ঘটা করে এবার মিডিয়ার সামনে দক্ষিণ সিটি কপোরেশনের প্রশাসক বলেছিলেন ঈদ-উল আজহার কোরবানীর বর্জ্য ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরিয়ে ফেলবে ডিসিসি। একই কথা বলেছিলেন উত্তরের সিটি কর্পোরেশন প্রশাসকও। কিন্তু কেউ কথা রাখেন নি।
শুক্রবার ঈদের পঞ্চম দিন। তবুও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে কোরবানির পশুর বর্জ্য সরাতে পারেনি ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন।
সোমবার সকালে দেশজুড়ে ঈদের নামাজের পর ইসলাম ধর্মের অনুশাসন অনুযায়ী পশু জবাই করে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। নিয়ম অনুযায়ী, ঈদ দিনসহ পরবর্তী দেড় দিন পশু কোরবানি করা যায়।
এবারের কোরবানীর ঈদ উপলক্ষ্যে ঈদের দিন দুপুর ২টা থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রাজধানী থেকে পশুর বর্জ্য সরানোর ঘোষণা দিয়েছিল ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন।
সেই লক্ষ্য নিয়ে রাজধানীকে বর্জ্যমুক্ত করতে ঈদের সকাল থেকেই প্রায় ১৩ হাজার কর্মী ময়লার গাড়ি ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে মাঠে নামে।
কিন্তু ৪৮ ঘন্টা তো নয়ই ১০০ ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত দুই সিটি করপোরেশন এলাকার বিভিন্ন স্থানে ময়লার স্তূপ পড়ে থাকতে দেখা যায়। আর গলিগলি জুড়ে কোরবানীর বর্জ্যের দুর্গন্ধ্য।
বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে এখনো অনেক এলাকায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ময়লা সরানোর কাজ করছেন। আবার কোথাও সড়কের পাশে পড়ে থাকা স্তূপ করা পশুর বর্জ্যের উৎকট গন্ধ ছড়াচ্ছে।
সিটি কর্পোরেশনের ঘোষিত সময়সীমা শেষে শুক্রবার বিকেলেও ডিসিসি উত্তরের অধীনে থাকা মহাখালী, মিরপুর, বনানী, কাকলী ও উত্তরার বিভিন্ন স্থানে কোরবানী পশুর বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা যায়। সেখানে ময়লার স্তূপে কুকুর-বিড়ালের যুদ্ধ যেমন তেমনী আশপাশের মানুষ ও পথচারীদের নাক চেপে দম বন্ধ করে চলাচল করছেন।
মিরপুর, কল্যাণপুর, শ্যামলি ও মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি মাঠসংলগ্ন এলাকায় গিয়ে জমে থাকা কোরবানির পশুর বর্জ্যের উৎকট গন্ধ টের পাওয়া যায়। নাকচাপা দিয়ে চলাচল করতে দেখা যায়।
মিরপুর ১৩ নম্বর সেকশেনের গলির মোড়গুলোতে ছোট ছোট বর্জ্যের ঢিবি দেখা যায়। উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরে ময়লার সরানোর কাজ চলছিল ঢিমে তালে। কাকলী ও উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের পরিত্যক্ত পশুর হাটের ব্যবহৃত বাঁশ এখনো সরানো হয়নি।
অপরদিকে বাংলামোটরের মতো জায়গাতেও গলির ভিতরে, ইস্কাটন রোডের উপর ময়লা ঢিবি পড়ে থাকলেও সরানোর বন্দোবস্ত করা হয়নি।
শুক্রবার সকালেও ডিসিসি দক্ষিণের আওতাধীন এলাকা ঘুরে দেখা যায় অপরিচ্ছন্ন চিত্র। এই এলাকাগুলোর বড় রাস্তা ছাড়িয়ে সরু গলির ভেতরে দায়সারা কাজের চিহ্ন চোখে পড়ে। মিটফোর্ড, জিন্দাবাহার, জনসন রোড, বাংলাবাজার, পাটুয়াটুলী, সদরঘাট, জুরাইন, গেন্ডারিয়া, ধোলাইখাল ও সূত্রাপুর এলাকায় গিয়ে এসব দৃশ্য চোখে পড়ে।
