মচমচে ভাজা মুড়ি সবারই প্রিয়। রমজানে এর কদর আরও অনেক বেশি। ইফতারীতে মুড়ি যেন অপরিহার্য। রমজানে এর চাহিদা আরও অনেক বেশি। তাই রমজানকে সামনে রেখে গাইবান্ধার মুড়ির গ্রামে চলছে মুড়ি তৈরির ধুম।
তবে জেলায় মুড়ি উৎপাদনের গ্রাম নামে পরিচিত রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের গোপালপুর বৈরাগীপাড়া গ্রামে এখন ব্যস্ততা। গোটা গ্রামটাই বলতে গেলে মুড়ি তৈরির কাজে ঝুঁকে পড়েছে। মুড়ি উৎপাদন বেশি হলেও সঠিক দাম না পাওয়ায় হতাশায় মুড়ির গ্রামের মানুষগুলো। তাদের কষ্টের শেষ কোথায়! ধান, খড়ি ও লবণের দাম বেশি হওয়ায় খরচ মিটিয়ে তাদের তেমন কোন আয় হয় না। তারপরেও বাপ-দাদার আমলের এ পেশাকে আঁকড়ে ধরে আছে তারা।
বাজারে অবশ্য মেশিনে তৈরি মুড়ির আগ্রাসন শুরু হয়েছে। সুদৃশ্য প্যাকেটে ভর্তি সাদা মুড়ি দৃষ্টি আকর্ষণ করে ক্রেতাদের। কিন্তু তারপরও খোঁজ পড়ে দেশী-মুড়ি? মেশিনের মুড়ির চেয়ে হাতে তৈরি মুড়ির দাম কিছুটা বেশি হলেও এর চাহিদা এখনও বেশি। কারণ এর স্বাদই আলাদা।
রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামটিতে মূলতঃ হিন্দু সম্প্রদায়ের বৈষ্ণব অনুসারীদেরই বাস। তাই ওই পাড়ার নাম হয়েছে বৈরাগীরপাড়া। আর এই বৈরাগী পাড়ার লোকজনই মুড়ি তৈরীর কাজে জড়িত বলে গ্রামটির নাম হয়েছে মুড়ির গ্রাম। আশে পাশের মানুষ এ নামেই গ্রামটিকে চেনে।
এ গ্রামের প্রায় অর্ধশত পরিবার এ ব্যবসার সাথে জড়িত। রমজান মাসে এর সংখ্যা আরও বাড়ে। বাড়তি আয়ের আশায় অনেকেই মুড়ি ভাজার ব্যবসার দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
ওই গ্রামের মুড়ি উৎপাদনকারী পরিবারের সদস্য সুশীল চন্দ্র মহন্ত জানান, সারা বছরই মুড়ির চাহিদা থাকে। তবে রমজান এবং শীতকালে মুড়ির চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। তিনি বলেন, বৈরাগীপাড়ার বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের লোকজনই মূলতঃ এ ব্যবসার সাথে জড়িত। তবে কিছু মুসলিম পরিবারও এ ব্যবসার সাথে জড়িত হয়েছে। তাদের সবাই প্রায় মুড়ি তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে। কিন্তু মুড়ির ব্যবসায় টিকে থাকা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। এ ব্যবসায় আয় কম। কিন্তু সংসারে খরচ অনেক বেশি। তাই পুঁজি হারিয়ে অনেকেই ইতিমধ্যে দেউলিয়া হয়ে পড়েছে। একেক জন ২/৩ টি এনজিও’র কাছ থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করতে না পেরে দেনার দায়ে এখন জর্জরিত।
তিনি আরও বলেন, ১-২ বিঘা জমি আছে তাদের মধ্যে এমন পরিবারের সংখ্যা নেই বললেই চলে। বেশির ভাগই ভিটে-বাড়ি সম্বল। আবার কেউ কেউ অন্যের বাড়িতে ঘর তুলে বসবাস করছে। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া চলে অনেক কষ্টে। ঠিকভাবে পোশাকও দিতে পারে না অনেকে। মোটকথা কেউ তারা ভাল নেই। এ অবস্থায় অনেকে অন্য পেশায় চলে গেছে। সংসারের ব্যয় মিটাতে স্বামীদের কেউ রিকশা চালাচ্ছে কেউবা শ্রম বিক্রি করছে। আবার কেউ গাইবান্ধা শহরে গিয়ে দিন মজুরির কাজ করে।
