মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি প্রতিরোধে যে খসড়া আইন করা হয়েছে, তাতে স্পর্শকাতর এই অভিযোগে যে কেউ থানায় মামলা করতে পারবেন। ফলে আইনটি ব্যক্তিগত প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য অপব্যবহার হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই।

আইনে পাঁচ বছরের জেল ছাড়াও কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান থাকছে। এ ছাড়া সংক্ষিপ্ত ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিযোগের অনুসন্ধান, তদন্ত ও বিচারের নির্দেশনা রয়েছে।

আইন কমিশন ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতিকরণ অপরাধ আইন, ২০১৬’-এর খসড়া তৈরি করে এবং এর ওপর মতামত নিয়ে সেগুলো সমন্বয় করে সরকারকে দিয়েছে। ওয়েবসাইটে মতামতের জন্য দেওয়া হলেও আইনটির ওপর ১০টির কম মত এসেছে।

মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনা ও দলিলগুলো অস্বীকার বা বিকৃতিসহ এগুলোর বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য প্রতিরোধ এই আইনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের সংখ্যা, স্বাধীনতার ঘোষণা ও ঘোষণাপত্র, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ দলের কয়েক নেতার সাম্প্রতিক বক্তব্য আইনটির খসড়া তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিসহ কয়েকটি সংগঠন কয়েক বছর ধরে এ ধরনের আইন তৈরির দাবি জানিয়ে আসছে।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘আমি মনে করি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি রোধে কিছু বিধিনিষেধ থাকা উচিত। তবে ইতিহাস বিকৃতির বিষয়টি চিহ্নিত ও ব্যাখ্যা করাটা বেশ কঠিন কাজ। আমাদের দেশে সব আইনের একটু-আধটু অপব্যবহার হয়। যত দিন পর্যন্ত আইন প্রণয়ন ও এর প্রয়োগ না হচ্ছে, তত দিন পর্যন্ত এ সম্পর্কে মন্তব্য করাটা বেশ কঠিন।’

ব্যক্তির মামলা করার সুযোগ: মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অপরাধে যেকোনো ব্যক্তির থানায় বা আদালতে অভিযোগ দায়েরের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি হয়রানি বা শায়েস্তা করার অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহারের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে আইনজ্ঞরা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের উদাহরণ দিচ্ছেন।

অবশ্য আইনমন্ত্রী আনিসুল হক মনে করেন, যেকোনো নাগরিক অপরাধ সংঘটন হতে দেখলে মামলা করতে পারেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, এটা সব অপরাধের ক্ষেত্রে আছে, এখানেও রাখা হয়েছে।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের মামলা করার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। নইলে আইনটি অপব্যবহারের যথেষ্ট সুযোগ থাকে।

আইন কমিশন অবশ্য বলছে, আইনে উল্লেখ না থাকলেও সরকার এ ধরনের মামলা করতে পারবে। কমিশন আইনটির খসড়া তৈরিতে মূল ভূমিকা পালন করে।

কমিশনের মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা ফউজুল আজম বলেন, মতামত সমন্বয় করে খসড়া তৈরি কমিশনের কাজ। এখন আইন এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় পরবর্তী উদ্যোগ নেবে।

গবেষণা ও মুক্তচিন্তার অন্তরায়: আইনটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণার অন্তরায় ও মুক্তচিন্তার পথে বাধা হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। তাঁদের মতে, একাত্তরের প্রায় নয় মাসের প্রতিটি ঘটনার সমর্থনে দালিলিক প্রমাণ নেই। তাই এ নিয়ে কথা বলতে গেলে আইনের ধারা অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে।

গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নিয়মিত একাডেমিক গবেষণা ও ইতিহাসচর্চা চলছে। প্রতিনিয়তই উঠে আসছে নতুন নতুন তথ্য-উপাত্ত। এই আইনের ভয়ে সেসব নতুন তথ্য উঠে আসা বন্ধ হতে পারে।

