মেহেরপুরের গাংনীতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবির) অভিযানে আব্দুল্লাহ (৩৫) নামে এক যুবক অস্ত্রসহ গ্রেফতার হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছে এলাকার ভুক্তভোগীরা।

তারা অভিযোগ করে বলেন, কখনও ডিবি পুলিশের সোর্স, কখনও এডিশনাল এসপির পিএস পরিচয় দিয়ে এলাকায় বেপরোয়া চাঁদাবাজি করতো আব্দুল্লাহ। সে সাধারণ মানুষকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি, হুমকি ভয়ভীতি দেখিয়ে ও ব্লাকমেইল করে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার দৌরাত্ম থেকে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা রেহায় পাননি ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা।

অভিযুক্ত আব্দুল্লাহ মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বাঁশবাড়িয়া গ্রামের কলোনী পাড়ার মৃত ফিতাজুল হোসেনের ছেলে। ২৩ জুলাই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কলোনী পাড়ায় তার নিজ বাড়িতে অভিযান চালিয়ে একটি ওয়ান সুটারগান সহ তাকে আটক করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে গাংনী থানায় অস্ত্র আইনে একটি মামলা হয়েছে।  মামলা নং- ৩০/২৩-০৭-২০১৭।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুলিশের কথিত এ সোর্সের দাপটে এলাকার নিরীহ জনগণ দীর্ঘদিন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল। থানার দালালি ও মিথ্যা মামলা দিয়ে সহজ সরল মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়ায় তার একমাত্র পেশা। সে এলাকার সাধারণ মানুষকে পুলিশের ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন ভাবে স্বার্থ হাসিল করতো বলে অভিযোগ। কখনও সে এডিশনাল পুলিশ সুপারের পিএস আবার কখনও ডিবির সোর্স পরিচয় দিতো। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে ভালো কাজের প্রলভন দেখিয়ে বিদেশে মানবপাচারের অভিযোগও পাওয়া গেছে।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, আব্দুল্লাহ একজন চিহ্নিত অস্ত্র ব্যবসায়ী। সে সীমান্তের ওপার থেকে অস্ত্র এনে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে সরবরাহ করে। আবার এসব অস্ত্র পরিকল্পিতভাবে প্রতিপক্ষের বাসা বাড়িতে রেখে পুলিশ তুলে দিয়ে হয়রানি করতো সে। অন্যদিকে মামলার চার্জশিট থেকে অভিযুক্তদের নাম বাদ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও মোটা অংকের অর্থ আদায় করতো।

ভুক্তভোগী আক্তারুল ইসলাম জানান, দীর্ঘদিন ধরেই সে সাধারণ মানুষকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করে আসছে। মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় ছাড়াও বোমা, ইয়াবা বা যেকোনো মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে।

তবে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে বলছেন, সোর্সদেরও ছাড় দেয়া হয়না। অপরাধের সাথে লিপ্ত সকলকেই আইনের আওতায় আনা হয়।

সম্প্রতি অভিযোগ পাওয়া গেছে গত ৬ এপ্রিল আব্দুল্লাহ মেহেরপুর ডিবি পুলিশের কাছে একই উপজেলার বাঁশবাড়ীয়া গ্রামের ৯ জনের বিরুদ্ধে নারীর শ্লীলতাহানির মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে। অভিযুক্তদের মধ্যে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মীও রয়েছেন। পরে ভয়ভীতি দেখিয়ে অভিযুক্তদের কাছ থেকে প্রায় লাখ টাকা নিয়ে অভিযোগ তুলে নেয় সে। এভাবে তার বিরুদ্ধে একই ধরনের বহু অভিযোগ রয়েছে।

অভিযুক্তদের মধ্যে বাঁশবাড়ীয়া গ্রামের এক আওয়ামী লীগ নেতা রয়েছেন। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেছেন।

আরেক ভুক্তভোগী বাঁশবাড়ীয়া পশ্চিম পাড়া গ্রামের মেহের আলীসহ তার পুত্র শহীদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, আব্দুল্লাহ এডিশনাল এসপির পিএস পরিচয় দিয়ে বেদখল হওয়া জমি দখল করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার কাছ থেকে ৮০ হাজার টাকা নেয়। পরে জমি দখল না করে দিলে টাকা ফেরত চাইলে পুলিশের হয়রানির হুমকি দেয় সে। কিস্তিতে ঋণ নিয়ে ওই অর্থ দেয়ায় এখন পথে বসতে চলেছে ভুক্তভোগী।

