মাগুরায় ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী শ্রী শ্রী কাত্যায়নী পূজা। ব্যতিক্রমী এ পূজা মাগুরা জেলার হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হিসেবে পালন করে আসছে।

রোববার ছিলো এর শেষ দিন। তবে এ উপলক্ষে আয়োজিত মেলা চলবে আরও ১৫দিন।

অনুপম সৌন্দর্যের প্রতিমা, সুবিশাল তোরণ, সুসজ্জিত প্যান্ডেল, চোধ ধাঁধানো আলোকসজ্জাসহ লাখ দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে এ পূজা ধর্মীয় বেড়াজাল ডিঙ্গিয়ে সার্বজনীন উৎসবের পরিণত হয়।

বুধবার ৬ষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে পূজা শুরু হয়ে রোববার দশমী বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে।

এ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে দর্শনার্থীরা এখানে আসেন। এ উপলক্ষে মেলা চলবে আরো পনের দিন।এ বছর জেলার ৬৭টি পূজা মন্দিরে চলছে এ পূজা।

পূজা নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসন ও স্থানীয় সব ধর্মের মানুষ এগিয়ে আসছেন সমান আন্তরিকতা নিয়ে। জামায়াতে ইসলামীর ডাকা হরতাল থেকে পূজা আওতামুক্ত রয়েছে। এছাড়া পূজা উদযাপনে সব রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধভাবে সহযোগিতা করেন। ফলে এ পূজা মাগুরার ঐতিহ্যবাহী এক উৎসবে পরিণত হয়েছে বলে মনে করেন।

পূজা উপলক্ষে শুরু হয়েছে মেলা। পূজার পরও যা ১৫দিন পর্যন্ত চলবে।মেলায় শিশুদের নাগর দোলা, ঘোড়া, ট্রেন গাড়ি, বিভিন্ন ক্রোকারি সামগ্রী, কম্বল, বেডশিট, শিশুদের খেলনা, ফার্নিচার, নানা ধরনের খাবার, মিষ্টি এমনকি যাদুর সামগ্রীও বিক্রি করা হচ্ছে।

শাস্ত্রমতে দুর্গা পূজার ঠিক একমাস পরে একই তিথিতে আয়োজন করা হয় কাত্যায়নী পূজা। তীথি অনুযায়ী ঢাক আর কাশির বাদ্যের তালে বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণে অনুষ্ঠিত হয় পূজা। রাতে চলে আলোকসজ্জার ব্যাপক আয়োজন।

এ পূজার ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে নান্দুয়ালী পূজা মন্দিরের পুরোহিত বরুন চক্রবর্তী জানান, বৈদিক যুগে বিষ্ণু ছিলেন অন্যতম প্রধান দেবতা। বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সার্বিক সৃষ্টি, ধ্বংস ও রক্ষার কর্তা ছিলেন তিনি। ত্রেতা যুগে জন্মান্তরের মাধ্যমে তিনি এসেছিলেন দশরথ পুত্র রাম হিসেবে।

পরবর্তীতে দাপর যুগে এসেছিলেন কংসের বিনাশকারী কৃষ্ণরূপে। সে সময় ব্রজবাসিনীদের ভালবাসার পরীক্ষা নিতে এক সময় তিনি উধাও হয়ে যান। তার এই অন্তর্ধানে আকুল হয়ে ওঠেন ব্রজবাসিনীরা। সে সময় মা যশোদা কৃষ্ণকে ফিরে পেতে মাসব্যাপী কৃষ্ণ আরাধনায় মহাময়া দুর্গাকে পূজার মাধ্যমে জাগ্রত করতে বলেন। যশোদার সেই পরামর্শ অনুযায়ী প্রচীন যুগে হেমন্ত কালে গোপীরা কৃষ্ণকে ফিরে পেতে যমুনা তীরে একমাস ব্রত পালন করেন।

তাদের ব্রতে সন্তুষ্ট হয়ে মহামায়া দুর্গা তাদের দেখা দেন।সেই সঙ্গে তার ক্রোড়ে স্থান পায় গোপীদের আরাধ্য দেবতা কৃষ্ণ। সেই থেকে কৃষ্ণ আরাধনায় মহামায়া দুর্গা কাত্যায়নী নামে পুজিত হয়ে আসছে। প্রতিমা স্থাপনের দিক দিয়ে এ পূজার অবয়ব দুর্গা পূজার অনুরূপ। কিন্তু পার্থক্য হিসেবে দুর্গা মায়ের ক্রোড়ে থাকে কৃষ্ণমূর্তি। যার অর্থ হচ্ছে কাত্যায়নী দেবি দুর্গার মাধ্যমে কৃষ্ণের আরাধনা।

এই পূজা চলাকালীন নবমী ও দশমীতে প্রতিটি মণ্ডপে একই সঙ্গে পালিত হয় জগদ্ধতি পূজা। পৃথক মণ্ডপে এ সময়টকে ভক্তরা তাদের অঞ্জলি দিয়ে থাকেন।

মাগুরা জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বাসুদের কুণ্ডু জানান, গত শতকের প্রথম দিকে মাগুরার পারনান্দুয়ালীতে সতীশ মাঝি নামে এক ব্যক্তি মাগুরায় কাত্যায়নী পূজার প্রচলন শুরু করেন। কালের প্ররিক্রমায় এ পূজাই এখন জেলার হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব।  

কেএইচ