এখন মহিলারাই এ পেশায় সাথে জড়িত। ছেলে-মেয়েরা তাদের সহযোগিতা করে। আর ধান কেনা, খড়ি সংগ্রহ করে আনা এবং মুড়ি বাজারজাতের বিষয়টি পুরুষরাই করে থাকে। তারা মুড়ি বস্তায় ভরে গাইবান্ধা শহরে নিয়ে গিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে বা পাড়ায় পাড়ায় ফেরি করে বিক্রি করে থাকে।
বৈরাগীপাড়ার আরতি রাণী, সুধা রাণী, সন্ধ্যা রাণী, মিনতি রাণী, রাণী বালা, সাবিত্রী, ফুতি রাণীসহ অনেকেই জানালেন, মুড়ি ভেজে তেমন আর আয় হয় না। ধানের দাম এখন অনেক কম থাকলেও এ দাম কিছুদিনের মধ্যে বেড়ে যাবে। খড়ির দাম অনেক। এছাড়া প্যাকেট লবণের দামও বেড়েছে। এসব খরচ মিটিয়ে যে আয় আসে তাতে পরিশ্রমের টাকাই ওঠে না। কিন্তু বাপ-দাদার আমলে এ পেশা তারা ছেড়ে দিতেও পারছে না।
সন্ধ্যা রাণী নামে অপর মুড়ির কারিগর জানান, এক মণ ধানের মুড়ি তৈরি করতে খড়ি, লবণ এবং মিলে ধান ভানাসহ খরচ পড়ে ১১২ টাকা। আর ধানের দাম এখন ৬০০ টাকা। এতে মুড়ি হয় ২২ কেজি। পাইকারি বিক্রি করে প্রতি কেজি মুড়ির মূল্য পাওয়া যায় ৪০ টাকা থেকে ৪৫ টাকা। এতে আয় আসে ৮৮০ টাকা থেকে ৯৪০ টাকা। অপরদিকে মোট ব্যয় হয় ৭১২ টাকা থেকে ৭২০ টাকা। এর ফলে মুনাফা তেমন টেকে না। আর এক মণ ধানের মুড়ি তৈরি করতে সময় লেগে যায় ৮ থেকে ৯ ঘন্টা। তবে খুচরা বিক্রি করলে প্রায় ৫০ টাকা পর্যন্ত দর পাওয়া যায়। কিন্তু তার সুযোগ কম। কারণ ঘাড়ের উপর পাইকার বসে থাকে। বেশির ভাগ সময় তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ধান কিনতে হয় মহানজনদের কাছ থেকে। ফলে ব্যাপারীদের কম দামে মুড়ি না দিয়ে উপায় থাকে না।
বৈরাগীপাড়ায় মধ্য স্বত্বভোগী বেশ কয়েকজন পাইকার গড়ে উঠেছে। তাদের মধ্যে মনি মিয়া, সাদেক মিয়া, মংলু মিয়া অন্যতম। রমজান মাসসহ শীতকালে যখন মুড়ির চাহিদা বাড়ে, তখন এসব পাইকারদের মুড়ির কারিগরদের আগাম লগ্নি দিতে দেখা দেয়। শর্ত থাকে নির্ধারিত দরে তাকে মুড়ি দিতে হবে। ধানের দাম বাড়লে মুড়ির দামও বাড়ে। কিন্তু ঘুরে ফিরে আয় একই থাকে।
মুড়ির পাইকার মনি মিয়া বলেন, হাতে তৈরি মুড়িতে লবণ থাকে বলে এর চাহিদা কিছুটা বেশি। মেশিনে তৈরীতে মুড়িতে লবন থাকে না। তাই ওর স্বাদ কিছুটা কম। এ কারণে ওর চাহিদাও কিছুটা কম। তাই হাতে তৈরি মুড়ি বিক্রি করে তারা কিছুটা আয় রোজগার করতে পারেন।
বর্তমানে গাইবান্ধায় মেশিন ভিত্তিক ৩টি মুড়ির কারখানা গড়ে উঠেছে। তারা মুড়ি প্যাকেট জাত করে শুধু গাইবান্ধায় নয়, আশেপাশের জেলাতেও সরবরাহ করে। মেশিনে তৈরির মুড়ির দাম কম থাকার কারণে তাদের সাথে প্রতিযোগিতা করেই মুড়ির কারিগরদের এখন টিকে থাকতে হচ্ছে। বিসিক ও অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মুড়ি তৈরীর এসব ক্ষুদ্র উদ্যোগক্তাদের জন্য কোন ঋণ সহায়তা দেয় না। ফলে মুড়ির কারিগরদের সারাবছরই পুঁজির সংকট থেকে যায়।
সুভাস চন্দ্র মহন্ত নামে এক মুড়ি উৎপাদনকারি জানান, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন খরচ কমানো যেতে পারে। কিন্তু এ ব্যাপারে কেউ তাদের সহায়তা করতে এগিয়ে আসে না। ফলে আমাদের এ ব্যবসার সমস্যা কিছুতেই কাটছে না।
রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম জানান, বিভিন্ন সময়ে বিসিকের কাছে এসব মুড়ির কারিগরদের জন্য ক্ষুদ্র ঋণ সহায়তা দেয়ার আবেদন জানিয়েছি। কিন্তু তারা আশ্বাস দিলেও কোন ব্যবস্থা নেয়নি।
জেডআই





