পহেলা বৈশাখকে ঘিরে রাজধানী উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলা নববর্ষ বাঙালির অন্যতম মিলনমেলা ও জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সবাই শামিল হয়েছেন এই উৎসবে।

সকাল থেকেই রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র শাহবাগ, রমনা, চারুকলাসহ বিভিন্ন এলাকায় ভীড় জমাচ্ছেন ছোট-বড় নানান বয়সী মানুষ।

তবে নিরাপত্তা সতর্কতার কারণে এবার বাংলামোটর, কাটাবন, মৎসভবন, কাঁকরাইল, ঢাকা মেডিকেল দোয়েল চত্বর এলাকা থেকেই গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। সেসব স্থান থেকেই হাঁটতে দেখা যায় লোকজনকে।রাস্তার দু’পাশে থাকা হরেক রকম দোকান আর পণ্য যেন উৎসবের আমেজকে বাড়িয়ে দিয়েছে। আল্পনায় মুখ আর হাত রাঙিয়ে সময়কেই রাঙিয়ে তুলছে অনেকেই।

সকাল সোয়া ছয়টায় রমনা বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতী সঙ্গীতে শুরু হয় বর্ষবরণ উৎসব। এ অনুষ্ঠান ৮টা ৩৫ মিনিটে শেষ হয় জাতীয় সংগীত দিয়ে। সব ধরনের অশুভ তৎপরতা রুখে দেয়ার প্রত্যয়ে সংগঠনটি নববর্ষে মানবতার ডাক দিয়েছে।

শতাধিক শিল্পীর অংশগ্রহণে ভোরের রাগালাপ দিয়ে শুরু হওয়া এ অনুষ্ঠান শেষ হয় ড. সনজীদা খাতুনের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। ১৫টি একক গান, ১২টি সম্মেলিত গান, ৩টি আবৃত্তি ও পাঠ দিয়ে সাজানো হয় এবারের অনুষ্ঠান।

পরে সকাল ৯টার পর অন্তর মম বিকশিত করো, অন্তর তর হে’ স্লোগানে বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। নানা রঙ-ঢঙের মুখোশ ও প্রতীকে সাজানো এবং ঢাক-ঢোলের ছন্দের ঐকতানে মুখরিত এ শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার হাজারো মানুষ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, প্রক্টর ড. আমজাদ আলী এবং চারুকলা অনুষদের ডিন নিসার হোসেনের নেতৃত্বে বাংলা বর্ষবরণের অন্যতম বড় আকর্ষণ এই শোভাযাত্রা চারুকলার সামনের রাস্তা থেকে শুরু হয়ে শাহবাগ, হোটেল রুপসী বাংলার মোড় ঘুরে পুনরায় চারুকলায় গিয়ে শেষ হয় শোভাযাত্রাটি।

এতে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার প্রতিবাদী প্রতীক রূপে স্থান পেয়েছে মায়ের কোলে শিশু; সহিংসতার বিরুদ্ধে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে একত্রিত তিনটি পাখি; শিশুদের সুরক্ষা ও বাংলা সংস্কৃতির পরিচায়ক প্রাণী- হাতি, হরিণসহ মোট ৯টি লোকজ পুতুল, দেশের ঐতিহ্যবাহী ময়ুরপঙ্খীর আদলে নির্মিত প্রতীকী নৌকা। এছাড়া শোভাযাত্রায় রাজা, রাণী, পেঁচা, বাঘসহ নানা প্রাণীর মুখোশ, টেপা পুতুল, পেপার ম্যাশও দেখা যায়।

এছাড়াও নগরীর অন্যান্য বিনোদন কেন্দ্রগুলোতেও মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। সবমিলেই এ যেন এক অন্যরকম উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে গোটা রাজধানী। সকালে রমনার বটমূলে ছায়ানটের সুরের তালে নববর্ষ বরণের যে উৎসব শুরু হয়েছে তার ঢেউ লেগে গেছে যেন সারা দেশে। পুরো বাংলাদেশ এখন ১৪২৩ বাংলা বর্ষবরণের রঙে রঙিন হয়েছে।

নিরাপত্তা: পয়লা বৈশাখে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান নির্বিঘ্ন করতে পুলিশ, র‌্যাব ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বাঙালির প্রাণের উৎসবকে ঘিরে রমনা পার্ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পুরোটাই সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, সারা দেশই নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে বলে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক জানান, কোনো সমস্যা ছাড়াই নববর্ষ পালন করতে পারবেন নগরবাসী। তবে বিকেল ৫টার মধ্যেই সব ধরনের অনুষ্ঠান শেষ করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া আগের চেয়ে প্রযুক্তিগতভাবে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে সব ধরনের নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি বসিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে নিরাপত্তা দেওয়া হবে। এ ব্যবস্থা শুধু রাজধানীতে নয়, সারা দেশে থাকবে।

এমই