রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের রসিক মানুষ হিসেবে বেশ খ্যাতি আছে। সংসদের স্পীকার ও ডেপুটি স্পীকার থাকাকালীন সংসদ সদস্যসহ দেশবাসী সেটা দেখেছেন। তবে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তার রসিকতা যেন সব কিছুকে ছাড়িয়ে গেছে।

গতকাল শনিবার (৬ অক্টোবর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫১তম সমাবর্তনে যোগ দিয়ে ভারতীয় নায়িকা ও বিশ্বসুন্দরী প্রিয়াঙ্কা চোপড়াকে নিয়ে রসিকতা করলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য আবদুল হামিদ।

আচার্য হিসেবে সমাবর্তনে বক্তব্য দিতে গিয়ে রসিকতা করবেন না- এমনটি যেন মানায় না রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে। কিছুদিন আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তনে ‘হেলিকপ্টার’ ও ‘হাতের ব্যায়াম’ নিয়ে তার বক্তব্যে মজেন গ্র্যাজুয়েটরা। এরও আগে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি মজা করে বলেন, ‘বুড়া বাতিল না হলে পথ পরিষ্কার হচ্ছে না’।

সমাবর্তনে গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া বঙ্গভবনে এসে আমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার স্ত্রী (রাষ্ট্রপতির স্ত্রী) নাকি ফোন দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার বঙ্গভবনে আসার কী দরকার!’
সাবেক বিশ্বসুন্দরী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া।

‘এই ধরনের একটা সুযোগ নষ্ট, এটা সে ঠিক করেনি। আসার পর যদি ঘটনা ঘটতো অন্তত এই উপ-মহাদেশের একটা মেয়েকে সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে সুদর আমেরিকা যেতে নাও তো হতে পারত। সবই কপাল-ভাগ্য, কিছু করার নেই’- বলেন রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতির এই হাস্যরসের বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে এই সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। লিখিত বক্তব্যের বাইরে স্বভাব-সুলভ মজার কথাবার্তায় সমাবর্তন প্রাঙ্গণ মাতিয়ে রাখেন রাষ্ট্রপতি।

স্মৃতিচারণ করে আবদুল হামিদ বলেন, ‘কবে আমি বিয়া করছি...আজকে হিসাব অন্যভাবে বলবো- ১৭০ কোটি ২ লাখ ৯২ হাজার ৪০০ সেকেন্ড হয়ে গেছে। হঠাৎ বলতে পারবেন না সময় কতদিন হয়েছে। আসলে হয়েছে ৫৪ বছর দু’দিন। এটা হওয়ার কারণ হলো কী- এ বাচুপানকে মোহাব্বতের মতো কম বয়সে বিয়া কইরা ফালাইছিলাম।’

কিশোরগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষায় তিনি বলেন, ‘৫৪ বছরে একটা মহিলা তো মোটামুটি আমার সবকিছুই বুইঝা ফেলছে। ভালো-খারাপ, কী করতে পারি না পারি। এটা কিন্তু তার কন্ট্রোলের ভেতরে। আমি যখন ৭/৮ বছর আগে স্পিকার ছিলাম, যখন আমি নারী নির্যাতন বিল পাস করি তখন আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলাম, আপনি নারী নির্যাতন বিল পাস করছেন, ভালো কথা; কোন অসুবিধা নেই। পুরুষ নির্যাতন বিল পাস করাও তো প্রয়োজন।’

‘তিনি (প্রধানমন্ত্রী) বলেন, এটা এই মুহূর্তে প্রয়োজন নেই। পরে দেখা যাবে, যদি হয়; তবে করা হবে। ছয় বছর চলে গেছে এখনও কিন্তু করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী খবর-টবর রাখেন না, আসলে খালি আমার ঘরেই নয়, সারা বাংলাদেশেই পুরুষ নির্যাতন যে কিছু হচ্ছে না, এই কথাটা ঠিক নয়। এটা কিন্তু মারাত্মকভাবে হচ্ছে। ভুক্তভোগীরাই এটা টের পাচ্ছে।’ তার এই কথায় সমাবর্তনে উপস্থিত সবাই হেসে উঠেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘কয়েক মাস আগে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া...প্রিয়াঙ্কা চোপড়াকে তো সবাই চেনেন। আমি যদিও বুড়া বয়সে চিনি, এই ছেলেদের তো না চেনার কোনো কারণ নেই। এই প্রিয়াঙ্কা চোপড়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে ঢাকা আসছিলেন। বাংলাদেশে অন্য দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী আসলে তারা বিভিন্ন পর্যায়ে দেখা করে সর্বশেষ রাষ্ট্রপতির কাছে বঙ্গভবনে আসেন। সবাই আসেন।’

তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রীকে বললাম এবার তো প্রিয়াঙ্কা চোপড়া আসবে। আসার একদিন আগে এই কথা বললাম- পরে শুনেছি সে (রাষ্ট্রপতির স্ত্রী) নাকি টেলিফোন করে প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন, প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার বঙ্গভবনে আসার কী দরকার!’

হর্ষধ্বনি উঠতে থাকে সমাবর্তন মাঠে। এর মধ্যেই রাষ্ট্রপতি বলে চলেন, ‘ইট ওয়াজ জাস্ট কন্সপাইরেসি, ষড়যন্ত্র। শেষ পর্যন্ত প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার বঙ্গভবনে আসা ক্যানসেল, তিনি আসেননি।’

‘প্রিয়াঙ্কা চোপড়া যাওয়ার কয়েক মাস পরে শুনলাম সে আমেরিকা গেছে, তার চেয়ে ১০ বছরের, ১০ বছরের না আরও বেশি ১২/১৪ বছরের নিক নামের ছেলেরে বিয়া করছে, আমেরিকা গিয়ে। আমি তো তার চেয়ে ৩০/৩৫ বছরের বড়। সে যদি ১২/১৩ বছর নিচে নামতে পারে তাহলে সে ৩০/৩৫ বছর উপরেও তো উঠতে পারত’ বলেই রাষ্ট্রপতিও হাসতে থাকেন। আর হাসির রোল পড়ে যায় উপস্থিত গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে।

এরপর তিনি বলেন, ‘এই ধরনের একটি সুযোগ নষ্ট, এটা সে ঠিক করেনি। আসার পর যদি ঘটনা ঘটত অন্তত এই উপ-মহাদেশের একটা মেয়েকে সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে সুদূর আমেরিকা যেতে নাও তো হতে পারত। সবই কপাল-ভাগ্য, কিছু করার নেই।’

আবদুল হামিদ বলেন, ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে আসলে সাময়িক সময়ের জন্য হলেও মনটা চাঙ্গা হয়ে যায়।’

এর আগে ২০১৪ সালের ৭ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৮তম সমাবর্তনে বক্তব্য দিতে গিয়ে রসিকতা করে রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য আবদুল হামিদ বলেন, ‘আপনারা জানেন যে আচার্য হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এটিই আমার প্রথম যোগদান। আরেফিন সিদ্দিক যেভাবে বললেন, জিল্লুর রহমান সমাবর্তনে যোগ দেওয়ার কয়েক দিন পরই ইন্তেকাল করেছেন। এরপর থেকে আমার মনের অবস্থা যে কী, সেটা আপনারা ভালোই বুঝতে পারছেন।’

রাষ্ট্রপতির এ কথা শুনে সমাবর্তনে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে।