স্বামী-স্ত্রী দুজনই ডাক্তার। তাদের ব্যবস্থাপত্রের ওষুধে ভরসা রাখেন অনেক রোগী। অথচ তারাই জড়িয়েছেন ভেজাল ওষুধ তৈরিতে।
রোববার ওষুধ প্রশাসন ও পুলিশের যৌথ অভিযানে ধরা পড়েছেন তারা।
তাদের একজন ডা. এ এইচ এম নজিরুল হক (৪৫) চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের টিকাদান কর্মসূচির উত্তর কাট্টলি জোনাল অফিসার। অপরজন জান্নাতুল মাওয়া (৩৫) উত্তর কাট্টলি মোস্তফা হাকিম মাতৃসদন হাসপাতালের চিকিৎসক।
তারা দুজন ‘লেক্সিকন ফার্মাসিউটিক্যালস’ নামের ভেজাল ওষুধ তৈরির প্রতিষ্ঠানটি চালাচ্ছিলেন।
রোববার দুপুরে চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়তলি থানার উত্তর কাট্টলী মুন্সিপাড়া এলাকার ওই কারখানা থেকে তাদের আটক করা হয়।
অভিযানে কারখানার এক পরিচালক আবদুল জলিল (৪৫) এবং দুই কর্মচারী আল আমিন (২২) ও রুহুল আমিন (১৮) গ্রেপ্তার হন।
নজিরুল হক দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের প্রথম ব্যাচের ছাত্র। তার স্ত্রী জান্নাতুল মাওয়া চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ৪৫ ব্যাচের ছাত্রী।
২০০৬ সালে নজিরুল ও ২০১০ সালে জান্নাতুল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগে চিকিৎসক হিসেবে চাকরি শুরু করেন।
নজিরুল বলেন, বগুড়া জেলার দুপচাচিয়া এলাকার আবদুর রউফ নামের এক ব্যক্তি কারখানাটি চালাতেন।
“প্রথমে এক লাখ টাকার শেয়ার দিয়ে ব্যবসায় নামি। ২০১৩ সালে তার সাথে চুক্তির পর কারখানাটি আমার মালিকানায় আসে।
“এরপর আমার পরিচিত নয়জনের কাছে পরিচালক পদ দিয়ে শেয়ার বিক্রি করি। মোট ১৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ এ ব্যবসায়।”
চিকিৎসক হয়ে ফার্মাসিস্টের কাজ করছেন কেন- এমন প্রশ্নে নজিরুল বলেন, “ফার্মাসিস্ট ও কেমিস্ট চেয়ে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। আমাদের ট্রায়াল প্রোডাকশন চলছিল।”
তিনি ‘ট্রায়াল প্রোডাকশন’ বললেও ওষুধের গায়ে ’নট ফর সেল’ লেখা নেই।
ওষুধ প্রশাসনের যে সনদ এ দম্পতি দেখিয়েছেন তা ভুয়া বলে চিহ্নিত করেছেন চট্টগ্রাম ওষুধ প্রশাসনের ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক কে এম মুহসিনিন মাহবুব।
তিনি বলেন, একজন চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র দিতে পারেন। আর ওষুধ তৈরিতে দরকার রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্ট ও কেমিস্ট। অথচ ফার্মাসিস্ট ও কেমিস্ট ছাড়াই কারখানা পরিচালনা করছিলেন এ চিকিৎসক দম্পতি। আর ওষুধ প্রশাসনের যে সনদ তিনি দেখিয়েছেন তাও ভুয়া।
ওই কারখানায় ১৭ ধরনের ওষুধ তৈরির পরিকল্পনা ছিল বলে জানান মুহসিনিন মাহবুব।
সরেজমিন দেখা গেছে, নগরীর উত্তর কাট্টলির ধোপপুল এলাকার শিমক্ষেতে একটি টিনশেড ঘর ভাড়া নিয়ে চলছিল কারখানাটি। উৎপাদিত ওষুধের গায়ে লেক্সিকন ফার্মাসিউটিক্যালস উল্লেখ থাকলেও কারখানার কোনো সাইনবোর্ড ছিল না।
কারখানার দরজায় ‘প্রবেশ নিষিদ্ধ, সংরক্ষিত এলাকা’ লেখা একটি সাইনবোর্ড লাগানো। ১০০ বর্গফুট জায়গায় লম্বালম্বি তিনটা কক্ষে কয়েকটি মেশিন।
প্রথম কক্ষে ব্লিস্টারিং মেশিন ও ফয়েলিং মেশিন, দ্বিতীয় কক্ষে ওষুধের নানা কাঁচামালের মিশ্রণ শুকানোর ড্রায়ার মেশিন ও শেষ কক্ষে ক্যাপসুল ফিলিং মেশিন দিয়ে ‘ইসোলেক্স’ নামের গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ তৈরি করা হচ্ছিল।
ওই এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী এনামুল বশর বলেন, এটি আগে জিমনেসিয়াম ছিল। পাঁচ-ছয় মাস ধরে কারখানাটি চলছে। সাইনবোর্ড না থাকায় কিসের কারখানা বুঝতে পারিনি।
“দিনের বেলায় কারখানাটি বন্ধ থাকত। সন্ধ্যার পরই লোকজন আসা শুরু করত। কারখানাটি নিয়ে এলাকার সবার মধ্যে কৌতূহল ছিল।”

এমএম