সৈয়দ আবুল মকসুদের মতে, আইন কমিশনের প্রস্তাবটি হুবহু আইনে পরিণত হলে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো নতুন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে কোনো প্রবন্ধ লেখা, মত প্রকাশ বা মন্তব্য করা অথবা নতুনভাবে কোনো বিষয়কে ব্যাখ্যা করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে। তা ছাড়া এটা হবে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক আইন। কারণ, সংবিধানে মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলা আছে।

অবশ্য শাহরিয়ার কবির মনে করেন, এই আইনের ফলে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসচর্চার সুযোগ বাড়বে এবং ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা কমবে।

খসড়া আইন তৈরির আগে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি আইন কমিশন যেসব বুদ্ধিজীবী ও বিশেষজ্ঞের মতামত নেয়, তাঁদের মধ্যে একজন অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত। তার যুক্তি হচ্ছে, পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাস এখনো লেখা হয়। তাই ইতিহাসবিদের নির্মোহ ইতিহাস রচনার সুযোগ থাকা দরকার, যেখানে কোনো ভীতি কাজ করবে না। তার মতে, বস্তুনিষ্ঠ ও নির্মোহ জ্ঞানচর্চার পথে কোনো বাধা থাকা উচিত নয়। এ বিষয়ে সুরক্ষা দিয়ে আইনে একটি ধারা থাকা উচিত।

অবশ্য আইনমন্ত্রী এ বিষয়ে বলেন, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কিছু সত্য আছে, যা প্রতিষ্ঠিত। যেমন ৭ মার্চের ভাষণ। ইতিহাসবিদ বা গবেষক এই ভাষণের প্রেক্ষাপট, বিষয়বস্তু, গতিপ্রকৃতি, মুক্তিযুদ্ধের ওপর প্রভাব প্রভৃতি বিষয়ে গবেষণা করতে বা অনুমানভিত্তিক তথ্য দিতে পারবেন। কিন্তু ওই ভাষণকে কেউ অবজ্ঞা বা অবহেলা করতে পারবে না।

সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভাবনা: মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। এ পর্যন্ত কমপক্ষে পাঁচটি তালিকা হয়েছে। শহীদের সংখ্যা ও নির্যাতনের শিকার নারীর সংখ্যা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে আইন হলে এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা ও বিতর্কের সুযোগ কমে যাবে বলে মত দিচ্ছেন কেউ কেউ।

সরকারি হিসাব উল্লেখ করে অধ্যাপক বারকাত বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের দুই বা চার লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি হয়েছিল। বিভিন্ন জরিপের মাধ্যমে এবং ইজ্জত ও সম্ভ্রমহানির সংজ্ঞা নির্ধারণ করে আমার হিসাবে এটা ১০ লাখ। তাহলে তো এই আইনের আওতায় ইতিহাস বিকৃত হচ্ছে। কারণ, আমি সংখ্যা বেশি বলছি। এ ক্ষেত্রে কী হবে, তা ভেবে দেখা উচিত।’

অবশ্য শাহরিয়ার কবির বলেন, কোনো সংখ্যা অস্বীকার বা তা কমিয়ে বললে সেটি অপরাধ। কিন্তু বাড়িয়ে বললে তা অপরাধ হতে পারে না। গণহত্যাকারী সব সময় অস্বীকার করবে, কমিয়ে বলবে। নির্যাতিত বা ভুক্তভোগী যা বলবে, সেটিই গ্রহণ করা উচিত।

শাহরিয়ার কবিরের মতে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নতুন তথ্য-উপাত্ত বের হয়ে এলে সেটি অপরাধ হবে না। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্যগুলোকে যদি কেউ ধামাচাপা বা বিকৃত করতে চায়, তাহলে তা শাস্তিযোগ্য হতে হবে। যেমন মুক্তিযুদ্ধকে কেউ যদি গৃহযুদ্ধ বলে কিংবা মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাকে অস্বীকার করে।

