শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সরেজমিনে উত্তরা দিয়াবাড়ী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, উত্তরা উত্তর মেট্রো স্টেশন থেকে সেন্টার স্টেশন পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে এখনো বর্জ্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। কোথাও কোথাও আবার সেগুলো স্তূপ করে রাখা হয়েছে। তবে উত্তরা দক্ষিণ স্টেশন থেকে উত্তরা উত্তর স্টেশন পর্যন্ত অংশ পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা পরিষ্কার করেছেন। সেন্টার স্টেশন থেকে উত্তরা উত্তর মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত চলছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ। তবে এই সড়কটি ছাড়া উত্তরা দিয়াবাড়ী ও এর আশপাশের অন্যান্য সড়ক পশুর মূত্র ও বিষ্ঠায় একাকার হয়ে আছে। নাকে হাত না দিয়ে সেখান দিয়ে চলাচল করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ এলাকার নিয়মিত পথচারী এবং উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা তমাল ফরায়েজি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ঈদের পর তিন দিন পার হয়ে গেল, কিন্তু এখনো এই রাস্তা দিয়ে হাঁটা যায় না। খড় আর গোবরের গন্ধে মনে হচ্ছে এখনো হাট চলছে। মেট্রোতে আসার সময় দম বন্ধ হয়ে আসে।”
আরেক পথচারী ব্যবসায়ী জহির মিয়া বলেন, “শহরের মাঝখানে এমন অবস্থা কাম্য নয়। সিটি করপোরেশন বলছে দ্রুত সব পরিষ্কার করা হবে, কিন্তু ধুলো আর দুর্গন্ধের কারণে এই রাস্তায় যাতায়াত আমাদের জন্য এখন চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
দুপুরের দিকে রাজধানীর প্রধান ও স্থায়ী পশুর হাট গাবতলীতে গিয়ে দেখা যায়, এর আশপাশের সড়কের চিত্র কিছুটা পাল্টেছে। যদিও গাবতলীর প্রধান সড়কগুলো থেকে বর্জ্য সরিয়ে ফেলা হয়েছে, তবু সড়কের ওপর হলদে ও কালচে দাগ রয়ে গেছে। আটকে আছে খড়কুটোও, যা থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। স্থানীয়দের ধারণা, পর্যাপ্ত পানি বা ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার না করায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
গাবতলী হাটের এক পাশে এখনো কিছু অবিক্রিত পশু দেখা গেছে। হাটে বাঁশ অপসারণের কাজে নিয়োজিত এক শ্রমিক জানান, তারা সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন। তবে মূল হাটের ভেতরে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ওই কর্মী বলেন, “সকাল থেকে আমি একাই ৯২টি বাঁশ তুলেছি। আমার মতো আরও কয়েকজন লোক বাঁশ তোলার কাজ করছে। এরপর প্যান্ডেলগুলো খুলতে হবে। তারপর শুরু হবে হাট পরিষ্কারের কাজ। পুরো হাটের বর্জ্য পরিষ্কার করতে অনেক সময় লাগবে। অন্তত এক সপ্তাহ লাগবে।”
এদিকে গাবতলী মোড় দিয়ে যাতায়াতকারী যাত্রী করিম মজুমদার বলেন, “এখন রিকশায় উঠব। দেখতেই তো পাচ্ছেন, টুপি মাথা থেকে খুলে নাকে ধরেছি। সড়কের বর্জ্য পরিষ্কারের নামে শুধু ওপর থেকে সরানো হয়েছে, কিন্তু রাস্তার গায়ে যে ময়লা লেগে আছে, তা থেকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ আসছে।”
ডিএনসিসির আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান আমার দেশকে জানান, সড়ক পরিষ্কারের কাজ ভোর ৬টা থেকেই শুরু হয়েছে। তবে হাটের মূল অংশ পরিষ্কারে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে হাটের অবকাঠামো বা প্যান্ডেলের বাঁশ-খুঁটি।
