মুক্তিযুদ্ধের উপ প্রধান সেনাপতি ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের গত মেয়াদের পরিকল্পনামন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) একে খন্দকারের লেখা ‘১৯৭১: ভেতরে বাইরে’ বই নিয়ে জাতীয় সংসদে তোলপাড় হয়ে গেল। সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরা বইটির তীব্র সমালোচনা করে এটি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।
বইটিতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা করা হয়েছে এবং এতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে খাটো করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন সরকারি দলের সদস্যরা। তারা বইটি প্রত্যাখ্যান করে সেটি বাতিলের দাবি জানান এবং তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি করেন।
আওয়ামীলীগের সিনিয়র সদস্য শেখ ফজলুর করিম সেলিম বলেন, একে খন্দাকার সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। তাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে বিচার করা হোক। কারো ইন্ধনে কোনো এজেন্সি থেকে মোটা অংকের টাকা খেয়েছেন একে খন্দকার। এতে ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে।
শেখ সেলিম বলেন, বঙ্গবন্ধুকে খাটো করা হয়েছে বইটিতে। অপরদিকে, পাকিস্তানী আইয়ুব খানের প্রশংসা করা হয়েছে। তিনি এ ধরনের ব্যক্তির চরিত্র প্রকাশ করা দরকারএমন মন্তব্য করে বলেন, বঙ্গন্ধুকে হত্যার পর খুনী মোস্তাকের আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন বলেও একে খন্দকারের প্রতি দোষারোপ করেন।
মাগরিবের বিরতির পর ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়ার সভাপতিত্বে বৈঠক শুরু হলে সাবেক তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ বইটি সম্পর্কে পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টের উল্লেখ করে বইটি ও লেখকের তীব্র সমালোচনা করেন। এরপরই আওয়ামী লীগের সিনিয়র সদস্য তোফায়েল আহমদ, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আমির হোসেন আমু, রফিকুল ইসলাম বীর উত্ত, জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ, জাসদের মইন উদ্দিন খান বাদল, বক্তব্য রাখেন। ডেপুটি স্পিকার নিজেও মন্তব্য করেন।
আবুল কালাম আজাদ বলেন, একে খন্দকার সাহেব সিনিয়র। তিনি মন্ত্রীও ছিলেন। তিনি বইয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন। তিনি এসব তথ্য কোথায় পেলেন আমি পড়ে অবাক হয়েছি। আমি আশা করি এ ব্যাপারে অন্যরা ভালো বলতে পারবেন।
তার বক্তব্যের পর ডেপুটি স্পিকার বলেন, মুক্তিযুদ্ধে কার কী ভূমিকা ছিল সবার জানা। একে খন্দকারের কথা নিয়ে একটি পত্রিকায় রিপোর্টটি আমিও পড়েছি। সেখানে কিছু তথ্য বিকৃত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি কেন এমন কথা বললেন। বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধুই। কে কি বললো তাতে কিছুই আসে যায় না। ইতিহাস ইতিহাসই।
এরপর আবার তোফায়েল আহমেদ ফ্লোর নিয়ে বলেন, যেহেতু প্রসঙ্গটি আসলো আমি না বলে থাকতে পারলামনা। বইটি সংগ্রহ করে প্রথম দিকে পড়ার চেষ্টা করলাম। তিনি লিখেন পাকিস্তানীদের কাছ থেকে ভালো ব্যবহার পেয়েছেন।
তোফায়েল বলেন, বঙ্গবন্ধুর ভাষনের সময় আমি নিজে মঞ্চে ছিলাম। আমরা মঞ্চে থেকে জানতে পারলাম না তিনি কোথা থেকে জানলেন, বঙ্গবন্ধু জয় পাকিস্তান বলেছেন।
তিনি এখন কেন বই লিখেন তা জানি। সে সব বলতে চাই না। এ সব কথা বলে লিখে অন্যদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া হয়। তিনি মন্ত্রী ছিলেন। তিনি কী লিখছেন। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের একটি ভাষনের মধ্য দিয়ে নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে রুপান্তরিত করেছিলেন। ৩০০ বছরের ইতিহাসে বঙ্গন্ধুর ৭ মার্চ ভাষন শ্রেষ্ট ভাষন। এ ব্যাপারে সতর্কতার সাথে কথা বলা উচিত। তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী। বাংলাদেশ হাওয়ার ওপর স্বাধীন হয়েছে ?
