নয়নাভিরাম লাল শাপলা দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে । সারা দেশের মতো কুষ্টিয়া অঞ্চলের খাল-বিলে এক সময় দেখা মিলতো এই লাল শাপলার। কিন্তু কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে এই শাপলা।
এক সময় জেলার বিল-ঝিল জলাশয় ও নিচু জমিতে প্রাকৃতিকভাবেই ফুটে থাকতো লাল শাপলা। আবহমান কাল থেকে শাপলা মানুষের খাদ্য তালিকায় সবজি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিলাঞ্চলের স্বল্প আয়ের মানুষ অভাবী সংসারে এক সময় শাপলা খেয়েই জিবীকা নির্বাহ করার কথা মানুষের মুখে এখনো শোনা যায়।
সবজি হিসেবে বাঙালির খাদ্যতালিকায় লাল শাপলার অন্তর্ভুক্তি বহু প্রাচীন। এর বৈজ্ঞানিক নাম (ঘুসঢ়যধপধ ঘড়ঁপযধষর) এটি একটি গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। সাদা ফুলবিশিষ্ট শাপলা সবজি হিসেবে ও লাল রঙের শাপলা নানা ঔষধিগুণে সমৃদ্ধ। লাল শাপলার ঔষধিগুণের কথা চীন ও ভারতের ভেষজ বিশেষজ্ঞ তিন হাজার বছর আগেই জানতেন। ফুলের নির্যাস থেকে তৈরি পদ্মমধু চোখের ছানির এক মহা ঔষাধ।
এর বীজ দুই হাজার বছর পর্যন্ত জীবন্ত থাকতে পারে। বর্ষা মওসুমের শুরুতে এ ফুল ফোটা শুরু হয়ে প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত বিল-ঝিল জলাশয় ও নিচু জমিতে জন্ম নেয় লাল শাপলা। স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য হওয়ায় এলাকার লোকজন শাপলা তুলে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে বিক্রি করে।
এ শাপলা শহুরেজীবনেও খাদ্যতালিকায় স্থান করে নিয়েছে। তবে আবাদি জমি ভরাট করে বাড়ি, পুকুর, মাছের ঘের বানানোর ফলে বিলের পরিমাণ যেমন কমছে, তেমনি শাপলা জন্মানোর জায়গাও কমে আসছে। তা ছাড়া জমিতে উচ্চ ফলনশীল জাতের ফসল আবাদের কারণে অধিক মাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগ, জলবায়ু পরিবর্তন, খাল-বিল ও জলাশয় ভরাটের কারণে মানিকগঞ্জের জলাশয় ও বিলাঞ্চল থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে লাল শাপলা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস জানায়, সাধারণত শাপলা তিন প্রকারের হয়ে থাকে। এর মধ্যে সাদা, বেগুনি (হুন্দি শাপলা) ও অন্যটি লাল রঙের। এর মধ্যে সাদা ফুলবিশিষ্ট শাপলা সবজি হিসেবে ও লাল রঙের শাপলা ঔষধি কাজে ব্যবহৃত হয়।
ডাক্তার সাদ্দাম হোসেন জুয়েল জানান, শাপলা খুব পুষ্টিসমৃদ্ধ সবজি। সাধারণ শাকসবজির চেয়ে এর পুষ্টিগুণ অনেক বেশি। শাপলায় রয়েছে প্রচুর ক্যালসিয়াম ও আয়রন। শাপলায় ক্যালসিয়ামের পরিমাণ আলুর চেয়ে সাত গুণ বেশি। তিনি আরো বলেন, শাপলা চুলকানি ও রক্ত আমাশয়ের জন্য বেশ উপকারী। তা ছাড়া ডায়াবেটিস, বুক জ্বালা, লিভার, ইউরিনারি সমস্যার সমাধানসহ নারীদের মাসিক নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পুষ্টি তথ্যে জানা গেছে, প্রতি ১০০ গ্রাম শাপলার লতায় রয়েছে খনিজপদার্থ ১.৩ গ্রাম, অ্যাশ ৮.৭ গ্রাম, খাদ্যপ্রাণ ১৪২ কিলো, ক্যালোরি- প্রোটিন ৩.১ গ্রাম, শর্করা ৩১.৭ গ্রাম, ক্যালশিয়াম ০.৫২ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ০.৩২, ড্রাই মেটার ৮.৪, ক্রুড আমিষ ১৬.৮, ক্রুড ফ্যাট ২.৮ ক্রুড ফাইবার ৬২.৩, নাইট্রোজেন ৩৫.৪, সোডিয়াম ১.১৯, পটাশিয়াম ২.২৩ ভাগ। ঐতিহাসিককাল থেকেই শাপলার ফল (ঢ্যাপ) দিয়ে চমৎকার সুস্বাদু খৈ ভাজা যায়। যেটি গ্রামগঞ্জে ঢ্যাপের খৈ বলে পরিচিত। মাটির নিচের মূল অংশকে (রাউজোম) আঞ্চলিক ভাষায় শালুক বলে।
স্থানীয় মাহমুদা চেীধুরী কলেজের অধ্যাপক শাহ আক্তার মামুন জানান, শাপলা আমাদের জাতীয় ফুল। আগামী প্রজন্মকে হয়তো ছবি দেখেই জাতীয় ফুল শাপলা চিহ্নিত করতে হবে। এ অবস্থায় আমাদের জাতীয় প্রয়োজনে এর বংশ বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিলুপ্ত হওয়ার হাত থেকে লাল শাপলাকে থেকে রা করতে হবে।
সবুজ/ ইমরান





