়ে গঠিত স্টিয়ারিং কমিটি।

জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ২০৩০ সাল নাগাদ দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তার ভিত হবে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। আগেরগুলোর তুলনায় নতুন পরিকল্পনা অনেক বাস্তবভিত্তিক। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে অর্থনীতি অন্য উচ্চতায় উন্নীত হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, দেশকে মধ্যম আয়ে নিয়ে যাওয়া, দারিদ্র্য কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নামিয়ে আনা, ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বৃত্ত ভেঙে আগামী ৫ বছরে ৮ শতাংশে উত্তরণ, কৃষি থেকে শিল্পনির্ভর অর্থনীতি, ব্যাপক কর্মসংস্থান এবং মূল্যম্ফীতি হাতের মুঠোয় ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে বাস্তবায়ন করা হবে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ব্যয় হবে ৩১ লাখ ৯০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, যা ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার দ্বিগুণ। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ধরা হয়েছে ২৮ লাখ ৪৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ৩ লাখ ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়নের মূল দায়িত্ব পালন করছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। এ বিষয়ে জিইডির সদস্য ড. শামসুল আলম সমকালকে বলেন, পরিকল্পনার বছর শেষে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন করতে হলে আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয় করতে হবে। তিনি বলেন, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর, কৃষিভিত্তিক শিল্পসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের উন্নয়নসহ ছয়টি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করা হয়েছে।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি :বাস্তবায়ন শুরুর অর্থবছর ২০১৬তে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য হচ্ছে সাত শতাংশ। পরের অর্থবছরে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১৮ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২০১৯ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ এবং পরিকল্পনার শেষ বছর ২০২০ অর্থবছরে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রবৃদ্ধির এ লক্ষ্য পূরণে শিল্প খাতে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের কৌশল নেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় শিল্প (ম্যানুফেকচারিং) খাতে গড় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। সেবা খাতে গড় প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। পাঁচ বছরে কৃষি খাতে গড় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। শিল্প, সেবা এবং কৃষি_ এই তিন খাত মিলে আগামী পাঁচ বছরে গড় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে সাত শতাংশের ওপরে।

মূল্যস্ফীতি :গড় মূল্যস্টম্ফীতি বর্তমানের ৬ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২০২০ সালে ৫ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মোট বিনিয়োগ বর্তমানে জিডিপির ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে আগামী পাঁচ বছরে জিডিপি ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশে নিয়ে যাওয়া হবে। জাতীয় সঞ্চয় বর্তমানে জিডিপির ২৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে। ২০২০ সালের লক্ষ্য ৩২ দশমিক ১ শতাংশে নিয়ে যাওয়া। আগামী পাঁচ বছরে দেশি-বিদেশি মিলে নতুন ১ কোটি ৩২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

অগ্রাধিকার খাত :পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার পাচ্ছে কারিগরি ও প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন মানবসম্পদ গঠন, বিদ্যুৎ উন্নয়ন, জ্বালানি ও যোগাযোগ খাতে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূরীকরণের মতো বিষয়। কৃষিভিত্তিক শিল্পসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের উন্নয়ন কৌশল নির্ধারণ, আইসিটি-স্বাস্থ্য-শিক্ষা সংক্রান্ত সেবা রফতানিতে সুনির্দিষ্ট নীতিকৌশল প্রণয়ন, সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগে গতিশীলতা আনা এবং রফতানির গতিশীলতা আনতে পণ্যের বৈচিত্র্য আনার ওপরও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

মেগা প্রকল্প :এ পরিকল্পনায় প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতের কয়েকটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে। এর মধ্যে রয়েছে_ পদ্মা সেতু, গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপন, মেট্রোরেল, এলএনজি টার্মিনাল এবং পায়রাবন্দর নির্মাণ প্রকল্প। বর্তমানে এসব প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন তদারকি করছে ফাস্ট ট্র্যাক মনিটরিং কমিটি।

এআই