বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিডে ‘অজ্ঞাত’ সমস্যার কারণে শনিবার সকাল সাড়ে ১১টা থেকে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত ঢাকার কয়েকটি এলাকাসহ দেশের কয়েকটি স্থানে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও রাজধানীসহ অধিকাংশ অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। তবে এখনও পর্যন্ত জাতীয় গ্রিড বিকল হওয়ার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ভেড়ামারার রামকৃষ্ণপুরে অবস্থিত ৫০০ মেগাওয়াট এইচভিডিসি ভারত-বাংলাদেশ ব্যাক টু ব্যাক বিদ্যুৎ সঞ্চালনকেন্দ্রে আকস্মিক বিপর্যয় ঘটেছে।
তবে জাতীয় গ্রিড কোম্পানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের এমন যুক্তি মানতে নারাজ বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, একটি কেন্দ্রের বিপর্যয়ের কারণে সারা বাংলাদেশে অবস্থিত জাতীয় গ্রিডের পুরো ব্যবস্থাকে বিকল করতে পারে না। ভিন্ন কোনো ত্রুটির কারণে এমনটি ঘটতে পারে।
এ ব্যাপারে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কোয়ান্টাম পাওয়ার সিস্টেম লিমিটেডের উৎপাদন বিভাগের প্রকৌশলী মো. রাব্বী হাসান বলেন, ‘প্রতিটি বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে পাঠানো হয়। সাধারণত বাংলাদেশে ১ লাখ ৩৩ হাজার ভোল্টের লাইনে এই বিদ্যুৎ পাঠানো হয়। এর পর এই বিদ্যুৎ বিভিন্ন সাব-স্টেশনের মাধ্যমে তা ভোল্ট কমিয়ে গ্রাহকপর্যায়ে পাঠানো হয়।’
রাব্বি বলেন, ‘জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে অনেকগুলো সাব-স্টেশন যুক্ত থাকে। যদি কোনো একটি কেন্দ্রে সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে কেন্দ্রটি ব্রেক (বন্ধ) দিয়ে অন্য কেন্দ্র দিয়ে সঞ্চালন সচল রাখা যায়।’
এদিকে ন্যাশনাল গ্রিডের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, সারাদেশে মোট ১৬৪ দশমিক ৭০ সার্কিট কিলোমিটার ৪০০ কিলোভোল্ট, তিন হাজার ৬৬ সার্কিট কিলোমিটার ২৩০ কিলোভোল্টের এবং ৬ হাজার ১২৫ সার্কিট কিলোমিটার ১৩২ কিলোভোল্টের সঞ্চালন লাইন পরিচালনা করে ন্যাশনাল গ্রিড কোম্পানি। এ সব সঞ্চালন লাইনের মধ্যে একটি ৪০০ কিলোভোল্ট, ১৮টি ২৩০/১৩২ কিলোভোল্ট এবং ৮৮টি ১৩২/৩৩ কিলোভোল্ট সাব-স্টেশন রয়েছে।
যদি কোনো একটি সাব-স্টেশনের কারণে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সঞ্চালন অচল থাকে, তাহলে ওই সাব-স্টেশনটি বন্ধ রেখে বাকিগুলো সচল রাখা সম্ভব বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ কৌশল বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক এম এম শহিদুল হাসান।
তিনি বলেন, ‘একটি দেশের বিদ্যুতের ন্যাশনাল গ্রিডের একটি জায়গা অচল হলে সারাদেশ অচল হবে, এটা কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য? একটি কোম্পানি একটি মহাপরিকল্পনা করে বিদ্যুতের সঞ্চালনের দায়িত্ব নিয়েছে, তাদের মাথায় কি এতটুকু ধারণা নেয় যে, যে কোনো সময় সঞ্চালন লাইনে ফল্ট করতে পারে? আর যদি ফল্ট করে তাহলে ওই ফল্টের কারণে সারাদেশ ভুক্তভোগী হতে পারে। এ সব ধারণা তাদের আছে। আর এগুলো মাথায় রেখেই জাতীয় গ্রিডের মাস্টারপ্ল্যান করা হয়। মোট প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কিলোমিটার জাতীয় গ্রিডে ৯০ থেকে ৯৫টি বিভিন্ন ক্ষমতার সাব-স্টেশন রয়েছে। আর এ সব সাব-স্টেশন একসঙ্গে বিকল হয়ে যাবে, তা কল্পনাও করা যায় না। যে কোনো একটি সাব-স্টেশন বিকল হলেও ওই সাব-স্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত অঞ্চলগুলো বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হবে। কিন্তু সে জন্য পুরো সিস্টেম ফল্ট করতে পারে না। অন্তত আমার অভিজ্ঞতা এ কথা বলে না।’