জেল-জরিমানায় বিশেষ গুরুত্ব: মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির ঘটনায় হাতেনাতে কেউ ধরা পড়লে ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ, অন্যভাবে ধরা পড়লে বা আদালতে আত্মসমর্পণ করলে ৩০ দিনের মধ্যে তদন্ত করার কথা বলা আছে। এ ছাড়া ৪৫ কার্যদিবসে বিচার শেষ করতে হবে, যা যৌক্তিক কারণ থাকলে আরও ৩০ দিন বাড়তে পারে। এমনকি বিচার শুরুর পর একটানা শুনানি চলার কথা বলা হয়েছে।

আইনমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির মামলাগুলোর ধরন অন্য মামলার চেয়ে আলাদা। এগুলো যাতে পড়ে না থাকে, সে জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপ্তি নিয়ে প্রশ্ন: খসড়ায় মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপ্তি ধরা হয়েছে ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর। এই ব্যাপ্তি নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, তেমনি ওই সময়ে মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা, হত্যা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত তথ্য না থাকায় আইনটি অপপ্রয়োগের ঝুঁকি থাকছে।

আইন অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ১ থেকে ২৫ মার্চের ঘটনা এবং ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যবর্তী মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা অস্বীকার করা অপরাধ বলে গণ্য হবে। কিন্তু ঘটনাগুলোর তালিকা বা পূর্ণাঙ্গ বিবরণ নেই। মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল ১ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর বেঁধে দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন আছে।

কেউ মনে করছেন, সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ বললে এর ব্যাপ্তি ২৫ মার্চ পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর আক্রমণ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় পর্যন্ত ধরা উচিত। আবার কেউ কেউ মনে করেন, ৭ মার্চ না থাকলে মুক্তিযুদ্ধের একটি বড় বিষয় বাদ পড়ে যায়। কারণ, ওই ভাষণই মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা জুগিয়েছিল।

শাহরিয়ার কবিরের মতে, ৭ মার্চ মুক্তিযুদ্ধের অংশ। ১ মার্চ থেকে মুক্তিযুদ্ধের সময় ধরাটা সঠিক।

মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের নির্মাণ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ বা আনুষ্ঠানিক বিজয় পর্যন্ত। আইনে ১ মার্চ থেকে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময়কাল ধরার যুক্তি সম্পর্কে আমার জানা নেই।’

কিছু ঢালাও বিষয়: আইনে বলা আছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রচারিত বা প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের দলিল এবং ওই সময়ের যেকোনো ধরনের প্রকাশনার অপব্যাখ্যা বা অবমূল্যায়ন অপরাধ বলে গণ্য হবে। গবেষকেরা বলছেন, বিষয়গুলো এতটাই বিস্তৃত যে এর অপব্যবহার করাও সম্ভব।

আইনজ্ঞদের প্রশ্ন হচ্ছে, ‘মুক্তিযুদ্ধকালের সব ঘটনা বা ফ্যাক্ট কি আমরা জানতে পেরেছি? যখন ফ্যাক্ট নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, তখন কিসের ভিত্তিতে আদালত তা নির্ণয় করবেন?’

শাহরিয়ার কবির বলেন, খসড়ায় কিছু বিষয় ঢালাওভাবে উল্লেখ আছে। মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক সত্যগুলো আরও নির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট করে দিতে হবে।

গত ১২ এপ্রিল অধ্যাপক আবুল বারকাত বলেন, এমন একটি আইন অবশ্যই থাকা উচিত, যাতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করার সুযোগ না থাকে। তবে এমনটা যেন না হয় যে, ভবিষ্যতে অন্য কেউ ক্ষমতায় এসে পুরো ইতিহাসটাই উল্টে দিলেন।

শাহরিয়ার কবির মনে করেন, আইনটির সাংবিধানিক সুরক্ষা থাকা দরকার, যাতে এটা চাইলেই পাল্টানো সহজ না হয়। সূত্র: প্রথম আলোকে।
ইআর