তিনি বলেন, “হাটের ইজারাদার প্রতিষ্ঠান তাদের বাঁশ, খুঁটি ও অন্যান্য সামগ্রী সরিয়ে না নিলে আমাদের পক্ষে ভেতরের অংশ পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। সাধারণত এগুলো সরাতে তাদের তিন থেকে চার দিন সময় দিতে হয়। এরপরই আমরা সম্পূর্ণ হাট পরিষ্কার করব।”
মাঠপর্যায়ে কর্মরত শ্রমিকদের কথাতেও এই দীর্ঘসূত্রতার আভাস পাওয়া গেছে। গাবতলী হাটের শ্রমিকরা জানিয়েছেন, প্যান্ডেলের কয়েক হাজার বাঁশ খুলতে অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগবে।
এক শ্রমিক বলেন, “এসব বাঁশ সরানো সময়ের ব্যাপার। আমরা তো অল্প কয়েকজন কাজ করছি, লোকও বেশি না। লোক না বাড়ালে আরও কয়েকদিন দেরি হবে।”
আমার দেশ-এর সঙ্গে কথা বলা ওই শ্রমিকের মধ্যে এক ধরনের অজানা আতঙ্কও লক্ষ্য করা গেছে। প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বারবার নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি প্রথমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে গাফিলতির কথা বললেও পরে প্রতিবেদকের পরিচয় জানার পর সুর পাল্টে ফেলেন।
তিনি বলেন, “আপনারা তো সাংবাদিক মানুষ, আপনারা বেঁচে যাবেন; পরে আমি উল্টাপাল্টা কিছু বললে আমারই সমস্যা হবে। তবে এটা নামে পরিষ্কার হয়েছে, কাজের কাজ কিছু হয়নি। এই রাস্তা দিয়ে একটা গাড়ি জোরে ব্রেক করলে ঠিকমতো ব্রেক করবে?”
সরেজমিনে দেখা যায়, বর্জ্য অপসারণের ধীরগতির মধ্যেই উত্তরা সেন্টার মেট্রো স্টেশনের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রিন জোনে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো হচ্ছে। বিষয়টিকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন তমাল ফরায়েজি।
তিনি বলেন, “যেসব গাছ নষ্ট হয়েছে বা যেখানে গাছ ছিল না, সেখানে নতুন করে গাছ লাগানো হচ্ছে। এটা বেশ ভালো উদ্যোগ এবং প্রশংসার দাবি রাখে।”
এ বিষয়ে জিয়াউর রহমান বলেন, “হাট বসার কারণে মেট্রো স্টেশনের নিচের যে সবুজ এলাকা বা গ্রিন জোন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেখানে নতুন করে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হাট চলাকালীন কিছু গাছ নষ্ট হয়েছে। আমরা সেগুলো সংস্কার করছি এবং নতুন করে গাছ লাগিয়ে দিচ্ছি।”
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধু গাছ লাগানো বা প্রধান সড়ক পরিষ্কার করাই যথেষ্ট নয়। হাটের ভেতরের ময়লা দ্রুত অপসারণ করে জীবাণুনাশক ছিটিয়ে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
তুরাগের বাসিন্দা আশফাক শুভ্র বলেন, “যদি জীবাণুনাশক ছিটানো না হয়, তাহলে বৃষ্টির পানিতে এই বর্জ্য মিশে রোগবালাই ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়াবে। একই সঙ্গে ড্রেনেজ ব্যবস্থাতেও সমস্যা তৈরি করবে।”
জীবাণুনাশক ছিটানোর বিষয়ে জিয়াউর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
এর আগে ডিএনসিসির কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান মেট্রোরেল (এমআরটি) কর্তৃপক্ষের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেন, মেট্রো স্টেশনের নিচের অংশ এখনো সিটি করপোরেশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। তবুও জনস্বার্থে তারা সেখানে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, “জাতীয় সম্পদের নিরাপত্তার দায়িত্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিজস্ব পুলিশ রয়েছে। কিন্তু মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ কী করেছে? বৃষ্টির সময় বা যখন খামারিরা পশু নিয়ে মেট্রোরেলের সীমানায় এসেছে, তখন তাদের কাউকে দেখা যায়নি। তারা শুধু চিঠি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছে।”
এস