শহিদুল হাসান বলেন, ‘এখনও পর্যন্ত কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎ যে সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে আসছে, সেখানে বিপর্যয় ঘটেছে। কিন্তু ভারত চুক্তি অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশকে দেয়। কিন্তু আমার জানামতে, এই পরিমাণ বিদ্যুৎ ভারত দেয় না। যদি এমন হতো- এই সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে তিন থেকে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসছে, তাহলে হঠাৎ করে তা দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং জাতীয় গ্রিডের সবগুলো সাব-স্টেশন বিকল করতে পারে। কিন্তু ভারত যদি বিদ্যুৎ সরবরাহ নাও করে, তাহলে দেশে উৎপাদিত বিদ্যুৎ তো রয়েছে।’
শহিদুল হাসান জানান, ভেড়ামারায় একটি থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট রয়েছে, যেখানে একটি ২৩০/১৩০ কিলোভোল্ট সাব-স্টেশন রয়েছে। এই সাব-স্টেশন থেকে বিদ্যুৎ পাঠানো হচ্ছে উত্তরে ঈশ্বরদী সাব-স্টেশনে দুটি আলাদা ২৩০ ও ১৩০ কিলোভোল্ট সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে। অন্যদিকে ১৩০ কিলোভোল্টের সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে দক্ষিণে বোতাইল সাব-স্টেশন, ঝিনাইদহ সাব-স্টেশন ও যশোর সাব-স্টেশন এবং নওয়াপাড়া সাব-স্টেশন হয়ে খুলনা সেন্ট্রাল সাব-স্টেশনে যুক্ত হয়েছে, যেখানে গোয়ালপাড়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বার্জমাউন্টেইনের উৎপাদিত বিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছে। ভেড়ামারা থেকে অন্য একটি ২৩০ কিলোভোল্টের সঞ্চালন লাইন ফরিদপুর, মাদারীপুর, বরিশাল, কাউখালী হয়ে খুলনার গোয়ালপাড়ার সাব-স্টেশনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে ঈশ্বরদী সাব-স্টেশন থেকে ২৩০ কিলোভোল্টের সঞ্চালন লাইন যুক্ত হয়েছে ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাব-স্টেশনের সঙ্গে। এই সাব-স্টেশন থেকে একটি ২৩০ কিলোভোল্টের সঞ্চালন লাইন যুক্ত হয়েছে টঙ্গী সাব-স্টেশনের সঙ্গে। পৃথক ২৩০ ও ১৩০ কিলোভোল্টের দুটি সঞ্চালন লাইন যুক্ত হয়েছে রাজধানীর সেন্ট্রাল সাব-স্টেশনের সঙ্গে। অন্যদিকে আশুগঞ্জের দুটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পৃথক দুটি ২৩০ ও ১৩০ কিলোভোল্টের সঞ্চালন লাইনও যুক্ত হয়েছে ঘোড়াশাল সাব-স্টেশনের সঙ্গে।
অধ্যাপক শহিদুল হাসান বলেন, ‘যদি ভেড়ামারা বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও ভেড়ামারা হয়ে বাংলাদেশে আমদানি করা ভারতের ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধও থাকে, তাহলে দক্ষিণাঞ্চলের কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না। একই ভাবে রাজধানীরও কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না।’
তিনি বলেন, ‘সমস্যা শনাক্ত করতে আমাদের দুর্বলতা থাকতে পারে। তবে এ জন্য ভুল কিছু বোঝানো উচিত নয়।’
এএইচ





