সবুজ পাহাড় জুড়ে গড়ে উঠেছে পামওয়েল বাগান। মানিকছড়ির নয়ানাভিরাম এলাকাজুড়ে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে‘ফাহিম গার্ডেন’ তৈরি করেছেন আইয়ূব কামাল। তিনি খেয়ে না খেয়ে সেখানে বিশাল এলাকা জুড়ে লাগিয়েছেন পামওয়েল গাছ। কিন্তু এ গাছ যে একদিন তাকে স্বাবলম্বী না করে কাঁদাবে সেটা তিনি কল্পনাও করেননি। কেউ সেটা মনেও করেনি।

বাগানে গাছ হয়েছে, ফল হয়েছে কিন্তু সে ফল থেকে কিভাবে তেল তৈরি হবে সে পদ্ধতি কারো জানা নেই। তাই এখন পুঁজি খাটিয়ে ও শ্রম দিয়ে গড়া বাগান কেটে সাবার করে দিতে হচ্ছে। শুধু কামাল নন, হাজারো কৃষক অনেক আশা নিয়ে গড়ে তোলা পামওয়েল বাগান নিয়ে বিপকে পড়েছেন। পামওয়েল গাছ রোপন করতে আগে সবাই প্রতিযোগিতায় নামলেও এখন উল্টো গাছ কাটতে শুরু করেছেন বাগান মালিকরা।

সরজমিন ঘুরে জানা গেছে, পাহাড়ের সবুজ অরণ্য ভেদ করে এ অঞ্চলের কৃষকরা স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে পুঁজি বিনিয়োগ করেছিলেন পামওয়েল বাগানে। গড়ে তুলেছেন শত শত একর দৃষ্টিনন্দন পামওয়েল বাগান। খেয়ে না খেয়ে সময়ে-অসময়ে এসব বাগানে সেচ-পরিচর্যা করতে বিন্দুমাত্র অবহেলা করেননি কেউ।

মানিকছড়ির দক্ষিণ একসত্যাপাড়াস্থ গ্রামে চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আইয়ুব কামাল ২০ একর পাহাড়ে ২০১০ সালে গড়ে তুলেছেন পামওয়েল বাগান ‘ফাহিম গার্ডেন’। এ রকম শত শত বাগান গড়ে উঠেছে খাগড়াছড়ির বিভিন্ন পাহাড়ে। কারণ মালেশিয়ার অর্থনৈতিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে এ পামওয়েল। সেখানে এ গাছের ফল থেকে তৈরি হচ্ছে পামওয়েল (তৈল)। এ পামওয়েল বিক্রি করে তাঁরা অর্জন করেছে কোটি কোটি বৈদেশিক মুদ্রা। তাই এদেশে পামওয়েলের চাষ করার পক্ষে মত দিয়েছিলেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে পাহাড়ের আনাচে-কানাচের কৃষক ও বাগান মালিকরা হুমরি খেয়ে পড়েছিলেন পামওয়েল চাষে। ব্যাপক সফলও হয়েছেন বাগান সৃজনে। কিন্তু তারা কি জানতেন এ বাগান তাদেরকে স্বাবলম্বী না করে অঝোরে কাঁদাবে!

উপজেলার সদর, বাটনাতলী, ডাইনছড়ি, হাতিমুড়া, গবামারা, তিনটহরী, কুমারী, যোগ্যাছোলা, কালাপানি, চেঙ্গুছড়া, একসত্যাপাড়া, লেমুয়া, রাঙ্গাপানি,গচ্ছাবিল এবং জেলার সর্বত্রই পামওয়েলের বাম্পার চাষ হয়েছে। কিন্তু সর্বত্রই এখন কৃষকের হাহাকার। এখন তাদের পাশে কেউ নেই।

গত ৬ এপ্রিল উপজেলার দক্ষিণ একসত্যাপাড়াস্থ আইয়ুব কামালের বাগানে গিয়ে দেখা গেছে, বুকভরা আশা নিয়ে গড়ে তোলা ফাহিম গার্ডেনের পামওয়েল বৃক্ষগুলো কেটে ফেলা হয়েছে। জানতে চাইলে ম্যানেজার আবুল কাশেম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলেন, আমার মালিক পামওয়েল চাষে অনেক অর্থ ব্যয় করেছেন। কিন্তু গাছ বড় হওয়ার পর সবার মতো তিনিও এ পামওয়েল বাগান নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। তাই এখন গাছ কেটে সাবার করে দিয়েছি এবং সেখানে আম্রপালি আম ও লিচু গাছ লাগিয়েছি। বাগানের যে দিকে চোখ যায় শুধু আম আর লিচুর সারি সারি গাছ।

সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও যোগ্যাছোলা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এম কে আজাদ বলেন, অনেক আশা নিয়ে মালেশিয়ার সোনালী ফসল পামওয়েল চাষ করেছি। গাছে প্রচুর ফল এসেছে কিন্তু ফলগুলো থেকে তেল তৈরির পদ্ধতি কারো জানা নেই। ফলে এখন গাছগুলো শুধু বাড়ির আঙ্গিনা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে শোভাবর্ধণে। গাছের ফল ছিঁড়ে ছেলে-মেয়েরা খেলা করছে।

এ প্রসঙ্গে কথা হলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, ২০০০ সালের পর এ অঞ্চলের কৃষকরা পামওয়েলের চাষ শুরু করলেও কৃষিবিভাগ কাউকে এ বিষয়ে উৎসাহ কিংবা নিরুৎসাহিত করেনি। কারণ পামওয়েল গাছ থেকে তেল তৈরির প্রক্রিয়া বাংলাদেশে এখনো গড়ে উঠেনি। ফলে এখন কৃষকরা পামওয়েল গাছ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। পামওয়েল গাছ শুধু বাড়ি ও বাগানের শোভাবর্ধণ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

জেআই