এ কে খন্দকার বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর যুদ্ধের প্রস্তুতি ছিলনা। বঙ্গবন্ধু জয়বাংলার পর আর কিছু বলেননি। একে খন্দকার ৫২-৬৯ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানে ছিলেন। এদেশে কি হচ্ছে তিনি জানেন না।
রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম বলেন, একে খন্দকার বলেছেন পাকিস্তানীরা তার সাথে ভালো ব্যবহার করতো। বঙ্গবন্ধু জয় পাকিস্তান বলেছেন। এমন কথা এতোদিন তার কাছ থেকে শুনিনি। কেন এখন ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা ? এর কোন উদ্দেশ্য রয়েছে। যুদ্ধ করেছি আমাদের কেউ ঘুমাতে এমন পারেনি। আমরা যুদ্ধ করেছি। খন্দকার সাহেবরা ছিলেন কোলকাতায়। জেনারেল ওসমানীর আন্ডারে ছিলেন। রব সাহেবের অধীনে ডিপুটি চিফ অব স্টাফ ছিলেন। আর্মির দ্বারা যুদ্ধ পরিচালিত হয়নি। বঙ্গবন্ধুর দ্বারা যুদ্ধ পাচিালিত হয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অধীনে রাষ্ট্র যুদ্ধে যেতে পারে। পৃথিবীর কোথাও জনগনকে ছাড়া যুদ্ধ হয়নি। রাজনৈতিক নেতুত্বে হয়েছে। বাংলাদেশে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু।
একে খনন্দকার যে বক্তব্য দিয়েছেন এর পেছনে কারো না কারো প্ররোচনা রয়েছে। অন্য উদ্দেশ্যে জাতির জনককে ছোট করার চেস্টা। এ বইকে সমগ্র জাতি প্রত্যাখ্যান করবে।
কাজী ফিরোজ রশীদ গোটা জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন তিনি। উনি যে পাকিস্তানের গুণকীর্তন করেছেন তাতেই তার উদ্দেশ্য পরিষ্কার।
জাসদের মঈন উদ্দীন খান বাদল বলেন, ‘শাসনতন্ত্রের বিরোধিতা যদি অপরাধ হয়, তবে এ কে খন্দকার সেই অপরাধ করেছেন। যখন সুবিধা নিলেন, তখন তো কোনো ফোরামে এসব কথা বলেননি। এখন বলছেন, হয়তো বইয়ের কাটতি বাড়াতে।’
উল্লেখ্য, এই বইয়ে একে খন্দকার লিখেছেন, "ফেব্রুয়ারি মাসের বিভিন্ন ঘটনা দেখে আমার মনে হয়েছিল, পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বা আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। ইতিমধ্যেই তারা গোপনে পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য নিয়ে আসা শুরু করে। পাকিস্তানিদের এ ধরনের খারাপ মতলব বা কর্মকা- সাধারণ মানুষ বা রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। এমনকি বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের কাছেও বিষয়টা খুব গোপন রাখা হতো। সম্ভবত বাঙালি হিসেবে আমিই প্রথম পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য নিয়ে আসার বিষয়টি বুঝতে পেরেছি।"
তিনি বইয়ে আরও লিখেছেন, "২৫শে মার্চ রাতে হাজার হাজার মানুষ বেঁচে যেতেন, যদি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আমরা ঠিক সময়ে যুদ্ধ শুরু করতে পারতাম। বারবার মনে প্রশ্ন জাগে, বঙ্গবন্ধু কেন ওই রাতে কাউকে কিছু বলে গেলেন না? আবার ভাবি, উনি কাদের বলবেন? হয় তাজউদ্দীন সাহেব, না হয় নজরুল ইসলাম সাহেবকে। তিনি হয়তো বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদেরও বলে যেতে পারতেন। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা তাঁর (মুজিব সাহেবের) নির্দেশনা জানতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু তিনি কাউকে কিছু বলেননি বা আমরা কিছুই জানতে পারিনি।"
একে খন্দকার তার বইয়ে বলেন, "আমি মনে করি, জাতির এ ধরনের ক্রান্তিকালে রাজনৈতিক পরিকল্পনা ছাড়াও একাধিক বিকল্প পরিকল্পনা থাকা উচিত ছিল, যাতে একটি ব্যর্থ হলে অন্যটি প্রয়োগ করা যায়। আমি এমন কোন তথ্য পাইনি, যাতে মনে করতে পারি যে রাজনৈতিক পন্থা ব্যর্থ হলে আওয়ামী লীগ নেতারা বিকল্প পন্থা হিসেবে অন্য কোন উপায় ভেবে রেখেছিলেন। সম্ভবত মার্চ মাসের শুরুতে পাকিস্তান থেকে অস্ত্র ও সেনা আনার বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ করেছিলেন বাঙালি বৈমানিক ক্যাপ্টেন নিজাম চৌধুরী। তিনি পিআইএর কো-পাইলট ছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি পিআইএর বিমানে সৈনিক পরিবহনে অস্বীকৃতি জানান এবং বিমান থেকে নেমে চলে যান। সামরিক কর্তৃপক্ষ এটাকে সহজভাবে নেয়নি। তারা ক্যাপ্টেন নিজামকে বরখাস্ত এবং অন্তরীণ করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে।"
তিনি লিখেছেন, "সত্যি কথা বলতে কি, আমরা রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে কোন নির্দেশ পাইনি। এ বিষয়ে রাজনৈতিক নেতারা আমাদের কিছু জানাননি। যদি কেউ বলেন যে তখন আওয়ামী লীগের নেতারা যুদ্ধের নির্দেশনা দিয়েছিলেন, তবে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলতে হয় যে তা সঠিক নয়। অন্তত আমি কোন নির্দেশনা পাইনি। শোনা যায়, মার্চ মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছাত্ররা নিজ উদ্যোগে পুরনো ৩০৩ রাইফেল দিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ের মতো তখন তথ্যপ্রযুক্তি এত উন্নত ছিল না। তাই এ ধরনের কোন তৎপরতার খবর তাৎক্ষণিকভাবে আমি বা অন্য কোন সামরিক কর্মকর্তারা জানতে পারিনি। এর ফলে কর্মরত বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের ধারণা হয় যে রাজনৈতিক নেতাদের কোন ধরনের যুদ্ধ প্রস্তুতি নেই। ফলে ২৫শে মার্চ ঢাকাসহ সারা দেশে যখন পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করল, তখন এটিকে প্রতিহত করার জন্য বাঙালি সেনাসদস্যদের কোন প্রস্ততি ছিল না। এটাই ছিল বাস্তব সত্য।"
ঢাকা, ৪ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, কেবি