জিন্দাবাহার লেনের সরু গলির ভেতর দেখা গেল বস্তাবন্দি পশুর বর্জ্য। একটু দূরে মিশনারিজ অব চ্যারিটির সামনের রাস্তায় পড়ে ছিল চাপ চাপ রক্ত; কাছের খোলা ম্যানহোল থেকে আসছিল বর্জ্যের দুর্গন্ধ।
২৮ জিন্দাবাহার লেনের মরো সেমিনারির সামনের ডাস্টবিনে দেখা মিলল জমে থাকা বর্জ্য আর কোরবানিতে ব্যবহৃত চাটাইয়ের। রাস্তার পাশে জমিয়ে রাখা বর্জ্যের স্তূপ কোরবানির ৩ দিন পরও পড়ে থাকতে দেখা যায়।
তবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, হিসেব অনুযায়ী রাজধানীতে কোরবানির সময়ে কম-বেশি ৪৪ হাজার টন পশুর বর্জ্য জমে। ঈদের কোরবানী শুরু হওয়ার সাথে সাথে ময়লার গাড়ি ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে মাঠে নেমে পড়ে প্রায় ১৩ হাজার কর্মী।
দুর্গন্ধ ছড়ানোর মাত্রা কমিয়ে আনতে এ বছরও সিটি কর্পোরেশন থেকে বিশেষ ধরনের পলিব্যাগ ও ব্লিচিং পাউডার সরবরাহ করে।
সিটি কর্পোরেশনের কর্মীরা ময়লার গাড়ি ও জীবানুনাশক নিয়ে এলাকায় এলাকায় ঘুরে বর্জ্য সংগ্রহ করে পাঠায় ডাম্পিং স্টেশনে। এমনকি পশুর বর্জ্য যত্রতত্র না ফেলতে ঈদের আগে দুদিন মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ।
রাজধানীকে বর্জ্যমুক্ত করতে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। তবুও কেন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ময়লা সরানো গেলো না সেব্যাপারে সিটি কর্পোরেশন দুটির যুক্তি, ঈদের পর দিনও বিভিন্ন স্থানে কোরবানী হয়েছে সেসব ময়লা অবশেষে সরানো করা সম্ভব হয় নি।
ঈদ পরবর্তী পরিচ্ছন্নতা অভিযানের ব্যাপারে ডিসিসি দক্ষিণের প্রশাসক মোহাম্মদ ইব্রাহিম হোসেন খান এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি মোবাইলফোনের কল রিসিভ করেন নি।
অপরদিকে ডিসিসি উত্তরের প্রশাসক মো. ফারুক জলিল বলেন, আমাদের জানা মতে কোথায় বর্জ্য নেই। উত্তরের সব ওয়ার্ডের ময়লা উঠিয়ে আনা হয়েছে। তবে কেউ যদি পরে রাস্তায় ময়লা ও কোরবানীর বর্জ্য রেখে আসে তা তো নগরবাসীর দায়-দায়িত্ব। আমরা আর কি করতে পারি?
তবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আব্দুর রহমান টাইমনিউজবিডিকে বলেন, ঈদের পর দিন মঙ্গলবারও পুরান ঢাকাসহ রাজধানীর বেশ কয়েকটি স্থানে কয়েক শ’ গরু জবাই করে। এমনকি পর দিন সকালেও অনেকে কোরবানি দিয়েছে। তাই সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সারাক্ষণই বর্জ্য সরাতে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে।
আব্দুর রহমান আরও বলেন, আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি ঘোষিত সময়ের মধ্যে বর্জ্য সরিয়ে নেয়ার। তবে নতুন করে কোরবানি হওয়ায় নতুন বর্জ্য জমেছে। হয়তো এসব নতুন কোরবানীর বর্জ্য জমে রয়েছে। এসব বর্জ্য সরানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
জেইউ