এছাড়া তার বিরুদ্ধে থানার দালালি করার অভিযোগ রয়েছে। এমন এক ভুক্তভোগীর নাম শামীম। সে একই উপজেলার কাথুলী গ্রামের ফজু আহমেদের ছেলে। তার বিরুদ্ধে গাংনী থানায় শ্লীলতাহানির একটি মামলা হয়। এ মামলায় চার্জশিট থেকে নাম বাদ দেওয়ার নাম করে ৫০ হাজার টাকা নেয় আব্দুল্লাহ। কিন্তু চার্জশিট থেকে তার নাম বাদ দেওয়া হয়নি। পরে কাজ না করতে পারায় টাকা ফেরত চাইলে উল্টো আরও মামলায় জড়ানোর হুমকি দেয় সে।

২০১৪ সালে স্ত্রীকে হত্যার ঘটনায় বাশবাড়ীয়া গ্রামের মাসুদ ওরফে ইঞ্জিলকে গ্রেফতার করে থানা পুলিশ। আসামি ইঞ্জিল রিমান্ডে গ্রামের কয়েকজন তার সঙ্গে জড়িত ছিল বলে স্বীকার করেছে- আব্দুল্লাহ এমন মিথ্যা তথ্য দিয়ে একই গ্রামের তিনজনের কাছ থেকে নাম বাদ দেওয়ার নাম করে ৩০ হাজার টাকা নেয়।

এর আগে ২০১৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর বাঁশবাড়ীয়া গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল আমিনকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এঘটনায় মৃত নুরুল আমিনের বড় ভাই শামীম হোসেন বাদি হয়ে গাংনী থানায় পরদিন ২৫ ডিসেম্বর একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা নং ১৬-২৫-১২-১৩। এতে সন্দেহভাজন ১২ জনকে আসামি করা হয়। অভিযুক্তদের ৬ জনের কাছ থেকে চার্জশিট থেকে নাম বাদ দেওয়ার নাম করে প্রায় আড়াই লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় আব্দুল্লাহ। এরমধ্যে দু’একজনের নাম চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হলেও বেশিরভাগের নামই বাদ দেওয়া হয়নি।

আব্দুল্লাহর দৌরাত্ম থেকে রেহায় পাননি ডিফেন্স সদস্যরাও। ব্লাকমেইল করে ডিবি পুলিশের নামে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন এক ডিফেন্স সদস্য। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, তার ক্ষুদ্র একটি ব্যবসার লাইসেন্স না থাকায় পুলিশি হয়রানির ভয় দেখিয়ে ৩০ হাজার টাকা নিয়েছে সে।

আব্দুল্লাহ গত জানুয়ারি মাসে বাঁশবাড়ীয়া কলোনী পাড়া গ্রামের মেজরের বাড়িতে বোমা রেখে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সেখানে ডিবি পুলিশ তুলে দেয় আব্দুল্লাহ। তার তথ্যমত পুলিশ এসে বোমা উদ্ধার করতে গেলে চক্রান্তের বিষয়টি ফাঁস হয়ে যায়। পরে গ্রামবাসির কাছে আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানায় পুলিশ।

মালদ্বীপে ভালো কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে একই গ্রামের ফজলের কাছ থেকে তার ছেলে কাজিমের পাসপোর্ট নেয় আব্দুল্লাহ। তার সঙ্গে সর্বমোট ১ লাখ ৮০ হাজার টাকার চুক্তি হয় এবং পাসপোটের সঙ্গে এর কিছু অংশ জমা দেন দরিদ্র কৃষক ফজল। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ভিসা না দিলে বিদেশে ছেলেকে পাঠাতে রাজি হননি ফজল। পরে আব্দুল্লাহ পুলিশের ভয় দেখিয়ে জোরপুর্ক ২ লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়ে বিদেশে পাঠান। বিদেশে গিয়ে চরম দুর্দশার মধ্যে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন কাজিম।

গাংনী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার হোসেন জানান, আব্দুল্লাহর বিষয়ে আমি কিছু জানি না। তবে গত কয়দিন আগে জেলা গোয়েন্দা ডিবি তাকে অস্ত্রসহ আটক করে। বর্তমানে সে জেলা কারাগারে আছে।

এ বিষয়ে মেহেরপুর পুলিশ সুপার আনিছুর রহমান জানান, সোর্স পরিচয় দিয়ে যদি কোনো ব্যক্তির নিকট থেকে টাকা নিয়ে থাকে তবে ভুক্তভোগীরা আমার কাছে অভিযোগ করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এমবি